রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাজখাঁই গলায় সুখেন চিৎকার করছে, পিন্টু, পিন্টু। একটা গলা করেছে বটে। যেমন ষাঁড়ের মতো চেহারা, তেমনি গলা। স্কুলে পণ্ডিতমশাই সুখেনের নাম রেখেছিলেন, সুখেন ষণ্ড। দিবাস্বপ্ন চটকে গেল। মেসোমশাই ধড়ফড় করে উঠে বসে বললেন, কে, কে? উঠবেনই তো। গলা শুনে মরা মানুষও উঠে বসবে। জানলার ধারে গিয়ে বলছি, দাঁড়া দাঁড়া, মেসোমশাই। আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মেঘগর্জনের সুরে বললেন, অসভ্যের মতো চেঁচাচ্ছ কেন, রাসকেল! মেরে মুখ ছিঁড়ে দোব। সুখেন কেমন যেন হয়ে গেল। এই ধরনের আকাশবাণীর জন্যে প্রস্তুত ছিল না! এ আবার কে রে বাবা! বোঝে ঠ্যালা! বাবারও যেমন বাবা থাকে, যাঁড়ের ওপরেও ষাঁড় থাকে।
আমাকে প্রশ্ন করলেন, ছেলেটি কে? তোমার বন্ধু?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
ইডিয়েট।
কনক আর মুকু দু’জনেই উঠে এসেছে চোখ রগড়াতে রগড়াতে। পৃথিবীর সমস্ত পিতাই যেন ষড়যন্ত্র করে বসে আছেন৷ বজ্রের মতো কঠোর। দাদু না হওয়া পর্যন্ত কোমল হব না। স্রেফ চাবকে যাও। মেয়েদের এক ধমক লাগালেন, ওখানে কী, ওখানে। যাও ভেতরে যাও। জানোয়ার দেখোনি?
ধমক দিয়ে ভালই করেছেন। আমার সমর্থন আছে। সুখেনের সামনে সুন্দরীদের না বেরোনোই উচিত। যেমন করেই হোক সুখেন ভাব জমাবে। উভয়পক্ষ ক্রমশই জমাট হয়ে উঠবে। অন্য কেউ আর পাত্তা পাবে না।
সুখেন বলে, তোমরা যে যাই বলল, আমার জন্ম মেয়েদের জন্যেই। খেদিই হোক, বঁচিই হোক, অপ্সরাই হোক, সব আমার। বেশ হয়েছে ব্যাটা। চেঁচা গাঁক গাঁক করে।
নীচে নেমে দরজা খুলতেই সুখেন বললে, লোকটা কে রে?
মেসোমশাই।
রাস্তায় দেখা হোক, একদিন পেছন থেকে কাছা খুলে দিয়ে পালাব।
খুলে দেখ না! জজসাহেব। ঘানি ঘুরিয়ে ছেড়ে দেবেন।
মেয়েদুটো কে রে? নিচু ফিসফিসে গলায় সুখেন জানতে চাইল।
মেসোমশাইয়ের মেয়ে।
সুখেন সামান্য দমে গেল। সুর পালটে বললে, জজসাহেবের মেজাজ এইরকম না হলে মানায় না। কত মারাত্মক মারাত্মক আসামিকে ফাঁসিতে লটকাতে হয় বল? চল, ওপরে চল, প্রণাম করে ক্ষমা চেয়ে নিই।
তুমি যাও ডালে ডালে। তোমাকে আমি চিনি না! মাতামহের গান, থেকে থেকে যেন মাগো লুচির গন্ধ পাই। আর একটু ভয় না দেখালে সুখেন ঠেলেঠুলে ওপরে উঠে পড়বে, তারপর ব্যাপার কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে জানে? আকাশপ্রদীপ হয়ে বসে থাকবে। যেমন করেই হোক সুখেনকে ঠেকাতে হবে।
প্রণাম করার চেষ্টা আর কোরো না। ভীষণ রাগী মানুষ। আইনের কোন ধারায় ফেলে দেবেন জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে। এই তো সকালে যখন এলেন, পেছন পেছন পুলিশের দুটো গাড়ি এল। এরই মধ্যে বড় দারোগা তিন বার সেলাম বাজিয়ে গেলেন। এই রকে বোসো। এখন মাসখানেক আর এ বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষার চেষ্টা কোরো না।
সুখেন মন খারাপ করে রকে বসে পড়ল। বাইরে গ্রীষ্মের দাবদাহ। বেলা পড়ে এসেছে। পথে লম্বা লম্বা ছায়া। উত্তাপ কিন্তু এতটুকু কমেনি। ঢোকার গলিতে এই রকটি বেশ ঠান্ডা। ভেতর বাড়ি থেকে লম্বা একটা নর্দমা এই পথেই বাইরে চলে গেছে। একটু-আধটু গন্ধ নাকে এলেও গ্রীষ্মের দুপুর কাটাবার বড় ভাল জায়গা। বসে বসে প্রাণের কথা মনের কথা বলো নিশ্চিন্ত আরামে। সুখে বললে, দেশলাইটা আন না একবার।
দেশলাই? তুই এখানে সিগারেট খাবি নাকি?
