নীচে। চৌবাচ্চায় জল আছে। পাতকো থেকে টাটকা তুলে নেওয়া যায়।
তা হলে আমিই আগে যাই।
মুকু বেড়াতে বেড়াতে এপাশে চলে এসেছে। এরই মধ্যে চুলটুল খুলে ফেলেছে। হাতে একটা চিরুনি। পেছনটা রুপো বাঁধানো। চুলের ডগা ধরে খেচাত খেচাত করে বারকতক আঁচড়ে বললে, বাড়িটা বেশ নির্জন, না রে দিদি?
জন্তুজানোয়ারও আছে। রাত আসুক দেখতে পাবি।
ওপাশ থেকে ডাক ভেসে এল, মুকু, মুকু, আমার সুটকেসের চাবি কোথায়, মুকু, আমার সুটকেসের চাবি কোথায়?
আসি, বলে মুকু চলে গেল। এরা দু’বোনই কেউ ডাকলে আসি বলে উত্তর দেয়। গলার স্বরও বেশ মিষ্টি।
আর কী কী ভাল ভাল জিনিস স্বভাবে লুকিয়ে আছে কে জানে? আমার পিতাঠাকুর প্রথমে মুগ্ধ হবেন, তারপর আমার স্বভাবের খুঁত বের করে, এই উৎকৃষ্ট উদাহরণের পাশে ফেলে আমাকে নীচে নামাতে নামাতে মনুষ্যাধম জন্তু বলে, তলায় একটি রেখা টেনে দেবেন।
পেছন মহল ছেড়ে বার মহলে এসে দেখা গেল এলাহি ব্যাপার। বিশাল ট্রাঙ্কের ডালা খোলা। তার মধ্যে শুধু বই আর বই। জামা, কাপড়, জুতো, ছাতা, লাঠি, চশমা, তোয়ালে, গামছা, ধরাশায়ী। সৈনিকের মতো চারপাশে ছড়ানো। একটা সুটকেস মুখ ভার করে পড়ে আছে একপাশে। তার সামনে থেবড়ে বসে আছে মুকু।
মেসোমশাই হাঁটুতে চাপড় মারতে মারতে বললেন, তুমি আজকাল ভীষণ কেয়ারলেস হয়ে যাচ্ছ মুকু। আমার বেশ মনে আছে তোমাকে আমি চাবিটা দিয়েছি। দেবার সময় এ কথাও বলেছি, দেখো হারিয়ো না যেন।
মুকু খুব ধীর গলায় বললে, সব চাবিই ঠিক রইল, আর ওটাই হারিয়ে গেল?
এ কথার মানে? তার মানে তুমি বলতে চাইছ, আমি মিথ্যে কথা বলছি! তোমাকে না দিয়ে বলছি দিয়েছি। আমি তোমার চোখে এত হীন, এত নীচ! তা হলে তো আমার আর বেঁচে থাকা চলে না। আমার আত্মহত্যাই করা উচিত। তোমার মা ঠিকই বলে, মেয়েরা কখনও আপনার হয় না।
মুকুর মুখ চুন। কনক কিছু বলব বলব করেও বলার সাহস পাচ্ছে না। মেসোমশাই টেবিলের ওপর থেকে টুপিটা তুলে নিলেন। মনে হয় টুপি পরেই আত্মহত্যা করবেন। যেতে হলে সেজেগুঁজেই যাওয়া ভাল। আমাদের পাড়ার গবা গামছা পরে গলায় দড়ি দিয়েছিল। মহিলারা। দেখতে ছুটলেন। ফিরে আসতে আসতে বললেন, মুখপোড়া ভারী অসভ্য। কুমুদবাবু ফুলশয্যার পোশাকে গলায় মালাটালা পরে কলকাতার ভাল হোটেলে ঘর ভাড়া নিয়ে বিষ খেয়ে মারা গেলেন। নীল চিঠির কাগজে লিখে গেলেন, চিন্তামণি, আমার এই দেহখানি তুলে ধরো, তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো। ইতি, কুমুদের লাশ। কে এই রমণী! সবাই বললে, ফিমের হিরোইন।
টুপিটা তুলতেই কনক কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের গলায় বললে, ওই তো আপনার। চাবি।
মেলোমশায় ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। রিঙে লাগানো ছোট দুটি চাবি। মুকু ফোঁস করল। কপাল ক্রমশ হাঁটুর দিকে ভাঙছে। পিঠ নুয়ে পড়ছে। ফুলে ফুলে উঠছে। মেসোমশাই বললেন, বয়েস বাড়ছে, বয়েস। কিচ্ছু করার নেই। এজলাসে উঠে বাদী বিবাদী নাম ভুল হয়ে যায়। ছ’বার কোঁত পেড়ে আজকাল শিবস্তোত্র পড়তে হয়। বাতে ধরেছে। তবু কান্না! কনক, আমার হয়ে ক্ষমা চেয়ে নাও। বলো, টু আর ইজ হিউম্যান, টু ফরগিভ ডিভাইন।
কনক মুকুর পিঠে হাত রেখে বললে, কী হচ্ছে কী? শুধু শুধু কাঁদছিস কেন?
