বাঃ যেতে হবে না! তুমিই তো সব। তোমার জন্যেই তো সব আয়োজন!
পঙ্কজবাবু বললেন ভাল। তবে বিশ্বাসযোগ্য নয়। আয়োজন আমার জন্যে নয়। উপলক্ষ ভায়রাভাই। এক ঢিলে দু’পাখি মারা হচ্ছে। তবু বলেছেন, এই যথেষ্ট। এসে বসে আছেন কতক্ষণ! সেও তো কম কথা নয়! নিজের বোকামির জন্যে সকাল গেল, দুপুর গেল, এইবার রাতটাও যেতে বসেছে। পেটে হিং-এর কচুরি ঠেলেঠেলে উঠছে। এই অসময়ে আর কি কিছু ভালমন্দ খাওয়া যাবে!
পঙ্কজবাবুর খুরথুরে গাড়ি আবার কলকাতামুখো। আবার সেই মনস্তত্ত্ব। দু’হাতে স্টিয়ারিং। দু’চোখ রাস্তায়। মুখে ক্লান্তির ছায়া। আমাকে বললেন, বুঝলে, তোমার মন আমি বুঝে ফেলেছি। তুমি সত্যি কথা বললে না। আসলে তোমার অভিমান হয়েছে। বলল, ঠিক ধরেছি কি না! এইবার তুমি সত্যি বলো!
পঙ্কজবাবুর কথা শুনে গলা শুকিয়ে এল। মিথ্যে কীভাবে ধরা পড়ে যায়! পাপ অনেকটা পক্সের মতো। গায়ে গুটি বেরোয়। অভিজ্ঞ মানুষ দেখেই ধরে ফেলেন। পঙ্কজবাবু তন্ময় হয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসিটি লেগে আছে। ইনি এক অন্য জাতের মানুষ। পাকা পিচফলের মতন নরম। ভেলভেটের মতো মন। এঁর সঙ্গে খোলাখুলি কথা হয়ে গেলে ক্ষতি কী! আবার একটা জটিল অবস্থার মধ্যে পড়ার চেয়ে, মনে যা হয়েছে তা বলে ফেলাই ভাল।
বললুম, আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি ধরেছেন ঠিক, আমি সত্যি কথা বলিনি। বলার সাহস হয়নি।
তুমি ওভাবে তা হলে পালিয়ে এলে কেন?
আমার মনে হল—
মনে হল, বলে থেমে পড়তে হল। ভাষায় কুলোচ্ছে না। এমন কিছু শব্দ চাই যা বেশ ভদ্র, নরম অথচ স্পষ্ট।
বলো, কী তোমার মনে হল? আমরা খারাপ লোক?
আজ্ঞে না। ছি ছি, খারাপ লোক কেন হবেন! আপনারা অসাধারণ। সেই তুলনায় আমি ভীষণ সাধারণ। আমার মনে হল, আপনাদের পরিবারে আমি একেবারেই মিসফিট।
মিসফিট? এমন মনে হবার কারণ!
আপনারা ধনী। আপনাদের আত্মীয়স্বজন সব বড় বড় ব্যক্তি, জীবনে কত সুপ্রতিষ্ঠিত! সেই তুলনায় আমি একটা বোগাস। জীবনে খুব বেশি দূর ওঠার যোগ্যতাও আমার নেই। এইরকম একটা মিডিয়োকার ছেলে ও পরিবারে অচল।
এই তোমার ধারণা?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমরা তা হলে তোমাকে আপন করে পেতে চাইছি কেন?
ঠিক জানি না। ধরতে পারছি না বলেই আশ্চর্য হচ্ছি।
তুমি খুব মেটিরিয়ালিস্ট!
একেবারেই না।
তা হলে তুমি ও রাস্তায় ব্যাখ্যা খুঁজতে যাচ্ছ কেন?
