যুবক খটখট করে জুতোর শব্দ তুলে এগিয়ে এলেন। চলনের কী দৃপ্ত ভঙ্গি। যেন লর্ড ক্লাইভ পলাশীর যুদ্ধের পর বিজয় সেনানীর পুরোভাগে মুর্শিদাবাদে ঢুকছেন। এ হাঁটা আমার কাঠামোয় সম্ভব হবে না। ঠ্যাং খুলে যাবে। যুবক বললেন, মিসেস পার্কার কলকাতা ছেড়ে চলে গেছেন।
সেকী, কোথায়?
নেপাল।
ফিরবেন কবে?
কেউ জানে না।
তা ফুল রেখে এলে না কেন?
কার কাছে রাখব! ফ্ল্যাটে চাবি।
জানলে কী করে নেপাল গেছেন!
ওঁর টেলার বললেন। সামনেই তার টেলারিং শপ।
দেন প্রেজেন্ট ইট টু অপর্ণা।
যুবক সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ফুলের তোড়া হাসিহাসি মুখে আমার পিতার বন্ধুমাতার হাতে তুলে দিলেন। তিনি তার স্বপ্নে মশগুল হয়ে বসে আছেন ওদিকে, এদিকে এইসব হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে চলেছে। অপর্ণা ফুল নিতে নিতে বললে, কার জিনিস কে পায়!
অপর্ণা এই কথাটি বেশ বলেছে। কথার মধ্যে অল্প একটু দংশন আছে। পিঁপড়ের কুটুস কামড়। নিরাশ মনে আলোর সামান্য ঝিলিক খেলে গেল।
পঙ্কজবাবু বললেন, একেই বলে মানুষ বরাতে খায়। যাও মা ফুলদানে জল দিয়ে যত্ন করে রেখে এসো। দেখাশোনা করলে সাত দিন ঠিক থাকবে। জলে একটু নুন ফেলে দিয়ো।
বুকের কাছে নীল সাদা লাল হলুদ ফুলের স্তবক ধরে দেবী অপর্ণা এতক্ষণে আমার দিকে তাকাবার অবসর পেলেন। মানুষের মুখ যে কত উজ্জ্বল হতে পারে, আমার ধারণা ছিল না। হাসি যে কত স্বর্গীয় হতে পারে দেখা ছিল না। ভেতরে এতক্ষণ যে অভিমান গুমরোচ্ছিল এই হাসিতে সব শান্ত হয়ে গেল। আমার হাসি আমাকে ছেড়ে ঠোঁটে গিয়ে বসল। বেশ বুঝলাম আমার নিয়ন্ত্রণ এখন ওই ফুলওয়ালির হাতে। সেদিন কীভাবে দেখেছিলুম জানি না, আজ দেখছি সম্পূর্ণ অন্যভাবে। মনের নানারকম রসে জারিয়ে আচারের মতো করে।
অপর্ণা হেসে ভেতরে চলে গেল। তার আসা, তার দাঁড়ানো, তার চলে যাওয়া, শরীরে সূক্ষ্ম শাড়ির বাঁধন, ভেতর থেকে ফুটে ওঠা অন্তর্বাসের আভাস, সবকিছুরই আজ কেমন যেন অন্য এক জগতের ইশারা। একই জগৎ, শিশুর চোখে একরকম, সাধকের চোখে একরকম, লম্পটের চোখে একরকম।
পঙ্কজবাবু বললেন, তোমার সঙ্গে অঞ্জনের পরিচয় করিয়ে দিই। অঞ্জন, পলাশ চট্টোপাধ্যায়, আমার এক নিকট বন্ধুপুত্র। তোমার মতোই ভাল ছেলে। তবে তুমি বর্ন অ্যান্ড ব্ৰট আপ ইন বিলেত, তোমার ‘শিন অ্যান্ড লাসচার’ এই দিশি বস্তুটির চেয়ে অনেক বেশি।
পঙ্কজবাবুর ভায়রা বললেন, ও দেশে মানুষের ভেতর থেকে ঠিক মানুষটিকে বের করে আনার কতরকম ব্যবস্থা। এ দেশের মতো ও দেশে গাধা পিটে ঘোড়া বানাবার চেষ্টা হয় না। গাধাকে দেওয়া হয় গাধার ট্রেনিং, ঘোড়াকে দেওয়া হয় ঘোড়ার ট্রেনিং। সাধে ওরা অত বড় হয়েছে।
অঞ্জন সোফা ছেড়ে উঠে এসে, আমার দু’হাত ধরে করমর্দন করলেন। হাতের পাঞ্জায় বেশ জোর। উঠে দাঁড়াতে হয়েছিল, আবার যে যার আসনে বসে পড়লুম। সারাদিন এইভাবেই বসে বসে কাটাতে হবে নাকি? সে তো হবে মহা শাস্তি।
অঞ্জনের দিকে তাকালেই সে মৃদু হাসছে। একটা কিছু বলতে হয়, কিন্তু হীনম্মন্যতা গলা চেপে ধরছে। নিজেকে ভীষণ ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে। বোকার মতো বসে থাকা যায় না, তাই বললুম, আপনি কী করেন?
