লাজুক লাজুক ভাবে বললুম, না না।
তোমার বাবার মুখে সব শুনেছি। তুমি একটু ইনট্রোভার্ট, তাই না?
সেরেছে, সদ্য-পড়া সাইকোলজির জ্ঞান তেড়ে আসছে। বললুম, মাঝে মাঝে ইনট্রোভার্ট, মাঝে মাঝে একসট্রোভার্ট।
তার মানে, তোমার সপ্লিট পার্সোনালিটি। দুটো ব্যক্তিত্ব, দুটো চরিত্র। একই শরীরে দু’ধরনের মানুষ। এটা মনে হয় তোমাদের বংশগত বৈশিষ্ট্য। হরিরও দুটো পার্সোনালিটি। কখনও বিমর্ষ, কখনও উচ্ছ্বসিত, কখনও ভীষণ হিসেবি, কখনও ভীষণ বেহিসেবি। আমরা সবাই তাই, বুঝলে! নানারকম বুদ্ধি প্যাক করে ঈশ্বর আমাদের এইখানে পাঠিয়েছেন। যখন যেটা ঠেলে ওঠে, তখন আমরা সেইভাবে কাজ করি। শুনেছি তোমার খুব ধর্মভাব, ভগবৎ বিশ্বাস। খুব ভাল কথা। আজকালকার ছেলেরা সব অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। দেশে যেন একটা মর্যাল ফেমিন এসেছে। তবে কী জানো, ধর্ম মানে কিন্তু সংসার ত্যাগ নয়। আমার মাকে দেখলে তো সেদিন! ওঁর দর্শনটর্শন হয়। ঠাকুর ওঁর সঙ্গে কথা বলেন। কিছু ক্ষমতাও লাভ হয়েছে। মুখ দেখে মানুষের স্বভাব, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব বলতে পারেন। ভালমানুষ খারাপমানুষ চিনতে পারেন। যাকে যা বলেন সব মিলে যায়। সবাই বলেন বাকসিদ্ধা।
গাড়ি চালাতে চালাতে বেশি কথা বলা ঠিক নয়। অন্যমনস্ক হয়ে যেতে হয়। আর একটু হলেই রিকশার পেছনে ভিড়িয়ে দিয়েছিলেন। খ্যাক করে ব্রেক কষে কোনওরকমে দুর্ঘটনা এড়িয়ে গেলেন। এইবার রাস্তার দিকে মন চলে গেছে। কথা বন্ধ। ঘুমঘুম ভাব কেটে গেছে। নানারকম চিন্তা আসছে। নানারকম আশঙ্কা। কেবলই মনে পড়ছে ঠাকুরের সেই গল্প:
এক জেলে রোজই অন্যের পুকুরে মাছ চুরি করতে যায়। চোরকে ধরার জন্যে একদিন সবাই খুব সতর্ক হয়ে রইল। গভীর রাত, জেলে জাল ফেলেছে জলে। ঝপাত করে যেই না শব্দ হওয়া, সবাই তেড়ে এল ধর ধর করে। জেলে দেখলে মহা বিপদ। পালাবার সব পথ বন্ধ। সে তখন ঢুকে পড়ল এক মানকচুর জঙ্গলে। ছাইগাদা। সর্বঅঙ্গে ছাই লেগে গেল। হঠাৎ তার মাথায় এক বুদ্ধি খেলে গেল। সারাগায়ে বেশ করে ছাই মেখে সে গিয়ে বসল এক গাছতলায়। চোখ বুজিয়ে ধ্যানস্থ। যারা চোর ধরতে এসেছিল তারা চোর পেল না, পেল ধ্যানমগ্ন এক সাধুকে। খবর ছড়িয়ে পড়ল। সবাই এসে সাধুকে প্রণাম করতে লাগল। ফলমূল মিষ্টি পয়সা প্রণামী পড়তে লাগল। সাধু কিন্তু চোখ খোলে না, কিছু গ্রহণ করে না। এতে সকলের শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল। সাধু চোখ বুজিয়ে সেই কপট ধ্যানে ভাবতে লাগল, ছিলুম চোর, সাধুর ভান করাতেই আমার এত খাতির। সত্যি সাধু হলে আমার কী অবস্থা হবে! বলা যায় না ঈশ্বরকেও হয়তো পেয়ে যেতে পারি।
আমি কি সেই চোর! বসে আছি সাধুর আসনে! দুদিন আগে হলে জোরগলায় বলতে পারতুম, না, আমি সাধুই। আজ আর বলার ক্ষমতা নেই। মেফিস্টোফিলিস অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছে। চুরুট আর ওডিকোলোনের গন্ধ। ফাউস্ট এখন ক্রীতদাস। ব্লেক হলে বুক ফুলিয়ে বলতে পারতুম:
The pride of the peacock
is the glory of God
The lust of the goat
is the bounty of God
The wrath of the lion
is the wisdom of God
The nakedness of woman
is the work of God.
