অঞ্জন বললে, ঠিক আছে মাসিমা। আপনার কোনও দুশ্চিন্তা নেই।
অঞ্জন আমার চেয়ে হাজার গুণ স্মার্ট। চালচলনে কোনও জড়তা নেই। আমার যেন সবসময় পায়ে পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। লাজুকলতা লজ্জাবতী। অঞ্জনকে আদৌ দাম্ভিক অহংকারী বলে মনে হচ্ছে না আর। অপর্ণার পাশে প্রথম দেখাটা ছিল হিংসের দেখা। কুৎসিত দৃষ্টিতে দেখেছিলুম বলেই কুৎসিত লেগেছিল। আমার চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ।
অঞ্জন সারাঘরে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে বললে, মেসোমশাইয়ের বেশ টেস্ট আছে দেখেছেন! সাধারণ বাঙালির মতো নয়।
সবই হল পয়সার ব্যাপার।
পয়সায় হয় না জানেন। কালচার একটা বড় জিনিস। এখনকার ইনডাস্ট্রিয়ালিস্টদের অনেকেই। বেশ বড়লোক, ক’জনের রুচি আছে! কাল বাবার সঙ্গে বেলেঘাটায় এক ভদ্রলোকের বাড়ি গিয়েছিলুম। কী ব্যাড টেস্ট। ইউ কান্ট ইম্যাজিন। গায়ে এমন পারফিউম ঢেলেছেন পাশে বসা যায় না। বিদেশি জিনিস। হলে কী হবে, কোনটা ছেলেদের পারফিউম, কোনটা মেয়েদের সে জ্ঞান নেই, সেনস অফ প্রোপোরশন নেই। এমন কাপড়ের সুট বানিয়েছেন, যা আমেরিকান গ্যাংস্টারদেরই মানায়। একটা কুকুর পুষেছেন, যাকে ট্রেনিং দিতে ভুলে গেছেন। সারাবাড়ি অপ্রয়োজনীয় জিনিসে বোঝাই। যেমন লাউড, তেমনি ভালগার।
তা ঠিক। আগেকার জমিদার আর এখনকার নিউ রিচদের মধ্যে অনেক পার্থক্য। তাদের আলাদা একটা মেজাজ ছিল। মন অনেক বড় ছিল।
এই ঘরটাই দেখুন। কত নিট! অন্য কেউ হলে এর মধ্যে রাজ্যের জিনিস ঢুকিয়ে আগলি করে ফেলতেন। আসলে মা আর মাসিমা দুজনেই তো শান্তিনিকেতনের মেয়ে। গুরুদেবের ট্রেনিং-এ রুচিবান।
অপর্ণা একজোড়া চটি এনে অঞ্জনের পায়ের কাছে নামিয়ে দিয়ে বললে, নিন পরে নিন, মা পাঠিয়ে দিলেন। মোজা ময়লা হয়ে যাবে।
অঞ্জন পা গলাতে গলাতে বললে, মাপে একটু বড়।
বাবার পায়ের মাপ সাধারণের চেয়ে একটু বড়।
অপর্ণা বসল না, চলে গেল। শাড়ি পালটেছে। চুল এলো ছিল, এখন খোঁপা করেছে। আমার দিকে একবার মাত্র তাকিয়েছিল। সে তাকানোয় কোনও প্রাণ ছিল না। ইট কাঠ পাথর পুতুলের দিকে মানুষ অমন দৃষ্টিতে তাকায়।
মন আবার ধোঁয়াটে ঘরের মতো ভারী হয়ে উঠল। আমিও তো খালি পায়ে রয়েছি, চটি এল না কেন? দিশি ছেলে শুধু পায়ে ঘুরতে পারে, বিদেশি ছেলের মোজা ময়লা হয়ে যায়। অদ্ভুত বিচার! আমি রোলস রয়েস থেকে এলে আমারও খাতির হত।
অঞ্জন বললে, আপনি কী করেন?
চাকরি, একটা কেমিকেল ফার্মে কেমিস্ট হিসেবে সবে ঢুকেছি।
ও আপনারও টেকনিক্যাল লাইন? আমি ভেবেছিলুম লিটারেচার।
কেন?
