প্লেটে প্লেটে সকলকে শিঙাড়া এগিয়ে দিয়ে মাইমা উঠে যাচ্ছিলেন, পিতা বললেন, বউমা, বোসো।
তিনি মেঝেতে ভব্য হয়ে বসে আদেশ পালন করলেন। পিতা আমাকে বললেন, দেখি বাক্সটা।
খড়খড়ে কুমিরের চামড়ার সুদৃশ্য বাক্স খুলে তিনি দু’গাছা মোটা মোটা রুলি বের করলেন। সোনার রংটা যেন সকালের প্রথম রোদের মতো। রুলিদুটো মাইমার দিকে এগিয়ে ধরে তিনি বললেন, নাও, পরে নাও। মেয়েদের হাত খালি রাখতে নেই।
মাইমা ভীষণ বিপদে পড়েছেন, একবার মাতুলের মুখের দিকে, একবার মাতামহের মুখের দিকে, একবার পিতার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন আর ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছেন।
মাতামহ শেষে বললেন, এ কী করছ হরিশঙ্কর, ও যে সোনার, অনেক দাম!
হ্যাঁ, অনেক দাম, তাতে কী হয়েছে? তার চেয়েও দামি আমাদের দিতে পারার মন। লাখোপতি কোটিপতিও দরিদ্র, যদি তার মনটা ক্ষুদ্র হয়।
তুমি এ কী হঠকারিতা করছ হরিশঙ্কর! আমার নাতিটার বিয়ে এসে গেল, এসব তখন তোমার খুব লাগবে।
হ্যাঁ, তা লাগবে, তবে একটা কথা জেনে নিন, ঘুড়ি দু’ভাবে ওড়ে। এক, কেউ ধরাই দিয়ে তুলে দেয়। দুই, নিজেই হেঁচকে হেঁচকে আকাশে ভোলা যায়। নাতি নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নেবে, না পারলে আপনার নাতবউ নিরালংকারাই থাকবে। তা ছাড়া, বউমা যে-ঘর থেকে আসবে, তারা মেয়েকে সাজিয়েই পাঠাবেন।
মাতামহ নীরব। মাইমা মৃদু গলায় মাতুলকে বললেন, তুমি কিছু বলছ না কেন?
মাতুল উদাস মুখে বললেন, এ তো আমারই অক্ষমতা!
পিতা গম্ভীর গলায় বললেন, ভুল কোরো না, আমার উপর কারুর কিছু বলার নেই। বাধ্য মেয়ের মতো নিয়ে আমার সামনেই হাতে পরে ফেলো। অবাধ্যতা আমি ভীষণ অপছন্দ করি।
মাতুল নিজের মনেই বললেন, ছি ছি, এ আমার অক্ষমতা।
পিতা বললেন, অক্ষমতা অক্ষমতা করে পেন্ডুলামের মতো দুলছ কেন? যুদ্ধে হেরে গিয়ে কম্যান্ডার ফিরে এলেও দেশের মানুষ তাঁকে মালা দিয়ে অভ্যর্থনা করে, বলে হিরোইক-ডিফিট। স্পেকুলেশনে হার-জিত থাকবেই। নাও, পরে নাও। নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই।
মাতামহ বললেন, বউমা, পরে ফেলল। জামাইকে আমার চিনি। বাধা পেলেই সে পাহাড়ি নদী।
মাইমা রুলিদুটি মাথায় ঠেকালেন, তারপর মর্যাদা অনুসারে সকলকে একে একে প্রণাম করলেন। দরজার সামনে বাহাদুর। তার মুখে অদ্ভুত এক ধরনের হাসি ফুটে উঠেছে। যেন হিমালয়ে রোদ পড়েছে।
সদর থেকে ধরাধরা গলায় কে ডাক ছাড়লেন, জয়বাবু আছেন, জয়বাবু!
১.৪৯ সামনে যখন যাবি ওরে
আসুন, আসুন, বিষ্ণুবাবু আসুন।
বিক্রেতা মাতুলের খাতির করার ধরন দেখে মনে হচ্ছে ইনি একজন ক্রেতা। পরনে ঝলঝলে ট্রাউজার, দু’পকেটঅলা বুশশার্ট। পকেটদুটো কাগজপত্রে ঠাসা। একটা পকেটে উঁকি মারছে সোনালি সিগারেট কেস। আর এক পকেটে লেদার পার্স। ভদ্রলোকের বেশ গোদা চেহারা। ভুড়ি-ওলটানো গামলার মতো বুশশার্টকে সামনের দিকে ঠেলে রেখেছে। চৌকাঠের ওপর দিয়ে ঘরে একটা পা ফেললেন, বেশ কম্পন অনুভব করা গেল। কাপডিশ চিন করে উঠল।
অ, আসর বসে গেছে!
