তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়ালুম। বললুম, আসুন, আসুন।
কালো ফিতেপাড় ধুতির কেঁচাটিকে সাবধানে হাতে ধরে ভদ্রলোক চৌকাঠ টপকে ভেতরে এলেন। জুতোর বার্নিশ ঝিলিক মেরে উঠল। আমি জানি ভদ্রলোকের শরীরে তেমন জোর নেই। সেদিনে সেই ‘বাকসম’ মহিলার উৎসাহের আকর্ষণে উলটে পড়ে যাচ্ছিলেন। ভেতরে পা রেখেই ভদ্রলোক গ্রাম্যসুরে চিৎকার করে উঠলেন, কই গো, কোথায় গেলে?
কাকিমা কোনওরকমে একটা শাড়ি জড়িয়ে বেরিয়ে এসেছেন, আসুন মামাবাবু, আসুন।
নিচু হয়ে প্রণাম করতে গেলেন, ভদ্রলোক হাতদুটো খপ করে চেপে ধরে মহিলাকে প্রায় বুকের কাছে টেনে নিতে চাইলেন। এক সার সোনার বোম বুকের কাছে সঁত বের করে হাসছে। বয়েস মানুষকে কিছু লাইসেন্স দেয়; কিন্তু এ মানুষটি তো লাইসেন্সস। কেউ না জানুক আমি জানি।
কাকিমা সরে যাবার চেষ্টা করতে করতে বললেন, মামাবাবু, আপনি তা হলে ওপরেই বসুন।
ওপরে কেন? নীচেটাই তো বেশ ভাল।
না না, বড় ড্যাম্প, মশা। আপনি বসতে পারবেন না।
এখন আমি সব পারি গো। একসময় ছিল যখন গোকুল আড়ি ওয়েলার ঘোড়া জুতে ফিটন চাপত। স্কচ ছাড়া কিছু গলায় ঢালত না। এখন সব শেষ। কলসির জল গড়াতে গড়াতে এখন সব ফৌত।
মনে মনে ভাবলুম ফৌত তো হবেই, অসুখটা যে খুব সিরিয়াস। সোনার হরিণ ধরে দিতে গিয়ে রামচন্দ্র কাত হয়ে গিয়েছিলেন, ইনি আবার সোনার খরগোেশ কেনেন।
কাকিমা বললেন, তা হোক, আপনি ওপরেই বসুন, আমি চা চাপাচ্ছি।
কাকিমা যেমন করেই হোক ভদ্রলোককে ওপরে পাঠাতে চান, ভদ্রলোকও নাছোড়বান্দা। নীচেটাই তার পছন্দ। শেষে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবা কোথায়?
এখনও ফেরেননি। অফিসে।
তা হলে একা একা আমি ওপরে কী করব? এলুম তোমার কাছে, তুমি আমাকে ওপরে পাঠিয়ে দিচ্ছ! ভদ্রলোকের মতিগতি ভাল নয়। সন্ধেবেলা শাখের শব্দে ঘরে ঘরে দেবতারা আসেন, কোথা থেকে এই বৃদ্ধ মদন-মঞ্জরি এসে হাজির হলেন! মেয়েদের জীবন কী ক্যাডাভারাস! খোলা পড়ে থাকার উপায় নেই। মিষ্টির মতো। ভ্যানভ্যান করে মাছি আসবে, বোলতা আসবে। তা আমার এত গায়ের জ্বালা কেন? কারণ আছে। অবচেতনায় একটা অধিকারবোধ জন্মেছে। ঘটার আগেই ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। যাক গে, মরুক গে, এই কচলাকচলি দেখতে আর ভাল লাগছে না। আমার অত মাথাব্যথার কোনও কারণ নেই। আমার চেয়েও মামাশ্বশুর নিশ্চয়ই আপনার জন। অন্যের চরিত্রে ছিদ্র অন্বেষণ করার আগে নিজের চরিত্র সামলানো উচিত। চালুনির কি আর ছুঁচের বিচার চলে!