আজ্ঞে ওইটাই তো পৃথিবীর রাস্তা। জীবনের রাজপথ।
রাজপথের পাশে পায়ে-চলা পথও থাকে যে-পথে তীর্থযাত্রীরা যাওয়া-আসা করে।
পঙ্কজবাবু গাড়িটাকে হেদোর ডান পাশে নির্জন একটা রাস্তার ধারে দাঁড় করালেন। ইঞ্জিন বন্ধ। হয়ে গেল। একপাশে সার সার বাড়ি, বাগান। আর একপাশে বড় বড় গাছ। দেবদারু, কৃষ্ণচূড়া। বিকেলের আলো মরে আসছে। ঝক ঝক পাখি কিচিরমিচির করছে। ডাইভিং বোর্ড থেকে মাঝে মাঝে এক-একজন জলে ঝাঁপ মারছে। শব্দ হচ্ছে ঝপাং।
স্টার্ট বন্ধ করে পঙ্কজবাবু আমার মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। কাল রাতে সদ্য-পাওয়া মুখের কাটা দাগ আমার ভেতরটাকে কেবলই সামনে ঠেলে দিতে চাইছে আর আমি ক্রমশই কুঁকড়ে যাচ্ছি। পঙ্কজবাবু হঠাৎ খপ করে আমার হাতদুটো চেপে ধরলেন। হাত কাঁপছে। ভদ্রলোক যে-কোনও কারণেই তোক উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন।
চাপা গলায় বললেন, তোমাকে আমি ধরে ফেলেছি।
ধরে ফেলেছি বলায় ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। কী ধরে ফেলেছেন! আমার মন, আমার চিন্তা! বলা যায় না। কোনও কোনও মানুষের ভীষণ শক্তি বাড়ছে। পঙ্কজবাবুর পরের কথায় ভয় কেটে গেল।
তুমি গ্রহণ করেছ।
কাকে?
আমার মেয়ে অপর্ণাকে। তার ওপর তোমার একটা অধিকারবোধ জন্মেছে। বলো ঠিক কি না?
আজ্ঞে তা কী করে হয়?
হয়, খুব হয়, তা না হলে তোমার অভিমান হত না। আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। শোনো, অর্থ, কেরিয়ার এসবের প্রয়োজন আছে, তবে সব নয়, সবার ওপরে হল বংশ, কৌলীন্য, চরিত্র। প্রাচীনকালে গৌরীদানের প্রথা ছিল। যুগ পালটেছে। পালটালেও, যোলো থেকে আঠারোর মধ্যে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া উচিত। জানো তো, প্রবাদ আছে মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি হয়ে যায়। ছেলেদেরও পঁচিশের মধ্যে বিয়ে দেওয়া উচিত। এই তো সেই বয়েস। স্বপ্ন দেখার বয়েস, রোমান্সের বয়েস, ঘর বাঁধার বয়েস, আনন্দ করার বয়েস, দুঃখ সহ্য করার বয়েস। তোমার ঠাকুর বলতেন, হাঁড়ি যতক্ষণ কঁচা, তলতলে, ততক্ষণই তার গায়ে আঁকিবুকি চলে। পেকে গেলে পুড়ে গেলে আর কিছু চলে না। তুমি ওই বিলিতি বস্তু দেখে ভয় পেয়ো না। ওরা আমাদের ঘন্টাকয়েকের অতিথি। আমরা ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণের আদর্শ আলাদা। তুমি একটু হাসো। তোমার সেই হাসিহাসি মুখ ফিরিয়ে আনন।
আমাকে হাসতেই হল। পঙ্কজবাবু সত্যিই আমাকে ধরে ফেলেছেন। গাড়ি স্টার্ট নিয়ে আবার রাস্তায় ভেসে পড়ল। উনি গুনগুন করে গান ধরেছেন, পাগলা মনটারে তুই বাঁধ। সেই বিশাল বিশাল থামওলা শ্বেতপাথরের মতো শুভ্র বাড়িটি ক্রমশই এগিয়ে আসছে। গাড়ি এগিয়ে গিয়ে গাড়িবারান্দার তলায় দাঁড়াল। সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসছে অপর্ণা, বাবা, খুঁজে পেয়েছ, খুঁজে…একটি মুখ ঝুঁকে এল জানলার কাছে। সুন্দর এক সুবাস।
১.৫৩ দিয়েছিলে জ্যোৎস্না তুমি
সারাশহরের যানচলাচল বিপর্যস্ত করে বিশাল এক মিছিল বেরিয়েছে। কোনও এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের। সিংহাসনে বসে আছেন ধর্মগুরু। সিল্কের গেরুয়া পরে। সিংহাসন চলছে কলে। একটা হুড-খোলা মোটরগাড়িকেই ওইভাবে সাজানো হয়েছে। ফুলে ফুলে ছয়লাপ। ধর্মগুরুকে দেখতে ভারী সুন্দর। তপ্তকাঞ্চনের মতো গাত্রবর্ণ। মুখশ্রী যিশুখ্রিস্টের প্রায় কাছাকাছি। অতি সুন্দরী দুই মহিলা দু’পাশে বসে চামর ব্যজন করছেন। তার মধ্যে একজন বিদেশিনী।