আমার বলতে ইচ্ছে করল, আ, বসেছে। মুখে এসেও আটকে গেল। ভদ্রলোকের অবয়ব থেকে। ঐশ্বর্যের বদ গন্ধ বেরোচ্ছে। যা ধান্যেশ্বরীর গন্ধকেও হার মানায়, এমন বদবিটকেলে! আমরা সবাই মেঝেতে গালচের ওপর বসে আছি, তিনি দুম করে সোফায় গিয়ে বসলেন। সোফা সেই শরীরের ভারে নাচতে লাগল।
পিতার চোখ অনুসরণ করছে প্রতিটি গতিবিধি, ভাবভঙ্গি। বেশ বুঝতে পারছি, মনে মনে বারকতক ভালগার বলা হয়ে গেছে। ভদ্রলোকের নীচের ঠোঁট অসম্ভব পুরু। দুধে ভেজানো কালো পাউরুটির মতো। আমার মনে হয়, ইনি খাবার সময় হুসহাস শব্দ করেন। ঢেউ করে ঢেঁকুর তোলেন। খেয়ে উঠে সঁত খোঁচান, দাঁতের ফাঁক থেকে খাদ্যাংশ বের করার জন্যে এক ধরনের চুসুক চুসুক শব্দ করেন। খাট কাঁপয়ে দুম করে পাশ ফেরেন এবং পাশবালিশ ব্যবহার করেন। নিঃসন্দেহে ইনি একজন মদমত্ত পুরুষ। ঘামে অবশ্যই দুর্গন্ধ আছে। পিতা একদিন নিশ্চয়ই বলবেন, ওয়েলদি ফ্রগ। সর্ব অঙ্গে টাকার পিটুইটারি গ্ল্যান্ড।
সোফাকে আর একবার নাচিয়ে বললেন, স্প্রিং ঠিক আছে তো! একটু দেবে দেবে গেছে মনে হচ্ছে।
মাতুল বললেন, না না, একেবারে নতুনের মতোই আছে। আমার কাছে জিনিসপত্র খুব যত্নেই থাকে। তা ছাড়া বাড়িতে ছোট ছেলেপুলে নেই।
অ।
পায়ের ওপর পা তুলে বারকতক নাচিয়ে নিলেন। বাহাদুর এসে এক প্লেট শিঙাড়া আর এক কাপ চা ধরে দিয়ে গেল। ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে শিঙাড়ার প্লেট নিতে নিতে বললেন, এসব আবার কেন, এসব আবার কেন। দু’আঙুলে একটা শিঙাড়া ধরে কামড় মেরেই হা হা করতে লাগলেন। গরম লেগেছে। মুখ দিয়ে যেন ড্রাগনের নিশ্বাস বেরোচ্ছে। কতটা গরম ঠিক আন্দাজ করতে পারেননি। কোনওরকমে গলা দিয়ে নামালেন। মুখ দেখে মনে হচ্ছে, বেশ কাবু হয়ে পড়েছেন। মা যেমন গরম-লেগে-যাওয়া সন্তানকে দুলিয়ে দুলিয়ে হাওয়া খাইয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেন, ভদ্রলোক তেমনি আধ-খাওয়া শিঙাড়াটিকে হাওয়া খাওয়াতে লাগলেন। একটু সামলে নিয়ে বললেন, গান থামল কেন? চলুক না চলুক। একটু ভৈরবী-টেরবি।
মাতুলের ভুরুর কাছটা কুঁচকে গেল। আমি জানি এই ধরনের কথা তিনি সহ্য করতে পারেন না। ভেতরে ভেতরে তেতে উঠছেন। ফেটে পড়লেন বলে। মাতামহের হাতের মুঠো খুলছে, বন্ধ হচ্ছে। এইসব ক্ষেত্রে সাধারণত তার যা বলার ইচ্ছে হয়, তা হল, ধুর মড়া! খুব কষ্টে নিজেকে সংযত রেখেছেন।
