ভদ্রমহিলার কানে গেল না। সোনালি খরগোশ মন কেড়ে নিয়েছে। সামনে ঝুঁকে পড়ে বলছেন, কী সুন্দর দেখো, কী সুন্দর দেখো।
সীতা যেন সোনার হরিণ দেখেছেন। মানুষ কেমন মেতে ওঠে। মন যেন ছটফটে মাছির মতো। একবার এখানে বসছে, একবার ওখানে বসহে। সোনার খরগোশের দিক থেকে সরে এলুম। ডলপুতুলের মতো ফুটফুটে একটি মেয়েকে তার বাবা নোমওয়ালা সাদা একটা কুকুরছানা কিনে দিয়েছেন। মেয়েটির কোলে সেই কুকুর। কাকে দেখি, মেয়েটিকে না কুকুরটিকে? পৃথিবীর এই প্রান্তে হাটের একটি বৃত্তে যেন স্বর্গ নেমে এসেছে।
সরতে সরতে পায়রা-পাড়ার কাছে চলে এসেছি। গাট্টাগোট্টা চেহারার এক ভদ্রলোক, ছুঁচোলো গোঁফ ঠোঁটের ওপরে কথা বলার তালে তালে নাচছে, পায়রা দর করছেন। পায়রা যে কত রাজকীয় পাখি এই প্রথম কাছ থেকে দেখে চিনলুম। দুধের মতো সাদা। আদুরে আদুরে মুখ। দৈত্যের মতো মানুষটির হাতে পায়রা যেন ঠিক মানাচ্ছে না। এ হাতে থাকবে বাজপাখি।
রংমহলের রং দেখতে দেখতে সময় যে কীভাবে হুহু করে কেটে গেল। মানুষের বরাত! রাজভোগের বদলে হরিমটর। এতখানি বেলা হল, পেটে এখনও দানাপানি পড়ল না। অনেক আগেই খিদেয় পেট জ্বলছিল, এখন পিত্তি পড়ে মুখ তেতো লাগছে। বাড়িতেও মনে হয় আহারের ব্যবস্থা থাকবে না। কিছু খেতে পারলে মন্দ হত না। সিনেমা আর বাজার পাড়ায় চপকাটলেট ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না।
ঝোঁকের মাথায় তেড়ে বেরিয়ে এসে কেমন যেন লাগছে এখন। খুব ছেলেমানুষি হয়ে গেল। কী ভাবলেন ওঁরা কে জানে! কী করব! পালিয়ে না এসে আমার উপায় ছিল না। যেখানে গেলে মন কুঁকড়ে যায়, সেখানে এক মুহূর্তও থাকা চলে না। ও বাড়ি আমার বাড়ি নয়। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। ছোট মাপের মন। রাজাউজির মারতে শেখেনি। আমার জগৎ আলাদা।
আমার জগৎ আলাদা, এই ভাবনা আসামাত্রই মনে বেশ একটা বল পেয়ে গেলুম। ঘিনঘিনে সেই পাপবোধটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। পতন আর উত্থান এই তো মানুষের জীবন। একবার পড়েছি। বলে পড়েই থাকব, তা কেন? আবার উঠব ঠেলে। তবে এ কথাও ঠিক, মনে এক ধরনের স্বাদ লেগেছে। জীবনে যেদিন প্রথম মাংস খেয়েছিলুম সেদিন কেমন লেগেছিল! সবকিছুরই একটা প্রথম আছে। অক্ষর পরিচয়। অ লিখতে শেখা, আ লিখতে শেখা; প্রথম একা একা পথে বেরোনো। প্রথম ইস্কুল, প্রথম কলেজ। প্রথম চুম্বন। মায়া যেদিন প্রথম আমাকে চুমু খেয়েছিল। ঘুঘু-ডাকা এক দ্বিপ্রহরে, সবুজ গাছপালা চারপাশে। কচুরিপানা ভরা পুকুর। ফড়িং উড়ছে নেচে নেচে। কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতাই ছিল না। তবু ভেতরটা ঠিক সুরেই বেজে উঠেছিল। সে ঝংকার যে কী ঝংকার, যে জানে সে জানে।
পাঁচমাথার মোড়ে এসে ঘঘাষেদের একদা-বিখ্যাত মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ঢুকে পড়লুম। সামান্য কিছু খাওয়া দরকার। নিজেকে জেল-ভাঙা আসামির মতো মনে হচ্ছে। পেছন থেকে কেউ না এসে চেপে ধরে! কী করা যায়! বড় দোটানায় পড়ে গেছি। দুটো জগৎ দু’পাশ থেকে কান ধরে টানছে। ভোগ আর ত্যাগ। কোথায় গেল আমার সেই রোম্যান্টিক মন! দেহ ঢুকেছে মনে। অপর্ণার মুখের দিকে তাকাতে গিয়ে দৃষ্টি আমার কোথায় ঘুরছিল! ছিঃ ছিঃ মন।
কে যেন খুব চড়া গলায় বললেন, কী খাবেন বলুন? আমাদের অন্য কাস্টমার আছে।
ও হ্যাঁ, হিং-এর কচুরি খাব।
ক’খানা?
