কদিন ধরেই অল্প অল্প ফুলছিল। আজ দিন তিনেক হল ভীষণ ফুলেছে।
দুটো পাতাই?
হ্যাঁ দুটোই, এই দেখো না।
এর সঙ্গে আর কোনও অসুবিধে আছে?
আছে। প্রস্রাব তেমন ভাল হচ্ছে না। চলাফেরা করলে হাঁপ ধরছে, মাথা ঘুরছে।
খিদে?
একেবারে নেই। খেলেই গা গুলোচ্ছে। বমিবমি লাগছে। ওই দেখো না, অনেকদিন আলুর চপ খাইনি, সকালে গোটা চারেক গরম চপ এনেছিলুম, আধখানা খেয়ে ফেলে রেখেছি। ওপরে গরম শিঙাড়া দিলে মুখে রুচল না। চা অত ভালবাসতুম, চা-ও আর ভাল লাগে না। এক চুমুক খাই আর ফেলে দিই। আমার কী হল বলো তো?
পিতা চৌকির একধারে বসে বললেন, হুঁ। আজই, এখুনি হগ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, না হয় কল দিতে হবে। ফেলে রাখা যাবে না।
তুমি এক পুরিয়া হোমিওপ্যাথি দাও না আগে। তোমার ওষুধে আমার ভীষণ কাজ হয়।
শুনুন, আমি ঠেকা দিতে পারি, পারিবারিক চিকিৎসা পর্যন্ত আমার জ্ঞান। ওর ওপর বিশেষ ভরসা। করা যায় না।
আমি হরিশঙ্কর অ্যালোপেথিতে যেতে চাই না। ভীষণ খরচ।
খরচের কথা কে আপনাকে ভাবতে বলেছে? সে ভাবনা আমার। আপনি জামাকাপড় পরে নিন।
এ বেলা থাক, ও বেলা হবে।
কথা একদম বাড়াবেন না। যা বলব তাই শুনতে হবে।
আচ্ছা, সে আমি পরছি। তোমার অবাধ্য হবার সাহস আমার নেই। তার আগে তোমাকে আর একটা জিনিস দেখাই। বড় মূল্যবান!
মাতামহ সেই সিন্দুকটি খুললেন। কতকাল আগের কোন পূর্বপুরুষের জিনিস কে জানে! একসময় অনেক কারুকাজ ছিল। কাঠের দুটো চোখ বসানো। বয়েসে চোখের দৃষ্টি ম্লান হয়ে গেছে। ডালা-খোলা সিন্দুকের সামনে মাতামহ ঝুঁকে পড়লেন। দু’হাত ক্রমশ নীচের দিকে নেমে চলেছে। এত কী জিনিস আছে।
একেবারে তলা থেকে কাপড়ের বাক্সের মতো একটা জিনিস বেরোল। সেটি নিয়ে তিনি চৌকিতে এসে বসলেন। সুতোর ফস খুলতে খুলতে বললেন, বড় পবিত্র জিনিস হরিশঙ্কর, তুমি কুমারী পুজোর কথা শুনেছ?
শুনেছি, দেখিনি কোনওদিন।
তুলসীর বয়েস তখন সাত কি আট।
মাতামহ কথা বন্ধ করে বাক্সর ঢাকা খুললেন। অদ্ভুত এক ধরনের গন্ধ বেরোল। প্রাচীন কালেরও একটা গন্ধ আছে। সময়ের সুবাস। মাতামহ বললেন, এটা একটা বেনারসি। এর বুননে বুননে সোনা আর রুপোর সুতোর কেরামতি! জমি আর আঁচলা খুললে তোমাদের তাক লেগে যাবে। জমিদার প্রসন্ন। চৌধুরীর বাড়িতে খুব বড় পুজো হত।
কোথায়?
