এতক্ষণে পিতা মুখ খুললেন, জয়, ইনিই কি তোমার সেই সোফার ক্রেতা?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
পেমেন্ট করেছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কত?
হাজার।
ভদ্রলোক ফড়াস করে চায়ে চুমুক মেরে বললেন, এখন মনে হচ্ছে দামটা একটু বেশি হয়ে গেছে। সাতশো-টাতশো হলেই ভাল হত। আবার একটা দোর্দণ্ড চুমুক।
পিতা কুমিরের চামড়ার সেই বাক্সটি খুলে, একটা দশ টাকার নোটের কড়কড়ে বান্ডিল হাতে তুলে নিলেন। বান্ডিলটা ভদ্রলোকের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, হিয়ার ইউ আর।
নোটের বান্ডিল সোফায় পড়ে অল্প একটু নেচে উঠল। ভদ্রলোক কাপ নামিয়ে ভুরু কুঁচকে বললেন, এর মানে?
পিতা বললেন, ভেরি সিম্পল। হাজার আছে কি না দেখে নিন, তারপর যেমন এসেছিলেন তেমনি চলে যান।
কেন কেন, সোফা বিক্রি হবে না?
না।
তার মানে? আপনি কে?
জানার প্রয়োজন নেই। চা খাওয়া হয়েছে? আচ্ছা, তা হলে আসুন।
পিতা হাত জোড় করে মুখে অদ্ভুত এক হাসি ভাঙলেন। ভদ্রলোক বললেন, সেকী! মেয়ের বিয়ে, জামাইকে সোফাসেট দোব, সব ঠিক।
বেশ তো নতুন কিনে দিন, কত আর পড়বে, এই ধরনের জিনিস হাজার তিনেকে হয়ে যাবে, তবে, বাঘছালের কভার হবে না।
অ্যাঁ, এটা বাঘছাল নাকি?
বসে আছেন, বুঝতে পারছেন না!
বাঘছাল! সোফায় বাঘছালের কভার। এর দাম তো তা হলে দশ বারো হাজারও হতে পারে।
অবশ্যই পারে।
তা হলে?
তা হলে টাকাটা তুলে নিয়ে দয়া করে আসুন।
কে যে আপনি? কোথা থেকে যে উড়ে এসে জুড়ে বসলেন!
মাতামহ দুম করে গালচের ওপর একটা চাপড় মেরে জানিয়ে দিলেন, আর বেশিক্ষণ সহ্য করব না। এইবার লেগে যাবে ধুন্ধুমার। মাতুল বললেন, কাকে কী বলছেন? জানেন ইনি কে?
ভদ্রলোক বললেন, আমার জানার দরকার নেই। বিক্রির সময় উনি কি ছিলেন?
মাতামহ বললেন, হরিশঙ্কর, আর তো সহ্য করা যাচ্ছে না। তোমার রাগ হচ্ছে না?
রাগের বদলে দুঃখ হচ্ছে। এই ভদ্রলোকের কী অবস্থা দেখেছেন, লোভে একেবারে জরোজরো। দিগ্বিদিক-জ্ঞানশূন্য। শিকার ফসকে গেলে সব পশুরই এক অবস্থা হয়।
ভদ্রলোক এবার উঠে দাঁড়ালেন। ঘরে একটা ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছিল, সেই দিকে তাকিয়ে বললেন, এটা কী হবে?
পিতা বললেন, ওটা যেমন ঝুলছে, ঝুলবে, আলো দেবে।
অ। আর কিছু বিক্রি হবে, টি-সেট শরবত সেট?
মাতামহ বললেন, হ্যাঁগো, এ যে একের পর এক ফ্যাচাং বার করছে।
মাতুল বললেন, না, আর কিছু বিক্রি হবে না।
অ, হঠাৎ তা হলে অবস্থার উন্নতি হয়ে গেল!
সোফার কভারে আদরের হাত বুলিয়ে বললেন, সত্যি বাঘের ছাল?
