পালিয়ে এসেছ শব্দটা কানে বড় কর্কশ লাগল। মনে হল বলি, বেশ করেছি। আমি কি কারুর বন্দি পাখি? বলতে পারলুম না। সামনে যে-মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছেন। মুখে বলার সাহস নেই, মন বলছে, আমি তোমার জন্য বড় বিচলিত। একে ভালবাসা বলা যায় কিনা জানি না। হয়তো যায় না। শীতের সকালে উষ্ণ জল অথবা নরম আঁচের রোদ যেমন। মনের ভেতর একটা আমেজ তৈরি করে দেয়, তুমি সামনে এলে আমার সেইরকমের একটা সুখসুখ অনুভূতি হয়। খুব বিশাল একটা ঘরে সার সার ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে। লম্বা খাবার টেবিলে সুদৃশ্য চিনামাটির প্লেটে অদ্ভুত সব ভোজ্য সামগ্রী। বাদামি রঙের রোস্ট করা মুরগির ঠ্যাং, ফিকে হলুদ পুডিং, তার ওপর কাঠি গোঁজা লাল একটি চেরি ফল। পালতোলা গেলাসে স্বচ্ছ লাল পানীয়, রুপোর পাত্রে সরু চালের হালকা হলুদ বিরিয়ানি। জাফরানের রং, জায়ফল আর আতরের সুবাস। দু’খণ্ড করা লাল বেদানার দানা, খোলো থোলো আঙুর, পালিশ করা আপেল, দূরে কোথাও কোনও ঝরনার ফিনিক ফিনিক শব্দ। তোমাকে দেখলে আমার কেন জানি না এইসবই মনে পড়ে। বড় ভোগের ইচ্ছে হয়। কৃশকায় এক সন্ন্যাসীকে চোখে হাত চাপা দিয়ে চলে যেতে দেখি। তাকে আর ফেরাতে ইচ্ছে করে না। বিশাল আকাশের চেয়ে কূপকেই সুখের মনে হয়। আগুন জ্বলে। সে আগুন হোমের নয়। যে-আঁচে মশলা-মাখা মুরগি ধীরে ধীরে বাদামি হতে থাকে, সেইরকম কোনও কাবাবের আঁচ।
মহিলা আমার দুধে হাত রেখে শরীরটাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললেন, কী হয়েছে তোমার?
চমকে উঠে বললুম, না কিছু হয়নি। আমার কি ওপরে যাওয়া উচিত, না সরে পড়ব?
সরে পড়বে কেন? ওঁরা দুজনেই ভীষণ চিন্তায় আচ্ছন্ন। তুমি এখুনি ওপরে যাও।
ফাঁসির আসামি যেভাবে বধ্যভূমির দিকে এগোয় আমি সেইভাবে ওপরে উঠে গেলুম। ভাবতে লাগলুম, কীভাবে আমার কাহিনিকে সাজাব। বিশ্বাসযোগ্য একটা কিছু বলতে হবে। মিথ্যেকে করে তুলতে হবে সত্যি।
সকালের সেই পোশাকে পঙ্কজবাবু বসে আছেন সোফায়। আমি পেছন থেকে দেখছি। বাতাসে চুল এলোমেলো। ঘরে পিতৃদেব নেই। দেয়ালে প্রায় নিঃশব্দে ঘড়ির দীর্ঘ পেন্ডুলাম সময়ের রেখা টেনে চলেছে।
আমি অবাক হয়ে দেখছি। এমন সময় ভেতরের ঘর থেকে পিতা বলতে বলতে বেরিয়ে এলেন, চলো তা হলে, আর দেরি করে লাভ নেই। নিশ্চয় কোনও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।
কোঁচার দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলেন। মুখ তুলেই আমাকে দেখতে পেলেন। মুখের চেহারা একবারে পালটে গেল। মনেই হল না কঠোর একটি পুরুষের মুখ। স্নেহের নরম ছায়া নেমেছে। মা যেন যুদ্ধ-ফেরত সন্তানকে দেখছেন। অদ্ভুত গলায় বললেন, তুমি এসেছ!
পঙ্কজবাবু ধড়মড় করে ঘাড় ফেরালেন। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কোথায় গিয়েছিলে তুমি?
