জ্যামে আটকে পড়া বাসের জানলায় বসে বসে মিছিল দেখছি। ধর্মোন্মাদ নরনারী সুললিত সংগীত করতে করতে গুরুকে নিয়ে চলেছেন। এই যে সব বলেন ধর্মজগতে নারীসঙ্গ বর্জন করে চলতে হয়! ও না, সে মনে হয় প্রাথমিক স্তরে। একটু এগিয়ে গেলে, কী বা নারী, কী বা পুরুষ! ‘সেক্সলেস’ দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখা। সে দেখাটা কেমন কে জানে! অমন কন্দর্পকান্তি চেহারা পেলে বুক ঠুকে সংসার ত্যাগ করে সাধনজগৎ তোলপাড় করে দেখা যেত। পৃথিবী মোটেই মর্কটের জন্যে নয়। মিছিলে দু’একজন ভক্ত মহিলার ভাবোন্মেষ হয়েছে। তারা টলেটলে চলেছেন। শাড়ির আঁচল শরীর থেকে খুলে পথে লুটোচ্ছে। একেই বলে, সুরাপান করিনে আমি সুধা খাই জয়কালী বলে।
অফিস থেকে যেটুকু আগে বেরোবার সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল, সেটুকু সময় পথেই পড়ে রইল। বাড়ি ফেরার জন্যে মন ছটফট করছে। মুকুর রেখে যাওয়া খাম আমাকে আজ খুলতেই হবে। পৃথিবী যদি উলটেও যায় আজ আমি খুলে দেখবই।
মিছিল ধীরে ধীরে দক্ষিণে চলে গেল। ট্রাম আর বাসের জট একটু একটু করে খুলছে। ভেবেছিলুম সন্ধের আগে বাড়ি পৌঁছে যাব, তা আর হল না। মুকুরা এতদিনে বাড়ি পৌঁছে গেছে। সেখানে কী হচ্ছে কে জানে! এসেছিলেন তিনজন, ফিরে গেলেন দু’জন। আমার মাতুলও মনে হয় এতক্ষণে তার নতুন কর্মস্থলে পৌঁছে গেছেন। কতক্ষণের পথ। মাতামহকে পিতা আটকে দিয়েছেন। আগে শরীর, তারপর তীর্থধর্ম। আজ আসবেন একজন বড় ডাক্তারবাবু। তারই নির্দেশে চিকিৎসা চলবে। রক্ত পরীক্ষা, দেহনির্যাস পরীক্ষা। ছুটোছুটি আমারই বাড়বে। তা বাড়ুক, কাউকে আমি হারাতে চাই না। জীবন হবে পূর্ণ, তা নয় কেবলই শূন্য হয়ে আসছে। সবাই যেন পা নামিয়ে বসে আছেন। ঈশ্বর একবার স্টার্ট বললে হয়। দৌড়োতে শুরু করবেন। যে-সূর্য রোজ সকালে ফিরে আসেন, দিবাশেষে তার অস্তমুহূর্তে মন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। মানুষের অস্তের তো আর উদয় নেই। সব সম্পর্ক শেষ করে, সব ঘুচিয়ে চলে যাওয়া। নাঃ, ক্ষমতা থাকলে ধর্মগুরুই হতুম। তাকে ধরেই পড়ে থাকতুম, যার উদয় নেই, অস্ত নেই, ক্ষয় নেই। সদা পূর্ণ।
বাস এতক্ষণ আটকে থাকার শোধ তুলে নিচ্ছে। ঝড়ের গতিতে ছুটছে। যাত্রীরা খুব খুশি। গতির উত্তেজনায় সব বাহবা বাহবা করছেন। আমার পাশে বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ। তিনি কেবলই বলতে লাগলেন, যখন ভিড়িয়ে দেবে তখন বুঝবে মজা, বাহবা বেরিয়ে যাবে। একটু গলা চড়িয়ে কনডাক্টরকে বললেন, ওহে, আমরা বাড়ি যেতে চাই, হাসপাতালে নয়। পেছন থেকে এক ভদ্রলোক ব্যঙ্গ করলেন, দাদু, এখনও এত প্রাণের মায়া! ঘাড় না ঘুরিয়ে বৃদ্ধ বললেন, নাতি, আমার জন্যে নয়, ভাবছি তোমার জন্যে, নাতবউ যে কাঁচা বয়েসে বিধবা হবে।
নাতির মুখে আর কথা সরল না। দুটো স্টপেজ পরে বৃদ্ধ নেমে গেলেন। তিনটে স্টপেজ পরে নেমে গেলেন ব্যঙ্গকারী যুবক। আকাশের আজ খুব শোভা। পুব আকাশে গুটিগুটি শামুকের গতিতে চঁদ উঠে পড়েছে। আমাদের এ তল্লাটে এখনও বড় বড় গাছ আছে। ডালপালা থেকে জলের ফোঁটার মতো ভিজেভিজে চাঁদের আলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে।
বাড়ি একেবারে শান্ত। কাকিমা সবে গা ধুয়ে তারে ভিজে জামা মেলছেন। ভিজে শাড়ি জড়ানো শরীর। আমার পায়ের শব্দে ফিরে তাকালেন। সামান্য অনুযোগের গলায় বললেন, তুমি বলেছিলে আজ তাড়াতাড়ি আসবে, এই তোমার তাড়াতাড়ি?
