সিঁড়ি দিয়ে একটা গলা উঠে আসছে, সঙ্গে জুতোর সংগত। পঙ্কজবাবুই এলেন। আজ বেশ একটু একা একা থাকতে ইচ্ছে করছিল। ভেবেছিলুম নিস্তব্ধ দুপুরের নির্জনতায় মুকুর খামটা খুলব। সূর্যের আলোর দিকে তুলে ধরে দেখেছি, ভেতরে একটা আংটি আছে। পাট করা পুরু এক খণ্ড কাগজ আছে। সব ভেস্তে গেল। এইবার শুরু হবে চা আনো, কিছু খাবার ব্যবস্থা করো।
স্নান করে বেরোতেই পিতা বললেন, কী ব্যাপার বলল তো! আজ এতবার চান করছ! ঋতু পরিবর্তনের সময়, অসুখবিসুখে পড়বে নাকি?
ভীষণ গরম লাগছিল, তাই!
তোমাদের সহ্যশক্তি বড় কম।
পঙ্কজবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, কার সহ্যশক্তি?
আজকালকাল ছেলেমেয়েদের।
ও সে আমাদের জন্যেই, আমরাই দায়ী। আমরা সব শিখিয়েছি, সহ্য করতে শেখাইনি। দ্যাট ইজ নট এ পার্ট অফ আওয়ার এডুকেশন।
বাট দ্যাট ইজ অ্যান্ড ওয়াজ এ পার্ট অফ মাই এডুকেশন। আমাদের বাড়িতে তুমি একটা পাখা খুঁজে পাবে না। গরমে গরম সহ্য করো, শীতে শীত। তুমি মানুষ, জীবজগতের জীব, নিজেকে অ্যাডজাস্ট করো ঋতুর সঙ্গে। বাঘ পাখার বাতাস খায়!
তোমার আবার সবকিছু একস্ট্রিম। বাঘ থাকে জঙ্গলে, গাছের ঠান্ডায়, মানুষ থাকে শহরে কংক্রিটের জঙ্গলে। বাতাসের জন্যে একটু বাতাসের প্রয়োজন হতেই পারে। সহ্য জিনিসটা একটু অন্যধরনের।
যেমন?
সহ্য মানে উতলা না হওয়া। সহ্য মানে নেগেশন নয়। সব আসুক। আমার পাত্র কানায় কানায় ভরে উঠুক অমৃতে গরলে, আমি কিন্তু অটল।
রাইট ইউ আর। খুব ভাল বলেছ। আমরা বলি ভাল, করি তার উলটো।
আঃ সে তুমি ঠিক বলেছ। মানুষের আধখানা শয়তানের দখলে, আধখানা দেবতার দখলে। একবার এ চুলের মুঠি ধরে, একবার উনি ধরেন। আর আমরা চিৎকার করে বলি, প্রাণ যায় রে পাঁচু।
দার্শনিক আলোচনা হঠাৎ থামিয়ে পঙ্কজবাবু বললেন, নাও বাবা রেডি হয়ে নাও, রেডি হয়ে নাও, ভীষণ দেরি হয়ে গেছে। দেরি হত না, টায়ার ফেঁসে গিয়ে এমন বিপদে ফেলে দিয়েছিল!
আমি কিছুই না বুঝে, দুই গুরুজনের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। পিতা বললেন, নাও নাও, জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে নাও, উনি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন?
কোথাও যেতে হবে?