পিতা বললেন, ওকে আগে ভেতরে আসতে দাও। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে খুব বিপদে পড়েছিল।
পঙ্কজবাবু এগিয়ে এসে আমার হাত ধরলেন, কী হয়েছিল বাবা?
সত্যি কথাই মুখে আসছিল। চাপা অভিমানে আমি পলাতক হয়েছিলুম। স্টেটাসে মিলবে না বলে সরে যেতে চেয়েছি। বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা মানায় না। বলা গেল না, কিছুতেই বলা গেল না। পরিবারের বাইরে এই মানুষটি একেবারে আমাদের মতো, যেন আর এক পিতা। মৃদু গলায় বললুম, আমার ভীষণ বড়বাইরে পেয়েছিল।
অ্যাঁ, সেকী? তা তুমি কী করলে?
আমি তিরবেগে বেরিয়ে এলুম। প্রাণপণে চেষ্টা করলুম বাড়ি আসার। হল না। শেষে কলেজে চলে গেলুম। সেখানে কোনওরকমে, এই আর কী?
আমাদের বাড়িতে সাত-সাতটা বাথরুম, তুমি তিরবেগে ছুটলে, একবার বললে না?
আমার বলতে ভীষণ লজ্জা করল।
পিতা বললেন, হি ইজ এ ফুল। পঙ্কজ, এই হল বাঙালি। বাইরের জগতে নিজেকে এমনভাবে প্রোজেক্ট করতে চায়, যেন দেবতা। মানুষও যে অ্যানিম্যাল, তারও যে আহার, নিদ্রা, মৈথুন আই অ্যাম সরি, রিয়েলি আই অ্যাম সরি, এক্সকিউজ মাই ল্যাঙ্গোয়েজ।
পঙ্কজবাবু বললেন, তুমি একবার বললে না কেন বাবা? ইস কত কষ্ট পেলে।
ও প্রশ্ন আর নাই বা করলে পঙ্কজ। লজ্জা, লজ্জা। লজ্জা নারীর ভূষণ কিন্তু পুরুষের? পুরুষের ইডিওসিনক্রেসি। একবার ঠিক এই কাণ্ড করেছিল আমাদের অফিস-রিক্রিয়েশন ক্লাবের ফাংশনে গিয়ে। আমি ডায়াসে অরকেস্ট্রার সঙ্গে এসরাজ বাজাচ্ছি। মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছি, বেশ বসে আছে সামনের সারিতে। হঠাৎ দেখি নেই। ভাবলুম ছোটবাইরে করতে গেছে। অনুষ্ঠান শেষ। তবু বাবুর পাত্তা নেই। খোঁজ খোঁজ। কাকস্য পরিবেদনা। পরের দিন পনেরো টাকা ফাইন দিয়ে বাবুকে ব্যাঙ্কশাল কোর্ট থেকে খালাস করে আনলেন আমার শ্বশুরমশাই। পুলিশ পাঁচ লাইনে চালান করে দিয়েছিল। লজ্জা!
পঙ্কজবাবু বললেন, কীসের লজ্জা! আমাদের বাড়িতে তোমার কীসের লজ্জা! তুমি তো ব্যাটাছেলে! আজকাল মেয়েরাই উদোম হয়ে ফিরিঙ্গি নাচ, আই অ্যাম সরি। এক্সকিউজ মাই ল্যাঙ্গোয়েজ।
পিতা বললেন, কীসের লজ্জা, শুনবে? সব খুলে গামছা পরে…।
গামছা পরবে কেন? তোয়ালে, তোয়ালে পরবে।
আরে তার চেয়েও বড় কথা, যে-মানুষ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়, ওর ব্যাখ্যায় সে মানুষ মানুষই নয়, জন্তু। যাক কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। ওকে ছেড়ে দাও। একটু সাফা হয়ে আসুক। অশুদ্ধ হয়ে আছে।
হ্যাঁ বাবা যাও, চট করে সেরে এসো। ওরা সব না খেয়ে তোমার জন্যে হা করে বসে আছে। পঙ্কজবাবুর কথা শুনে মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল। আবার যেতে হবে! মিউমিউ করে বললুম, আবার যেতে হবে!