ওপরটা একেবারে পরিপাটি করে সাজানো। দেখলেই বোঝা যায় এর পেছনে বেশ রুচিবান একজন মহিলার সারাদিনের হাতের স্পর্শ রয়েছে। রাগতে গিয়েও রাগা যায় না। অভিমান ফেলে দিতে হয় ছুঁড়ে। চান করে নিতে পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় লাগল না। চায়ের আশায় বসেই আছি, বসেই আছি। কাকস্য পরিবেদনা। নীচে নামতেও ভরসা পাচ্ছি না। কী দেখতে কী দেখে ফেলব! চোখে উড়ে এসেছে পাপীর দৃষ্টি। বৃদ্ধ, তায় আবার আপনজন, তার ওপর ভোগী। অসীম ছাড়পত্র হাতে। মাঝখান থেকে এক কাপ চা জুটল না বরাতে। নিজে করে খাব, সে উৎসাহেও ভাটা পড়ে গেল।
হঠাৎ বুকসেলফের দিকে নজর চলে গেল। পিতৃদেবের ধর্মভাব আসায় একের পর এক আধ্যাত্মিক বই কিনে চলেছেন। সম্প্রতি পাঁচ খণ্ডে সম্পূর্ণ শ্রীমৎ কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী শ্ৰীশ্রীসদ্গুরু সঙ্গ কিনে এনেছেন। পাঁচটি খণ্ড পরপর পাশাপাশি সাজানো। এখনও পর্যন্ত একদিনও আমি খুলে দেখিনি। কী খেয়াল হল, দ্বিতীয় খণ্ডটা টেনে নিয়ে পাতা ওলটাতে লাগলুম। শুনেছি ধর্মজগতে এর চেয়ে খোলাখুলি ডায়েরি বিরল। পাতা ওলটাতে ওলটাতে মনে হল, বইটির অদ্ভুত আকর্ষণী শক্তি। যেখানেই খুলছি, সেইখানেই চোখ আটকে যাচ্ছে। সংস্কারমুক্ত প্রকৃত সাধকের উপলব্ধি বলেই এমন
পাতার পর পাতা ঘুরতে ঘুরতে একটি পরিচ্ছেদে এসে চোখ আটকে গেল। হেডিং, প্রলোভনে অবিকার, অহংকারে পতন। অংশটি পড়ে অবাক হয়ে গেলুম। মায়ের অসুখের খবর পেয়ে ব্রহ্মচারী বাড়ি ফিরছেন। তার নিজের ভাষায়, কিন্তু বিধির পাকে দুৰ্ম্মতিবশতঃ এদিকে সেদিকে মাসাধিককাল ঘুরিয়া বেড়াইলাম। এই সময়ে কিছুদিন এক পরিচিত লোকের ভবনে আমায় অবস্থান করিতে হইল। যে-ভদ্দরলোকের বাড়িতে উঠলেন, তিনি একদিন বিষয়কর্মে কিছুদিনের জন্যে বাইরে যেতে বাধ্য হলেন। যাবার সময় ব্রহ্মচারীজির ওপর বাড়ি এবং এক অবিবাহিতা মহিলার তত্ত্বাবধানের ভার দিয়ে গেলেন। চাকর চাকরানী ব্যতীত অন্য পরিজন না থাকায়, কামিনীর তত্ত্বাবধানের ভার বাবু আমারই ওপর রাখিয়া গেলেন। বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হেতু সজনে নির্জনে নিঃসংকোচে আমার সহিত ভঁহাদের আলাপন, উপবেশন বহুকাল যাবৎ চলিয়া আসিতেছে। আমার আসন ও শয়নের স্থান উহাদের আগ্রহে ও জেদে ভিতরেই হইল। বেলা বারটা পর্যন্ত আমি নির্জনে সাধনভজনে কাটাইতাম, রমণী তখন আপন গৃহকর্মে রত থাকিতেন। মধ্যাহ্নে আহারান্তে ভৃত্যবর্গ বাহিরে চলিয়া যাইত। কামিনী তখন একাকিনী এক ঘরে না থাকিয়া আমার ঘরে আসনের কিঞ্চিৎ অন্তরে শয়ন ও বিশ্রাম করিতেন। এই সময়ে তিনি ধর্মপ্রস্তাব তুলিয়া, সরলতার ভানে, নিজের আভ্যন্তরিক কুভাব আমার নিকটে ধীরে ধীরে প্রকাশ করিতে লাগিলেন। আমি বিষম সংকট সমস্যায় পড়িয়া কি করিব ভাবিতে লাগিলাম।