বলাগড়ে। সেইখানে তুলসীকে কুমারী করেছিল। সে এক দৃশ্য, হরিশঙ্কর। তুলসীর সেই রূপ! বেনারসি পরেছে। গায়ে গহনার সাজ, এলো চুল, ফুলের মালা, মটুক, রাজরাজেশ্বরীর মতো সিংহাসনে বসেছে, ধূপ আর ধুনোর ধোঁয়া। তুমি দেখো হরিশঙ্কর, পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে একটা বেনারসির পরমায়ু কত বেশি। তুলসী কোথায় চলে গেল! তুলসী! যাবার আগে তোমাকেই দিয়ে যাই, বড় পবিত্র জিনিস। যে-সংসারে থাকবে, সে সংসারের মঙ্গল।
আয় আয়, প্রণাম কর।
কাছে এগিয়ে গেলুম। একজনের না-থাকাটা যত দূরে সরে যাচ্ছে, তার রেখে যাওয়া জিনিসের মূল্য তত বেড়ে যাচ্ছে। তুমি ছিলে এই তো তার প্রমাণ। এই ঘরে, ও ঘরে, এ বাড়িতে, ও বাড়িতে, দুটি পা চলে বেড়াত, একটি শরীর নিশ্বাস নিত, দুটি চোখ দেখত, হাসি খেলত ঠোঁটে, কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়াত। সেই বলাগড় জানি না কোথায়। যাইনি কোনওদিন। গ্রামের পথে ধুলো উড়ছে। শরতের শিশির পড়ে আছে ভোরের ঘাসে। শিউলি ঝরে, এখনও ঝরে। জমিদার প্রসন্ন চৌধুরী, কে তিনি? অষ্টমীর দ্বিপ্রহর, একটি মেয়ে এই বেনারসি পরে সিংহাসনে বসে আছে, জলচৌকিতে রুপোর থালার ওপর তার দুটি পায়ে কী ফুল? জবা, পদ্ম, টগর, শিউলি। হোমের আগুন, ধূপের ধোঁয়া, ধুনো, গুগগুল, চন্দন। কপালে ঘাম, ঠোঁটে মুক্তোর বিন্দুর মতো ঘাম। আমার মা। পৃথিবী আরও সাত বছর, দশ বছর পাক খেল মহাশূন্যে। কে জানত তখন তিনিই আমার মা হবেন। তারপর খেলা না ফুরাতে খেলাঘর ভেঙে যায়। কেউ যদি এইসময় ওই রবীন্দ্রসংগীতটি একটু শোনাতে পারতেন:
ওই-রে তর দিল খুলে
তোর বোঝা কে নেবে তুলে।
সামনে যখন যাবি ওরে,
থাক না পিছন পিছে পড়ে—
পিতা বললেন, মনটা বড় খারাপ করে দিলেন।
শোনো হরিশঙ্কর, এ খারাপে বড় আনন্দ আছে। তোমাকে বলি, আনন্দে তেমন আনন্দ নেই। থাকার চেয়েনা-থাকাটা আরও বেশি থাকা। তুমি কত লেখাপড়া জানা মানুষ, তোমাকে আমি কী বলব? আমার কাছে আর একটা জিনিস আছে, দেখবে? সেটা কিন্তু তোমাকে আমি দিতে পারব না।
মাতামহ আবার উঠে গেলেন সিন্দুকের কাছে। তলার দিকে হাত চালালেন। একটা বড় খাম বেরিয়ে এল। তার মধ্যে অজস্র টুকরো টুকরো কাগজ। বেছে বেছে ভাঁজ করা একটা কাগজ তুলে নিলেন। দোক্তার পাতার মতো রং হয়ে গেছে। ভাঁজে ভাঁজে ফাট ধরেছে।
এটা কী বলো তো? তুলসীর চিঠি। বিয়ের পর বাপের কাছে তার প্রথম চিঠি। সেই তোমরা জামতাড়ায় চেঞ্জে গিয়েছিলে, সেইখান থেকে লিখছে। দেখো, তোমার সম্পর্কে কী লিখেছে!
‘তোমার জামাই একটু রাগী হলে কী হবে, মনটা আকাশের মতো, কিছুই লেগে থাকে না। সিল্কের কাপড়ের মতো মসৃণ, তবে ঘষা লাগলেই গরম হয়ে ওঠে। তুমি কিছু ভেবো না, আমার চারদিকেই সুখ।‘
জানতে তুমি! এসব তুমি জানতে? কত বড় ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট!বলো একবার!হাতের লেখাটা দেখো, ছোট্ট ছোট্ট, মুক্তোর দানার মতো। ছিল কালো, হয়ে গেছে বাদামি। হ্যাঁগো, অদৃশ্য হয়ে যাবে না তো?
১.৫০ The road of excess
The road of excess leads to the Palace of Wisdom.
পিঁক পিঁক করে বারকতক হর্ন বাজল। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হবার শব্দ হল। বাথরুমে চান করতে করতে শুনছি। এই অবেলায় কে আবার এলেন! তিনজন গাড়িধারী আসতেন এ বাড়িতে। প্রতাপ রায়। তার খেলা শেষ। ফুল ঝরে গেছে, ভ্রমর উড়ে গেছে। মাতুল, তাঁর গাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে। পড়ে রইলেন পঙ্কজবাবু। মনে হয় তিনিই এসেছেন। পিতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হঠাৎ ভীষণ বেড়ে গেছে। মানুষে মানুষে সম্পর্কে নদীর মতো জোয়ার ভাটা খেলে। দিনকতক খুব আসা-যাওয়া চলে। মাখামাখি, আহার-বিহার, তারপর মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, কারুর সঙ্গে কারুর আর দেখাসাক্ষাৎ নেই।