কেন, কী হয়েছে?
আমাকে বাড়িছাড়া করতে চাস? সিগারেটের গন্ধ ওপরে উঠবে, তারপর আমার কী হবে?
তুই দেখছি ভয়ে ভয়েই মরলি। মায়ের আঁচল-ধরা ছেলে দেখেছি, বাপের এমন কাছা-ধরা ছেলে দেখিনি! তোর ওই মেয়েলি মিনমিনে স্বভাবটা ছাড়া পৃথিবীটা অনেক অনেক বড়। পুরুষ হয়ে জন্মেছিস সবরকমের অভিজ্ঞতা না হলে পরে ওই বেচারার মতো পড়ে পড়ে মার খাবি সারাজীবন। তোর বাবাই তোর মাথাটি খেয়েছেন। মা-মরা ছেলে মা-মরা ছেলে বলে আগলে আগলে এমন একটি বস্তু তৈরি করেছেন, এরপর শাড়ি পরিয়ে কপালে টিপ এঁকে কারুর পুত্রবধূ করে সাত পাকে ঘুরিয়ে না দেন।
তোর মতো এঁচড়ে পেকে লাভ নেই।
তুমি আর এঁচড়টি নেই ভাই। মেঘে মেঘে মন্দ বেলা হয়নি। তুমি একটা খাজা কাঁঠাল। খবর পেয়েছি, বেশ সিঙ্কিং সিঙ্কিং ড্রিঙ্কিং ওয়াটার হচ্ছে।
তার মানে?
মানে? তুই আজকাল রেগুলার ওই পোডড়া মন্দিরটায় যাস কেন?
কোন পোড়ো মন্দির?
কিছুই যেন জানিস না, না? বিন্দুবালার শীতলাতলায়?
সাধন ভজন করতে।
এত দেবদেবী থাকতে মা শীতলা! কস্মিনকালে তুই কোনও শীতলাসিদ্ধ মহাপুরুষের নাম ইতিহাসে পেয়েছিস? কালী, তারা, শিব, দুর্গা, শোনা গেছে। তা, মা শীতলা তো সামনে বসে আছেন। গাধার পিঠে, ঝাটা হাতে, তুমি ব্যাটা পেছন দিকে বিন্দুবালার দাওয়ায় গিয়ে ওঠো কেন? ওখানে তোমার কী মধু আছে?
কোনও মধুই নেই।
মারব ব্যাটা এক থাপ্পড়। ছায়া আর মায়ার নাম শুনেছিস?
বিন্দুবালার ভাইয়ের মেয়ে। কেন কী হয়েছে? কেউ কোথাও নেই তাই পিসির কাছে মানুষ হচ্ছে। তাতে খারাপ কী হয়েছে?
ওদের কিছুই খারাপ হয়নি, হয়েছে তোর। তুই এবার দয়ে পড়ে মজবি। মজবি কী, রিপোর্ট বলছে মজে গেছিস।
সেকী রে? ছায়া তো পিসির মতো গেরুয়া ধারণ করে সন্ন্যাসিনী হয়েছে। আর মায়া? অতি সাদাসিধে ভাল মেয়ে।
ঘুঘু তুমি ভিটে দেখেছ, এইবার ফঁদ দেখবে। সে ফাঁদে পড়লে তোমার পিতারও ক্ষমতা নেই টেনে বের করেন। ওই মা শীতলার গাধা হয়ে দাওয়ায় বাঁধা থাকবে।
