হ্যাঁ, সে প্রায় এক যুগ আগে।
এই যে, এইমাত্র নিয়ে এল। এ তল্লাটে মিনারেল ওয়াটার কেউ রাখেই না। সেই পার্ক স্ট্রিট থেকে নিয়ে এল।
যাক, পেয়েছে এই যথেষ্ট। এ দেশে এলে, একটাই আমার অসুবিধে, জল। জলাতঙ্ক বলতে পারো।
কই আমাদের তো কিছু হয় না!
হয় না মানে, হয়েই তো আছে। তোমরা গ্রাহ্য করো না।
গেলাসে জল ঢালব দাদা?
থাক, প্রয়োজন হলে আমিই ঢেলে নোব। সিগারেটটা শেষ করে নিই। আচ্ছা, কফির কী হল!
আসছে। তৈরি হচ্ছে। ভেতরে জটলা হচ্ছে। অনেকদিন পরে দুই বোনে দেখা হয়েছে। কলরবলর খুব চলেছে।
শোনো শোনো, বলতে বলতে এক ভদ্রমহিলা ভেতর থেকে বাইরে আসছিলেন, আমাকে দেখেই গম্ভীর হয়ে গেলেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বারকয়েক তাকালেন। বিলেতের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। এঁরা দু’বোনেই অসাধারণ সুন্দরী। বিলেতে থাকার ফলে আরও ফরসা হয়েছেন। ঠান্ডা দেশ গালে আপেলের রং তুলে দিয়েছে। চুলে ববছাট। ঘাড়ের কাছে রেশমের চামরের মতো দুলছে। মেয়েদের বিউটি কেমন বুঝতে শিখেছি। এক রাতেই পেকে ঝানু। হায় হায় সন্ন্যাসার্থ! কী তোমার অধঃপতন! মহিলা কিছু একটা মেখেছেন। বিলিতি সেন্ট। ইংল্যান্ড হল ইয়ার্ডলের জায়গা। তারই সুবাসে ঘর আমোদিত।
মহিলা সংযত গলায় বললেন, অঞ্জু অপর্ণার চেয়ে কত বড় হবে?
তুমি আবার ওইসব মেয়েলি হিসেব নিয়ে এলে! আমার কি আর খেয়াল আছে! কফির কী হল বলো তো!
আসছে আসছে। মিনু বলছে, অঞ্জু অপর্ণার চেয়ে আট বছরের বড়। ইমপসিবল, আমার মনে হচ্ছে, হয় তিন না হয় চার।
তোমার ছেলে, তুমিই ভাল জানবে। হঠাৎ তোমাদের এত হিসেব নিকেশ শুরু হয়ে গেল!
পঙ্কজবাবু বললেন, মেয়েদের নিয়মই ওই, এমন এমন সমস্যা টেনে বের করবে! ডায়েরি রাখার অভ্যাস না থাকলে উত্তর দেওয়া অসম্ভব। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করে, তোমার কত সালে কত তারিখে বিয়ে হয়েছিল, বলতে পারব না।’মাসটা মনে আছে ঋতুর জন্যে। ফাল্গুন মাস, বসন্তের বাতাস, কোকিলের ডাক।
ভায়রাভাই যোগ করলেন, চাঁদের আলো।
চাঁদ? চাঁদ কি ছিল? মনে পড়ছে না।
অপর্ণার মা কফির ট্রে হাতে ঘরে ঢুকলেন। মাথায় অল্প একটু শাড়ির আঁচল টানা। সকালেই স্নান করেছেন। এলো চুল ছড়িয়ে আছে পিঠে। কোথায় নেমেছে! কোমর ছাপিয়ে আরও কত দূরে। এই বয়সেও এত চুল! কেমন করে এমন স্বাস্থ্য সৌন্দর্য বজায় রেখেছেন! আনন্দে থাকলে মানুষ মনে হয় অমর হতে পারে। জীবন থেকে চিমটে দিয়ে একে একে অশান্তির কাটা তুলে তুলে ফেলে দাও, মৃত্যু চিন্তা, অর্থ চিন্তা, স্বার্থ চিন্তা, পারস্পরিক সম্পর্ককে মখমলের মতো মসৃণ করে দাও, জীবনের দৈর্ঘ্য, যৌবনের দৈর্ঘ্য অনেক বেড়ে যাবে। এ পরিবারে সেটা সম্ভব হয়েছে। সব পরিবারে তা তো আর হয় না। নরম আঁচে, মুখ চাপা হাড়িতে, আঙুল মাপ জলে, জীবনের বিরিয়ানি গুমসোচ্ছে। জাফরান, জায়ফল, গরমমশলা, আবার এক ফোঁটা আতর। খুব সুতার; কিন্তু খাদ্য।
