মাতামহ জিজ্ঞেস করলেন, কোথা থেকে তুমি এসব জিনিস আমদানি করো? যেমন সিন্ধুঘোটকের মতো চেহারা!
এর বাবা মস্ত বড়লোক ছিলেন। ছেলেটা কেমন যেন একটু বখে গেছে।
ছেলে আর বোলো না। দামড়া বলাই ভাল।
পিতা বললেন, ওইরকমই হয়! বাপ বড় হলে ছেলে খারাপ হয়। বিদ্যাসাগরের ছেলে পানাপুকুর।
মাতুল প্রসঙ্গে ফিরে এলেন, এসব আপনি কী করছেন? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
বুঝলে না? একে বলে শেষের সময় হাল ধরা। মেরামতির কাজ।
এমন তো কেউ করে না।
কেউ কেউ করে। করে বলেই সংসার অচল হয় না। কেউ-না-কেউ ঘড়িতে দম দেয় তাই সময় চলে, কাঁটা ঘোরে। এ বাড়ির যা গেছে তা গেছে। আর নতুন করে কিছু যাবে না।
আমাকে তো যেতেই হবে।
তুমি যাবে, অবশ্যই যাবে। স্থির পুরুষের কাছে ভাগ্য ফিরে আসে না। যে-জলে স্রোত নেই, সে জলে কচুরিপানা, ঝাঁজির দঁক তৈরি হয়। তুমি বউমা দু’জনেই যাবে। বউমা তোমার সঙ্গে না থাকলে তুমি ভেসে যাবে। সব নৌকোরই নোঙর থাকা চাই। এ বাড়ি দেখবে বাহাদুর। মাইনে আমি দোব। আমরা মাঝে মাঝে এসে দেখাশোনা করে যাব।
মাতামহের দিকে তাকিয়ে বললেন, হঠাৎ এইসময় মাথায় হিমালয় চাপল! এই তো গত বছর, না আগের বছর ঘুরে এলেন।
পদ্মাসনে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন তিনি। প্রশ্ন শুনে মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন, মাথা দোলাচ্ছেন, আর মেঝেতে আঙুল ঠুকছেন।
পিতা বললেন, কী? উত্তর দিন।
মাতামহ মুখ তুললেন। সারামুখে অদ্ভুত এক ধরনের বিষণ্ণ হাসি। বললেন, উত্তর চাও হরিশঙ্কর, উত্তর? নৌকো আর নোঙরের কথা বললে না? কোনও কোনও নৌকোর নোঙর না থাকাই ভাল হরিশঙ্কর। তাদের যে ভেড়ার মতো ঘাট নেই। বাণিজ্য করার মতো হাট নেই। সে নৌকো কেবল ভেসেই চলে, ভেসেই চলে। ভাসতে ভাসতে একদিন সাগরে।
বড় অভিমান জমেছে মনে? কীসের অভিমান? প্রসাদের গান করেন, সব অভিমান মায়ের দিকে ঠেলে দিতে পারেন না?
তুমি পারো হরিশঙ্কর? কোনও মানুষ পারে?
পিতা নীরব হয়ে গেলেন। একটা বয়েসে সব মানুষের চোখেই কেমন এক ধরনের দৃষ্টি আসে, মরা আগুনের মতো। সে দৃষ্টি জগতের কোনও কিছুকেই যেন স্পর্শ করতে চায় না। এখানে নেই, ওখানে নেই, কোথায় যে আছে ধরা যায় না। মেঘলা আকাশের মতো নিষ্প্রভ। মাতামহের চোখদুটি বেশ আয়ত। সেই আয়ত দুটি চোখে যেন একজোড়া গাংচিল উড়ছে। সমুদ্রের দূর দিকচক্রবালে তারা ডানা মেলে চক্কর খেয়ে চলেছে।
পিতা উঠে পড়লেন। ঘরের এ পাশ থেকে ও পাশে দু’বার ঘুরে এলেন। কল্পনায় অতীতকে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। দশ বছর আগে, বিশ বছর আগে, তিরিশ বছর আগে, যেখানে যা ছিল সেই সব বসাতে চাইছেন, জহুরি যেমন জড়োয়ার গহনায় চিমটে দিয়ে লাল নীল সবুজ পাথর সেট করার চেষ্টা করেন।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি যাই। যা ছিল তা আর নেই। যা আছে তাও হয়তো থাকবে না। যা যাবেই তা যাবেই, ব্যর্থ চেষ্টা, তবু চেষ্টা। মন যখন চাইছে, তখন ঘুরে আসুন একবার হরিদ্বার। তবে পনেরো দিনের মধ্যে ফিরতে হবে। সব ব্যাপারে জীবনদর্শন, মৃত্যু, লক্ষ রকমের প্যানপ্যানানি টেনে আনা এক ধরনের কল্পবিলাস। আমাদের অলস জীবনেই এসব প্রশ্রয় পায়, ইয়োরোপের মানুষ পাত্তা দেয় না। জয়, তোমার সেই খাটটা কত টাকায় বিক্রি করলে?