আমি রোলস রয়েস ফ্যাক্টরিতে অ্যারোনটিক্সের ট্রেনিং নিচ্ছি।
পঙ্কজবাবু বললেন, যাকে বলে অ্যাভিয়েশন টেকনোলজি। দারুণ লাইন। তোমার আর ক’বছর বাকি আছে?
এক বছর।
তারপর কী করবে?
তারপর হল্যান্ডে যাব হায়ার ট্রেনিং-এ ফ্রানসেও একবার যেতে হবে।
ব্রাইট ফিউচার, ব্রাইট প্রসপেক্ট।
অঞ্জনের বাবা বসে বসে পাইপ খাচ্ছেন। বিদেশি টোব্যাকোর গন্ধ বাতাসে ভাসছে। কী সুন্দর এঁদের জীবন! বড় হতে হতে কত বড় হয়ে যাবেন। তুলনায় সত্যি আমি এক পিগমি। কী দেহে, কী মেধায়, আমার কোনও বিকাশই হল না। এ পরিবারে আমার কোনও স্থান হওয়া উচিত নয়। এঁদের এত বড় বড় আত্মীয়স্বজন! গর্ব না থাকলেও ধনী। আমাকে উপেক্ষার চোখে দেখলে কিছু বলার নেই। যেমন করেই হোক সরে পড়তে হবে।
অপর্ণার মা এসে আমাদের দু’জনকে ডাকলেন, তোমরা ভেতরে এসো বাবা। একটু মেলামেশা করো। সবই যে কেমন ঝিমিয়ে পড়ছে!
অঞ্জন জুতোর ফিতে খোলার জন্যে নিচু হচ্ছিল, অপর্ণার মা বারণ করলেন, থাক থাক, তুমি জুতো পরেই এসো, পরেই এসো। সায়েব মানুষ।
অঞ্জন জুতো খুলেই ফেলল। মোজা পরাই রইল। মাথা তুলে বললে, না না, বাইরের জুতো ভেতরে না ঢোকানোই উচিত। আমার কোনও অসুবিধে হবে না। অঞ্জনের বাবা বললেন, সায়েব তখন যখন বিলেতে। এখন বাঙালি।
সেই বারান্দা পেরিয়ে, উঠোন পেরিয়ে, চওড়া সিঁড়ি বেয়ে আমরা দোতলায় উঠে এলুম। ঢাকা বারান্দায় জাফরির ফাঁকে ফাঁকে রোদ এসে পড়েছে। চারদিক মন্দিরের মতো পরিচ্ছন্ন সুন্দর। কোথা থেকে মৃদু ধূপের গন্ধ আসছে।
যে-ঘরে আমরা এলুম, সে ঘর আগে দেখিনি। মেঝেতে সুন্দর একটা কার্পেট পাতা। ঘরটা বেশ বড়। গোটা তিনেক ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে। সুন্দর সুন্দর আলমারিতে রাশিরাশি বই। একপাশে একটা ঝকঝকে রিডিং টেবল। গোটা দুয়েক সোফা। ঘরে আর কিছু নেই।
সেই ঘরের মধ্যে আমাদের দুজনকে ছেড়ে দিয়ে অপর্ণার মা বললেন, নাও তোমাদের মনের খোরাক রয়েছে। বসে বসে বইয়ের পাতা ওলটাও। আমরা আসব যাব। আজ আর বসে গল্প করার সময় নেই। ইচ্ছে হলে, তোমরা ঘুরেও বেড়াতে পারো। ছাদেও যেতে পারো। বাগানেও নামতে পারো। ওই যে রেডিয়ো, গান শুনতে পারো।
