আচ্ছা, আমাকেও তো ভেতরে যেতে বলতে পারত। অপর্ণাও তো একবার আসতে পারত। মানুষকে যত দেখা যায় তত চেনা যায় নিত্য নতুন রূপে। এই বোকার মতো বসে না থেকে, আমার কিছু একটা করা উচিত। বেশ বুঝতে পেরেছি, আমার স্ট্যাটাসে যদি কেউ মিলতে পারে সে হল মায়া। সে হল ওই কাকিমার মতো কোনও মহিলা। অ্যারিস্টোক্র্যাট আমার ধাতে সইবে না। এইরকম জড়পিণ্ড করে চেয়ারে বসিয়ে রেখে দেবে। এখন আমার মনে হচ্ছে, সমস্ত ব্যাপারটাই খাড়া হয়েছে আমার পিতৃদেবের অনুরোধে। এঁরা ভদ্র। কোনও এক দূর অতীতে বন্ধুকে কথা দিয়েছিলেন, তোর ছেলে আর আমার মেয়ে। তখন জানতেন না ছেলে কী আকার আকৃতি নেবে, মেয়েই বা কী চেহারা পাবে বড় হয়ে। এখন সাপের ছুঁচো গেলার অবস্থা।
না, এভাবে বসে থাকা যায় না। নিজেকেই নিজের ইডিয়েট বলতে ইচ্ছে করছে। আমি এই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। ঘরের বাইরে যাই। করিডর ধরে ফিরে চলি সিঁড়ির দিকে। ধাপে ধাপে নীচে। উপেক্ষায় শরীর জ্বলছে।
সিঁড়িতে কারুর সঙ্গে দেখা হল না। রোদের রেখা সরে গেছে। নীচের ঘরে টোব্যাকোর গন্ধ ভাসছে। গ্র্যান্ডফাদার চেয়ারের হাতলে সোনার ঠোঁট লাগানো পাইপ কাত হয়ে পড়ে আছে। স্ত্রী-পুরুষ-শিশু সবাই এখন কীসের প্রবল আকর্ষণে অন্দরমহলে। হাওয়াই জাহাজের ইঞ্জিনিয়ার সেখানে হাতের খেলা দেখাচ্ছেন।
ছ’ধাপ সিঁড়ি ভেঙে আরও নীচে। পঙ্কজবাবুর গাড়িটা নেই। তার মানে ভায়রাকে নিয়ে কোথাও বেরিয়েছেন। দু’সার সাবু গাছের ভেতর দিয়ে পথ এগিয়ে গেছে গেটের দিকে। বাইরের পথে দাঁড়িয়ে মুক্তি আমাকে ডাকছে, পালিয়ে আয়। শিকল সোনার হলেও শিকল।
গেট আর প্রায় হাতখানেক দূরে। এখনও কারুর সঙ্গে দেখা হয়নি। ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করছে। যেন চুরি করে চোর পালাচ্ছে।! আর মাত্র দু’পা।
পলাশদা, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
নিজের হাতফসকে নিজেই পড়ে গেলুম। দূর আকাশের গায়ে, ছাদের আলসেতে অপর্ণা। ভিজে শাড়ি ভাঁজে ভাঁজে খুলে খুলে নেমে আসছে। নীল জমিতে ঝরছে শিউলি।
১.৫২ পাগলা মনটারে তুই বাঁধ
যত জোরেই হাঁটি না কেন, কী যেন এক আকর্ষণ পেছন থেকে টানছে। হাঁটার বেগ যতটা হওয়া উচিত কিছুতেই যেন তা হচ্ছে না। স্বপ্নে একবার বাঘ দেখে দৌড়াবার চেষ্টা করেছিলুম। কী ভীষণ চেষ্টা! মাটিতে পা খচমচ করছে অথচ শরীর ছুটছে না। এদিকে বাঘ এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে, মুখে তার কথামালার বাঘের মতো এক ধরনের মিচকি হাসি। পালাতে না পেরে ভ্যা করে কেঁদে ফেলেছিলুম। বাঘ সামনে এসে দু’পায়ে খাড়া দাঁড়িয়ে পড়ল। অবাক হয়ে দেখলুম বাঘ নয়, মানুষ। আমার সংস্কৃতের পণ্ডিতমশাই। চোখে নিকেল ডাটির তলতলে গোল চশমা। খপ করে ডান হাতটা আমার কাঁধে ফেলে বললেন, শাখামৃগ, ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে পার পাবি ভেবেছিস! বল লতা শব্দের প্রথমার একবচনে বিসর্গ আছে, না নেই? আমি আরও জোরে কেঁদে উঠে বললুম, বিশ্বাস করুন আমি জানি না।