মাতামহ বললেন, সন্দেহ থাকলে চিড়িয়াখানায় গিয়ে বাঘের গায়ে একবার হাত বুলিয়ে এসো না বাপু।
ভদ্রলোক দু’পা ফাঁক করে অসভ্য অহংকারীর মতো দাঁড়িয়ে, সোনার সিগারেট কেস থেকে সিগারেট বের করতে করতে বললেন, আর এক হাজার বাড়িয়ে দোব? কড়কড়ে হাজার।
মাতামহ বললেন, একী গো! এ যে আমাদের সামনে সিগারেট ফোঁকার তালে আছে।
মাতামহ গালচে ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিলেন, পিতা হাত ধরে টেনে বসালেন, যাবেন কোথায়? পয়সা আর শূকরের বিষ্ঠা, দুটোরই একরকম গন্ধ, একটু সহ্য আপনাকে করতেই হবে। পালাবেন কোথায়?
ভদ্রলোক বাঁকা চোখে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, মাতুল হাত ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে গেলেন। আর তখনই দেখলুম, লোকটির ঘাড়ে এক ধ্যাবড়া পাউডার।
মাতামহ বললেন, বুঝলে হরিশঙ্কর, আমাদের বাবুর অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে।
কী ক্ষমতা?
ভূত ধরার। এই মড়াকে কোত্থেকে ধরে নিয়ে এল বলো তো! সারাজীবন শুধু ভূত ভোজন আর ভূতের নৃত্য!
কী করবে বলুন? আজকাল ভূত যে খুব জন্মাচ্ছে।
ঘরের বাইরে ভদ্রলোকের চড়া গলা শোনা গেল, মাল তো পেলুমই না, উলটে ঠ্যালাভাড়াটাই আমার লস।
পিতা উঠে বাইরে গেলেন। মাতামহ বললেন, আরে ওকে ধরো ধরো, চড়চাপড় মেরে দিতে পারে। বড় রাগী মানুষ।
বারান্দার রেলিং-এ কনুই রেখে ভদ্রলোক সিগারেট ফুঁকছেন। পিতা নাকে রুমাল চাপা দিয়ে ধোঁয়ার প্রকোপ বাঁচাতে বাঁচাতে জিজ্ঞেস করলেন, মহাশয়ের ঠ্যালাভাড়া কত?
দশ।
পিতা বুকপকেটে হাত দিলেন। দরজার সামনে মাতামহ। তিনি বললেন, দশ কী হে! কোথায় যাবে? বেশি বলছে হরিশঙ্কর। ঝট করে দিয়ে দিয়ো না, একটু দরদস্তুর করা ভাল।
ভদ্রলোক বললেন, কতটা যেতে হবে জানেন?
কতটা? যতটাই হোক, তুমি যে লরির ভাড়া বলছ। পাঁচ দিয়ে ছেড়ে দাও, হরিশঙ্কর। পাঁচের বেশি হতেই পারে না।
ভদ্রলোক বললেন, এই লোড নিয়ে কেউ পাঁচ টাকায় যাবে না।
না যায় না যাবে, থাক আমার মাল পড়ে।
পিতা বললেন, আপনি চুপ করুন। এই ক্লাসের সঙ্গে আজকাল আর তর্ক চলে না। যা চাইবে তাই দিতে হবে। দেশ যে স্বাধীন হয়েছে।
ভদ্রলোক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, কোন ক্লাস?
এই ঠ্যালাঅলা, রিকশাঅলা, রেলওয়ে পোর্টার।
অ। তাই বলুন। আমি ভাবলুম, আমাকে বলছেন বুঝি।
না, আপনাকে বলব কেন? এই নিন আপনার দশ টাকা।
ভদ্রলোকের প্রকৃতই কোনও চক্ষুলজ্জা নেই। হাত বাড়িয়ে টাকা নিয়ে পকেটে পুরলেন।
মাতামহ বললেন, বাবু এখনও হাল ছাড়েননি, জপাবার চেষ্টা চলছে।
পিতা মাতামহের হাত ধরে ঘরে টেনে আনলেন। ঢুকতে ঢুকতে বললেন, আমাদের ছুটি। এখন আমাদের আর কিছু করার নেই। বেশ একটা পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল, কোথা থেকে এসে সব ওলটপালট করে দিয়ে গেল।
মাতুল ঘরে এলেন। ভদ্রলোক বিদায় নিয়েছেন। ঘরে ঢুকে মাতুল মৃদু হাসলেন। অপরাধীর হাসি।