এখনও দাম পাইনি। দুপুরে তারা আসবেন দেখতে।
এলে বোলো, খাট বিক্রি হবেনা। বিষয় সম্পত্তি বিক্রি করার অভ্যাস বড় খারাপ। আমি সহ্য করতে পারি না। তোমার টাকাপয়সার অবস্থা কীরকম? নতুন জায়গায় গিয়ে ক’দিন সামলাতে পারবে?
শ’পাঁচেক আছে।
আরও শ’পাঁচেক রাখো।
পিতা মাতুলের দিকে পাঁচখানা একশো টাকার নোট এগিয়ে দিলেন। মাতুল ইতস্তত করছেন।
নাও ধরো। জীবনে একটু বাস্তববুদ্ধি আনার চেষ্টা করা। পুরুষ হবে পুরুষের মতো। মেয়েরা হবে মেয়েদের মতো। নাও নাও, আমার সময়ের অনেক দাম।
মাতুল হাত পেতে নোট পাঁচখানা নিয়ে মাথায় ঠেকালেন। পিতা বললেন, সেন্টিমেন্টাল হয়ে সিন ক্রিয়েট কোরো না।
দরজার বাইরে আসতেই মাতামহ বললেন, হরিশঙ্কর, তুমি একবার আমার ঘরে আসবে? তোমার সঙ্গে একান্তে আমার দু-একটা কথা আছে।
হ্যাঁ, কেন যাব না?
মাতামহ আমার মাথার পেছন দিকে হাত রেখে বললেন, সুদের সুদ তুমিও আসতে পারো।
নারকেল গাছের তলায় মাতামহের কুটির। ঠিক যেন বৈরাগীর আশ্রম। এই ঘরে আমাদের দু’জনের কত গানের আসর বসেছে। বেসুরো, বেতালা। পেছনের দিকের ওই জানলায় এসে রাস্তার ছেলেরা কুকুর ডেকেছে, বেড়াল ডেকেছে।
আমরা ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মাতামহ দরজা ভেজিয়ে দিলেন। ঘরটি বেশ নিভৃত হয়ে উঠল। চৌকির ওপর কম্বল-মোড়া বিছানা গোল করে গোটানো। দেয়ালে মা জগদম্বা রোজ যেমন হাসেন তেমনই হাসছেন। পুণ্যবান হয়তো সে হাসির খলখল শব্দ শুনতে পাবেন।
মাতামহ বললেন, তোমাকে আমি দুটো জিনিস দেখাব হরিশঙ্কর। প্রথমে, তুমি আমাকে দেখো।
আপনাকে আর নতুন করে কী দেখব বলুন!
হরিশঙ্কর, আমার একটা কিছু হয়েছে, বুঝলে।
বৈরাগ্য!
সে তো মনে। আমি বলছি দেহে। দেখবে তুমি? এই দেখো।
মাতামহ ডান পা-টা সামনে বাড়িয়ে দিলেন। পায়ের পাতা ফুলে তপতপ করছে। একটু নয়, বেশ ফুলেছে। পিতা বললেন, একী? এ যে বেশ ফুলেছে! দেখি।
পিতা নিচু হয়ে পায়ের পাতার একটা জায়গা আঙুল দিয়ে টিপে আঙুলটা তুলে নিলেন। জায়গাটা দেবেই রইল। জিজ্ঞেস করলেন, কতদিন হল এইরকম হয়েছে?