চারখানা।
মিষ্টি?
দুটো বালুসাই।
দোকানে খুব একটা ভিড় নেই। লোকটি খুব কাস্টমার দেখিয়ে গেল। ভাবজগতে থাকলে মানুষ সহজে কিছু শুনতে পায়! আমার বলে এখন জীবনমরণ সমস্যা। মচকাব তবু দোমড়াব না। কিন্তু কীসের এ লড়াই! বিয়ে যদি করতেই হয় তা হলে করে ফেলতে দোষ কী! এমন তো কিছু গর্হিত কর্ম নয়! সকলেই করে। সংসারে থাকতে হলে সংসারীই হতে হয়। সন্ন্যাসী হতে হলে সংসার ছাড়তে হয়। ন্যাজে খেলার কোনও মানে হয় না। আর বিয়ের আগে একটু এদিক-সেদিক! বিলেতে অমন অভিজ্ঞতা সকলেরই হয়। এ দেশের বিলেত হতে বাকি কী আছে! সাজে পোশাকে, আহারে বিহারে সবেতেই সায়েবি ঢং এসে গেছে। প্রাচীনের যুগ প্রায় শেষ হয়ে এল। দোকান হলে লিখে দিত। রেন্টস ফর সেল। প্রাচীন বিশ্বাসের ঝড়তিপড়তি কিছু পড়ে আছে। জলের দামে বিকিয়ে যাবে।
তিনটে বেজে পনেরো মিনিট হল। বাড়ির সামনে দূর থেকে সেই গাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে গেলুম। পঙ্কজবাবু ঠিক ধাওয়া করে এসেছেন। কতক্ষণ এসেছেন কে জানে। পা থেমে পড়তে চাইছে। মনে হচ্ছে, যেদিক থেকে এসেছি আবার সেই দিকেই পালাই। ভাবলে কী হবে! ঘটনা যেন অজগরের নিশ্বাস। নিশ্বাসের টানে ছাগলছানা পায়ে পায়ে এগিয়েই চলল। এই প্রথম নিজেকে মনে হল শিকার। ঘটনার শিকার, পরিস্থিতির শিকার, দুটো মনের লড়াইয়ের শিকার।
সদর দরজার পাশেই কাকিমা দাঁড়িয়ে আছেন। দরজার একটা পাল্লা ভেজানো। আর একটা ঈষৎ ফাঁক, সেই ফাঁকে চোখ রেখে কাকিমা স্থির। দৃষ্টি এতই সুদূরে, মন এমনই তন্ময়, আমি একেবারে সামনে না গিয়ে দাঁড়ানো পর্যন্ত তিনি আমার আগমন টেরই পেলেন না। চমকে উঠে বললেন, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
দরজার কাছ থেকে সরে গিয়ে আমাকে ঢুকতে দিলেন, তারপর দরজা আবার ভেজিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ছিলে কোথায়? তুমি নাকি কিছু না বলে ওঁদের বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছ?