তবু আমি হাতিবাগানে এসে গেলুম। বাজার এখন জমজমাট। গাছের বাজার, পাখির বাজার, জীবজন্তুর বাজার। পা থেমে পড়ল। অপর্ণা এখন অনেক দূরে। ছাদের আলসেতে ঝুঁকে আছে। মাথার ওপর সূর্যের অগ্নিগোলক জ্বলজ্বল করছে। গহনগভীর চুলের অরণ্যে ভেসে আছে একটি গোলাপের মুখ। মানুষ আবার গোলাপ হয় কী করে! গোলাপ দেখতে চাও সামনে তাকাও।
সারি সারি টবে তাজা তাজা গোলাপ ফুটে আছে। ছোট ছোট গাছে একটি করে নমুনা ফুল। সাদা, টকটকে লাল, ফিকে গোলাপি, হলদে। এর মধ্যে কোনও এক জাতির গোলাপের নাম মিস মারসেল। মানুষ পাগলের মতো কিনছে। দরদাম করছে। কঁধ দিয়ে এ ওকে ধাক্কা মারছে, ও একে। খাঁচার চন্দনা কর্কশ গলায় চিৎকার করে ক্রোধ প্রকাশ করছে। বাচ্চা দুটো বিলিতি কুকুর তিড়িং লাফাচ্ছে, আর শিশুর গলায় ডাকছে। চুলে পমেড মাখা, কাটগ্লাস চেহারার, গিলে করা হাফহাতা পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক নীল সিল্কের শাড়ি পরা এক ভদ্রমহিলাকে বলছেন, টেরিয়ারের জাতই আলাদা। তেজ দেখেছ, তেজ!
মহিলার বয়স অনেক কম, সম্পর্ক দেখে মনে হচ্ছে মেয়ে নয়, স্ত্রীও নয়। অন্য কোনও ব্যাপার। বড়লোকদের সব থাকে, জীবনদায়িনী ব্যাধি। মহিলা কুকুর ছেড়ে সোনালি রঙের একটা খরগোশের দিকে এগিয়ে গেলেন। দেকেচো, দেকেচো, কী সুন্দর!
ভদ্রলোকের ওপর-হাত খামচে ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন খরগোশের কাছে। অমন খরগোশ আমিও দেখিনি জীবনে। খরগোশ সাদা হয়। এ আবার কোন জাতের জীব! ভদ্রমহিলার আকর্ষণে ভদ্রলোক টাল সামলাতে না পেরে উলটে পড়ে যাচ্ছিলেন। পায়ে বার্নিশ করা জুতো। মহিলার কোমর আঁকড়ে ধরে টাল সামলাতে সামলাতে বললেন, কী যে তুমি করো সুকু!
রাগের সঙ্গে স্নেহ, দেহবোধ মিলেমিশে মানুষের গলাটাকে কেমন করে দেয়। মহিলা চোখের অদ্ভুত ভঙ্গি করে বললেন, কোনও কম্মের নয়, একেবারে ঢ্যাঁড়োস।
আমি যেন সিনেমা দেখছি। ভীষণ মজা লাগছে। একজায়গায় কতরকমের মানুষ! একটু চিন্তা করলেই সৃষ্টিকর্তার অপরিসীম রসবোধে মুগ্ধ হতে হয়। মহিলা হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন। আমাকেই বললেন, গায়ে এক ফোঁটা শক্তি নেই। একটানেই উলটে পড়ে যাচ্ছে।
ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে নিজের মাথার চারপাশে গোল করে হাত ঘুরিয়ে বললেন, নাটবলটু ঢিলে আছে।