হ্যাঁ, তোমাকে নিতে এসেছেন।
পঙ্কজবাবু বললেন, বিলেত থেকে হঠাৎ আমার ভায়রা এসেছে, তারা তোমাকে দেখার জন্যে একেবারে পাগল। কিছুতেই শুনবে না।
আমাকে আর দেখার কী আছে? আমি তো তেমন কেউ নই।
পিতা একটু রুষ্ট হয়ে বললেন, তোমার সব ভাল, তোমার ওই ঠোঁট-ফোলানো অভিমানের কথা শুনলে গা জ্বলে যায়।
পঙ্কজবাবু বললেন, আহা, ওকে তুমি শুধু শুধু বকছ। তোমার রসকষশূন্য জীবন, অত রুক্ষ কি সবাই হতে পারবে! এসব কথা আসে অ্যামবিশন থেকে। আমাকে সবাই দেখুক এই ইচ্ছে পূর্ণ না হলেই অভিমানে মানুষ বলে, আমাকে দেখে কী হবে! বিজ্ঞান নিয়েই জীবন কাটালে, এইবার একটু সাইকোলজি নাড়াচাড়া করো। আমি এখন খুব সাইকোলজি পড়ছি, মেয়ে বড় হয়েছে তো, স্ত্রীর বয়েস হচ্ছে। যাও বাবা, যাও, একটু সাজগোজ করে এসো।
ঘরে এসে জামাকাপড় পালটাতে পালটাতে মেজাজটা ভীষণ খিঁচড়ে গেল। সারারাত জেগে, তালগোল পাকিয়ে শরীরটা তেমন ভাল নেই। চোখদুটো ভেতরে টানছে। জ্বালা করছে। ঘুমঘুম পাচ্ছে। এখন সেজেগুঁজে আদিখ্যেতা করতে যাও! কতরকমের বিপদ যে পৃথিবীতে আছে! নিজেকে নিয়ে মানুষ কতটুকু সময় বাঁচতে পারে। সব সময় দানখয়রাত করে দাও। ইনি আবার সাইকোলজি ধরেছেন, মনের ভেতর শুঁড় চালিয়ে কখন কী টেনে বের করে আনবেন কে জানে! আমার সাইকোলজি এখন খুব একটা সোজা রাস্তায় চলছে না।
গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে পঙ্কজবাবু বললেন, সামনে বোসো, সামনে বোসো। তোমাকে ছোট্ট একটু জ্ঞান দিই। এ গুড পিস অফ অ্যাডভাইস। ডোন্ট মাইন্ড মাই বয়।
আজ্ঞে হ্যাঁ বলুন। কিছু মনে করব না।
সহ্যশক্তি আছে তো!
নিশ্চয় আছে।
ওয়েল। উঠে বোসো, বলছি।
সামনের আসনে বসলুম। পঙ্কজবাবুর আসনের পেছন দিকে একটি তোয়ালে ঝুলছে। তিনি খুব শান্ত মেজাজে, ধীরে সুস্থে স্টিয়ারিং-এ বসলেন। নিচু হয়ে সামনে ঝুঁকে পাশে হেলে পড়ে, গাড়ির কলকবজা দেখলেন, তারপর সোজা হয়ে আমার দিকে তাকালেন। মুখে একঝলক হাসি। এতক্ষণ মাথা নিচু করে ছিলেন। এত ফরসা, শরীরে এত রক্ত, চোখমুখ গোলাপি হয়ে গেছে। হাসির রেখা আরও দীর্ঘ হল। মৃদু স্নেহের গলায় বললেন, ড্রাইভারে যখন গাড়ি চালায়, তখন তুমি সামনে বসো, পিছনে বসো, কিছু এসে যায় না। কিন্তু গাড়ি যখন এমন কেউ চালান, যিনি তোমার আত্মীয়, বন্ধু, কি প্রিয়জন, তখন তোমাকে সামনে চালকের পাশে বসতে হবে। ভদ্রতা। পেছনে বসলে মনে হবে তিনি ড্রাইভার, মনিবকে নিয়ে চলছেন। খুবই তুচ্ছ ব্যাপার। হলে কী হবে! এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেন্টিমেন্ট।
চাবি ঘোরাতেই ইঞ্জিন শব্দ করে উঠল। গাড়ি চলতে শুরু করল। বাতাসে ঘুম এসে যাচ্ছে।
রোদ, ছায়া, লোকজন, কলরব, কোলাহল, সব যেন চলেছে স্বপ্নের ভেতর দিয়ে। শরীরে বেশ একটা আমেজ আসছে। শীতকালে গরমজলে স্নান করলে এইরকমের একটা আরাম হয়।
বুঝলে, গাড়িটাকে এবার সার্ভিসিং-এ পাঠাতে হবে।
জড়িয়ে জড়িয়ে বললুম, আজ্ঞে হ্যাঁ।
তুমি ঘুমোচ্ছ নাকি?
ঘুমঘুম পাচ্ছে।
অত রাত জেগে পড়ার অভ্যাস ছাড়ো। খুব তাড়াতাড়ি হজমশক্তি নষ্ট হয়ে যাবে। ভোরে উঠে পড়বে। ভোরের মতো ভাল সময় আর কিছু নেই। তুমি আবার ভীষণ স্টুডিয়াস।