কী করব! এক ঘণ্টার পথ আসতে দু’ঘণ্টা সময় লাগল। আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তারে বোধহয় বেশি টান পড়েছিল, পটাং করে ছিঁড়ে সায়াব্লাউজ সমেত উঠোনে নেমে এল।
কাকিমা বললেন, যাঃ হয়ে গেল, আবার কাচো।
আগে ভিজে কাপড়টা শরীর থেকে খুলুন। ঋতু পরিবর্তনের সময়, জ্বরে পড়লে কে দেখবে?
দেখার মানুষ আছে।
সে কে?
এই যে, আমার সামনে দাঁড়িয়ে।
কাকিমা নিচু হয়ে জামাকাপড় তুলতে লাগলেন। হঠাৎ মনে হল, আমি সংসার পেতে ফেলেছি। আমাকে আর গৃহী করার প্রয়োজন কী? গৃহী তো হয়েই গেছি। আবার সেই রাত আসছে। আজ কী হবে! কে কোথায় থাকবে? আসুক রাত, তখন ভাবা যাবে।
কাকিমা বললেন, আজ সারাদুপুর বসে বসে তোমার জামাকাপড় সব কেচে দিয়েছি। ওপরের চেয়ারে পাট করা আছে। ইস্ত্রিতে দেবার হলে দিয়ে দিয়ে।
এত কষ্ট করতে গেলেন কেন?
আমার খুশি। তুমি এখন চা খাবে?
খাব।
তা হলে হাত মুখ ধুয়ে এসো।
সিঁড়ির ধাপ দুয়েক উঠেছি, সদর দরজার কড়া নড়ে উঠল খড়খড় করে। কাকিমা তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে পড়লেন। আবার নেমে আসতে হল। দরজা খুলেই চমকে উ’তে হল। কী আশ্চর্য, ইনি তো সেই ভদ্রলোক। হাতিবাগানে সোনালি খরগোশ দর করছিলেন, সাথে এক ঢলে-পড়া সুন্দরী মহিলা, নিয়ে।
আমি চিনতে পেরে চমকে উঠলেও, ভদ্রলোক আমাকে চিনতে পেরেছেন বলে মনে হল না। কাকিমার নাম করে বললেন, আছে?
খুবই ঘাবড়ে যেতে হল, কে এই ভদ্রলোক? সাজপোশাক ঠিক সেদিনকার মতোই। শরীর থেকে ফিনফিনে ধারালো এক গন্ধ উঠে এসে নাকে লাগছে। মুখে পাউডার মেখেছেন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই। এইরকম একজন মানুষ কাকিমাকে খুঁজছেন কেন? বেশ সাবধানে সংযত হয়ে বললুম, কেন বলুন তো?
ভদ্রলোক হাসলেন। বাঁধানো দাঁত। ভয় নেই। তুমি আমাকে চেনো না। আমি তার মামাশ্বশুর। আমার কথা নিশ্চয়ই শুনেছ?