The road of excess
leads to the palace of wisdom.
গাড়ি ঢুকল বাড়িতে। সেই রাতের চেয়ে বাড়িটিকে আরও বিশাল মনে হচ্ছে। আরও সুন্দর। আজ মনে হচ্ছে, অনেকের মধ্যে থাকলে মানুষ খুব একটা বেচালে চলতে পারে না। যে ফাঁক গলে শয়তান ঢোকে, সেইসব প্রবেশপথে প্রহরী মোতায়েন হয়ে যায়।
আরে এসো এসো, বলে যিনি আমাকে অভ্যর্থনা করলেন, তিনিই মনে হয় সেই বিলাতবাসী ভদ্রলোক। আমাকে একটু বাজিয়ে দেখতে চান, সুরে বলব না বেসুরো বাজব! কঁচায় পাকায় মেশানো একমাথা চুল। চোখে সোনার ফ্রেমের ধোঁয়াটে চশমা। পরনে বিলিতি সুট। সাদা শার্টে অদ্ভুত সুন্দর ডোরা কাটা। দেখলেই বোঝা যায় এ দেশের জামাকাপড় নয়। কেটেছে সায়েব দরজি।
সেদিন ভাল বুঝতে পারিনি, নীচের দিকে সেভাবে তাকিয়ে দেখা হয়নি, মেঝেটেঝে পুরো মার্বেল পাথরে মোড়া। পা দিতে ভয় করে। ভয়ে জুতোজোড়া খুলে ফেললুম। আমার পায়ের চেয়ে মেঝে অনেক দামি। পঙ্কজবাবুর ভায়রাভাই কিন্তু জুতো পরেই চলাফেরা করছেন। সে জুতোর কী বাহার! বাদামি রং, মুখটা সরু, পালিশ পেয়ে আয়নার মতো ঝকঝক করছে।
স্টেশনের প্রথম শ্রেণির ওয়েটিং রুমে যেরকম হাতলঅলা বড় ডেকচেয়ার থাকে সেইরকম চেয়ারে বিলিতি ভদ্রলোক বসলেন। পায়ের ওপর পা তুলে। ভেবেছিলুম তোলা পা-টা থিরথির করে নাচাতে থাকবেন। ইংলিশ এটিকেট। পা পক্ষাঘাতের পায়ের মতো অনড় রইল। পিতা উপস্থিত থাকলে বলতেন, দেখেছ কী সংযম! দেখে শেখো।
সোনালি প্যাকেট থেকে সাধারণ মাপের চেয়ে বড় একটি সিগারেট বের করে ঠোঁটে চাপতে চাপতে বললেন, তোমার নাম?
পলাশ চট্টোপাধ্যায়।
প্যাট করে লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরালেন। একমুখ ধোয়া রিং রিং করে বাতাসে ছেড়ে দিয়ে বললেন, কী করো!
আজ্ঞে কেমিস্ট।
হাউ নাইস, হাউ নাইস! তোমার সঙ্গে মিলবে ভাল। আমি ডাক্তার, তুমি কেমিস্ট।
পঙ্কজবাবু ভেতরে গিয়েছিলেন, এক হাতে একটা বোতল, আর এক হাতে একটা গেলাস নিয়ে বেরিয়ে এলেন। বোতল আর গেলাস টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন, আপনি জল চেয়েছিলেন দাদা?