আপনাকে দেখলে তাই মনে হয়, কেমন একটা ড্রিমি পোয়েটিক লুক।
বাংলাদেশের এই বয়েসের সব ছেলেকেই মনে হয় ওইরকম দেখতে।
আপনারা অনেক আরামে থাকেন তো? ওদেশে ভীষণ খাটতে হয়। এতটুকু বসবার কি তাকাবার সময় পাওয়া যায় না। আপনি আমাদের ওখানে চলে আসুন। এ দেশে কোনও কিছুরই তেমন ফিউচার নেই। বাবাকে বললে আপনার আই সি আইতে একটা পোজিশন হয়ে যেতে পারে। বিরাট ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি।
ওঁরা অনেক ভাল ছেলে চাইবেন, অনেক বেশি কোয়ালিফায়েড।
আপনি কি খারাপ ছেলে নাকি! তা ছাড়া এক্সপিরিয়েন্স হয়েছে।
অঞ্জনের মা পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকলেন এই ঘরের আরও তিনটে দরজা। কোনটা দিয়ে কোথায় যাওয়া যায়, না গেলে বোঝা যাবে না। অঞ্জনের মা ঢুকতেই আমি উঠে দাঁড়ালুম।
তিনি বললেন, বোসো বোসো, উঠলে কেন?
আমি প্রণাম করার জন্যে নিচু হতেই, তিনি খপ করে আমার হাত চেপে ধরলেন, না না, পায়ে হাত দিতে হবে না, কেউ আমাকে প্রণাম করলে মনে হয় আমি বুড়ি হয়ে গেছি। তুমি বোসো। আমি বসলে ওই চেয়ারে বসব।
হাত ছেড়ে দিলেন। নিজেকে কেমন যেন বোকাবোকা লাগছে। মহিলার চেহারা প্রবীণা ফিল্মস্টারের মতো। বার্ধক্য আসছে বেশ বোঝা যায় হাতের দিকে তাকালে। চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। অল্প অল্প। তবে চোখদুটো দেখার মতো। টানাটানা বিশাল। অলস চোখ নয়। প্রতিটি কথার সঙ্গে চোখ হেলছে, দুলছে, ছোট হচ্ছে, বড় হচ্ছে। একই সঙ্গে দু’ধরনের ভাষায় তিনি কথা বলছেন। ভদ্রমহিলা নিশ্চয় নাচ জানেন। যারা নৃত্যশিল্পী একমাত্র তারাই চোখে কথা বলতে পারেন। সারা শরীরের বাঁধুনি দেখে মনে হচ্ছে নাচার অভ্যাস এখনও আছে। হাতের আঙুল মুদ্রা খেলছে।
আমি আমার জায়গায় বসে পড়লুম। অঞ্জন বললে, মা, মাসিমাকে তুমি বলে দিয়েছ তো আমরা ঝালমশলা এসব একেবারে সহ্য করতে পারি না?
ও জানে। নতুন করে বলার দরকার হবে না। তুই একবার ভেতরে আয় না! দরকার আছে।
ও তোমাদের মেয়েমহল আমার ভাল লাগে না মা। বেশ তো এখানে বসে আছি দু’জনে।
আয় না একবার। চলে আসবি এখুনি।
অঞ্জন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, একটু বসুন, শুনে আসি কী বলছেন। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললে, মা, আমি কিন্তু আগে থেকেই তোমাকে বলে রাখছি, ম্যাজিক আমি দেখাতে পারব না। আমার মুড নেই।
ম্যাজিক তোকে দেখাতে হবে না।
দু’জনেই দ্বিতীয় দরজা দিয়ে ভেতরে কোথাও চলে গেলেন। পাশাপাশি দু’জনকে মা আর ছেলে বলে মনেই হয় না। যেন অন্য কোনও জুটি। ম্যাজিক আবার কী? অঞ্জন ম্যাজিক দেখাতে পারে নাকি! গুণের ঘাট নেই। আবার এক ধাক্কা! এক পাল্লায় আমি, আর এক পাল্লায় অঞ্জন। অঞ্জনের দিকটা ভারে ভূমি স্পর্শ করবে।