অপর্ণার মা বললেন, তুমি লক্ষ্মীছেলে হয়ে এখানে বসে আছ! বড় লাজুক ছেলে।
কফির পেয়ালা চামচে সমেত তুলে নিতে নিতে ডাক্তারবাবু বললেন, লাজুক হলে কী হবে, ভীষণ বুদ্ধিমান। আমি এতক্ষণ বসে বসে ওর ওপর নজর রেখেছিলুম, হি ইজ ওয়েল কম্পোজড, বয়েসের তুলনায় অনেক বেশি ম্যাচিয়োর্ড। সামহাও হি ইজ ভেরি ডিস্টার্বড, ডিপ্রেস্ট, সাইকোলজিক্যালি শে।
পঙ্কজবাবু বললেন, কী করে বুঝলেন দাদা?
বুঝব না? লাস্ট টোয়েন্টি ইয়ার্স আমি যে ওই করছি। অবজার্ভ এ পেশেন্ট, সাজেস্ট এ রেমিডি। হি হ্যাঁজ এ ক্লোজড টাইপ অফ পার্সোন্যালিটি। ওর বাইরে যতটা আছে তার চেয়ে দশগুণ আছে। ভেতরে। ফ্লোটিং লাইক অ্যান আইসবার্জ।
কাপেতে চামচেতে টিং করে একটা শব্দ হল। বাইরের সিঁড়িতে দ্রুত পদশব্দ। একজোড়া নারীপুরুষের কলকণ্ঠ। দ্বারপথে সেই যুবক। বুকের কাছে একটি ফুলের তোড়া, পাশেই গায়ে গা ঘেঁষে অপর্ণা। কী বিচিত্র চিত্র।
১.৫১ বিশাল ধরার চতুঃসীমায়
বুক জ্বলে গেল। দরজার সামনে অপর্ণা ওই বিলিতি যুবকটির পাশে লেফাফার গায়ে ডাকটিকিটের মতো কেমন সেঁটে আছে। ছেলেটির হাতে আবার ফুলের তোড়া। ম্যারেজ রেজিস্টারের অফিস থেকে এল, না চার্চ থেকে? আমার এমন হিংসে হবার তো তেমন কোনও কারণ নেই। তবু হচ্ছে কেন? পঙ্কজবাবুর ডাক্তার ভায়রাভাই ঠিকই বলেছেন, এ ছোকরার প্রকাশিত অংশের চেয়ে অপ্রকাশিত অংশই বেশি। ব্যাটা ডুবসাঁতার কাটছে।
ঠিক টেনিস খেলোয়াড়দের মতো লম্বা চওড়া চেহারা। ইংরেজ নবাবদের মতো বাদামি চুল, ঘাড়ের ওপর কানের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে। ঝুলপির কী বাহার! বিলেতে মানুষকে কী জিনিস বানিয়ে দেয় রে বাবা! প্যান্ট, শার্ট, জুতো, নেকটাই এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায় দেখ। হাতের কবজি আমার পায়ের গোছের মতো। টকটকে ফরসা। মণিবন্ধে কালো ব্যান্ডে সোনার রিস্টওয়াচ। একেবারে ছবির নায়ক। মুখ সামান্য লম্বাটে হলেও, অসম্ভব ধারালো। গ্রিসিয়ান নাক, স্পার্টান চোখ, স্প্যানিশ গোঁফ। আমি গোহারান হেরেছি। স্বয়ংবর সভা হলে রাজকন্যে আমার গলায় ঘেঁটুফুলের মালা ঝুলিয়ে, গাধার পিঠে উলটো বসিয়ে রাজ্যছাড়া করে দিত।
পঙ্কজবাবুর ভায়রাভাই বললেন, কী হল, ফিরে এলে? দিয়ে এলে না?