দিদির কথায় ফল উলটো হল। মুকু হাপরের মতো ফুলতে লাগল আর সাপের মতো হিসহিস।
বাড়ি ভরে গেছে মেয়েলি জিনিসপত্রে। লম্বা লম্বা শাড়ি নেমে গেছে দোতলা থেকে একতলায়। তারে ঝুলছে সায়া, ব্লাউজ। বারান্দায় হিল-তোলা জুতোচুল বাঁধার ফিতে, মাথার কাটা, সেফটিপিন, মাথায় মাখার তেল, সাবান। সারা বাড়িতে একটা মেয়েলি গন্ধ। জানি না বাবা, পিতাঠাকুর ফিরে এসে কী মূর্তি ধরবেন। একটা নয়, দু-দুটো মেয়ে। ছোট হলে কথা ছিল না, বেশ বড়সড়। অতিথিরা খাওয়াদাওয়া সেরে দক্ষিণের ঘরে একটু কাত হয়েছেন। দীর্ঘ ট্রেনভ্রমণের ক্লান্তি কাবু করে ফেলেছে। মেসোমশাইয়ের নাক ডাকছে মিঠে সুরে। যতটুকু জানা গেল, এঁরা মাসখানেক থাকবেন। মুকু বি এ পরীক্ষা দেবে, কনকের হবে চিকিৎসা। টনসিলে বেচারা বড়ই ভুগছে। কনক বি এ পাশ করে বসে আছে। আরও পড়বে না বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে, এই নিয়ে দোটানা চলছে। পড়লে ফিলজফি নিয়ে এম এ করবে। অসম্ভব ভাল রাঁধে। এত সুন্দর ঝোল বেঁধেছিল, মুখে লেগে আছে এখনও। ওই সেই সংগীতের মতো। পিতা রান্নার থিয়োরি খুব ভালই জানেন, প্র্যাকটিক্যালে কনকের কাছে গোহারান হারবেন।
আমিও শুয়ে পড়েছি। আরাম হারাম হ্যাঁয় নোটিশটি আপাতত উলটে রেখেছি মনের দেয়ালে। যেখানে শুয়ে আছি, সেখান থেকে কনক আর মুকুর পা দেখা যাচ্ছে। মেসোমশাইয়ের ভুড়িটি ওঠানামা করছে নিশ্বাসের তালে তালে। নির্জন দুপুরে আড় হয়ে শুয়ে শুয়ে যুবকের যুবতীর সুডৌল পদযুগল দর্শন সম্পর্কে শাস্ত্রের কী সাবধান বাণী আছে জানি না। চোখ যদি অনবরতই ওদিকে চলে যেতে চায় তা হলে আমি কী করতে পারি। বিল্বমঙ্গল হয়ে যাব? রে চক্ষু, এই কাটার খোঁচায় দিলুম তোর বারোটা বাজিয়ে। সে মনের জোর আমার নেই। বাঁ দিকের দেয়ালে ক্যালেন্ডারে কেষ্টঠাকুর বসে আছেন কদমতলায় নধর একটি গাভীর গলা জড়িয়ে। সেদিকে তাকাতে কী হয়! দ্বারকা মথুরা হয়ে সোজা কুরুক্ষেত্রে চলে যাও না কেন! সেখান থেকে ঠেলে ওঠো মহাপ্রস্থানের পথে। মন যার লোভী সে হবে সন্ন্যাসী! কুঁজোর চিত হয়ে শোবার শখ। একবার করে ক্যালেন্ডারের দিকে ঘাড় ঘোরাচ্ছি, ঘাড় অটোম্যাটিক ঘুরে যাচ্ছে উলটো দিকে। লাল মেঝের ওপর দিয়ে চিনি-লোভী পিঁপড়ের মতো দৃষ্টি গুটিগুটি গিয়ে ঠেকছে সঠিক স্থানে। পা। পা থেকেই কি পাপ শব্দ এসেছে। ভাষাতত্ত্ববিদরা বলতে পারেন। সায়ার সামান্য অংশ, শাড়ির পাড়। চিত্ত বড় চঞ্চল হয়ে উঠছে। যে নিজেকেই নিজে সামলাতে পারে না, সে সামলাবে জগৎ! এই বড় বড় চোখে তাকিয়ে। কামিনীকাঞ্চনাসক্ত তাবৎ মানবকুলকে স্তম্ভিত করে ফেলবে! দ্বিতীয় বিবেকানন্দ হয়ে পৃথিবী কাঁপাবে! কুলকুণ্ডলিনী জেগেছে ঠিকই তবে তিনি সহস্রারে না উঠে নীচের দিকে নেমে বসে আছেন। ভিমরুলের চাকে খোঁচা। এই তো গত পরশু দিনই পড়লুম, শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন কামিনীকাঞ্চন ভোগ। যে-ঘরে আচার, তেঁতুল আর জলের জালা, সে ঘরে বিকারের রোগী থাকলে মুশকিল। আমি কি বিকারের রোগী! তিন দিন আগে আমাশার রোগী। আজ দেখছি বিকারের রোগী! মনের কোনও উন্নতি হয়নি। অহংকার চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। আহা, ছি ছি।
