পিতৃদেব এগিয়ে গিয়ে মাতুলের কাঁধে হাত রাখলেন, মন খারাপ কোরো না জয়। এর চেয়ে ভাল গাড়ি তোমার হবে।
মাতুল দুঃখের হাসি হেসে বললেন, যাহা যায়, তাহা যায়। চলুন, ভেতরে চলুন। আমার কী সৌভাগ্য!
সিঁড়ির একেবারে ওপরের ধাপে একটি সাদা লোমওলা কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। তার যেন সবেতেই মহানন্দ। আমাদের দেখে ধেই ধেই নাচ শুরু হল। আমরা বসার ঘরে এসে যে-সোফাগুলো একটু পরেই বিক্রি হয়ে যাবে তারই একটায় বসলুম। কিছু দূরে মেঝেতে গালচে পাতা, শোয়ানো রয়েছে বিশাল একটি তম্বুরা। বসে আছে সেই হারমোনিয়ম। রুপোর পাত আর মাদার অফ পার্লসের কাজ করা।
মাতুল বললেন, বসুন, আমি একটু চায়ের কথা বলে আসি।
শুধু চা, সঙ্গে আর কিছু নয় কিন্তু!
কেন আর কিছু নয় কেন?
আমরা মুখ তুলে দরজার দিকে তাকালুম। মাতামহ এসে দাঁড়িয়েছেন। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। সাদা একটি পইতে প্রশস্ত বক্ষদেশের এ কোণ থেকে ও কোণে চলে গেছে। পায়ে খড়ম। খুটুর খুটুর আওয়াজ হচ্ছে। কপালে বেশ বড় মাপের একটি লাল চন্দন-টিপ।
পিতা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, আসুন, আসুন, এতক্ষণ ছিলেন কোথায়? এতদিন ছিলেন কোথায়?
মাতামহ চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে এলেন, খড়াস করে খড়মের শব্দ হল। মাতামহ বললেন, একটু ভাঙাগড়ার মধ্যে রয়েছি হরিশঙ্কর। অনেক কিছু ভাঙতে হচ্ছে, অনেক কিছু গড়তে হচ্ছে। তোমাকে একটা কথা বলি।
মাতামহ সামনের সোফায় বসলেন, মাতুল বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। কুকুর চলল পেছনে পেছনে।
মাতামহ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বললেন, বুঝলে, অত সহজ নয়। অনেক সময় লাগে। সবসময় সময়েও হয় না। আলাদা একটা মন চাই।
কীসের কথা বলছেন বলুন তো!
ছাড়ব বললেই সব ছাড়া যায় না। হাসিহাসি মুখে ভাঙা যায় না। বড় কষ্ট হয় বুঝলে, সবচেয়ে কষ্ট দেয় স্মৃতি। এই ঘরটা তোমার মনে পড়ে হরিশঙ্কর!
আজ্ঞে হ্যাঁ, খুব পড়ে।
মনে পড়ে, ওই গালচেটা এখন যে জায়গায় পাতা আছে, ঠিক ওই জায়গায়!
আজ্ঞে হ্যাঁ ওই জায়গায়, ওই কোণটায় আমি বসেছিলুম।
আচ্ছা বলো তো, কত বছর, কত বছর পেছোলে আবার সেই রাত ফিরে আসবে? সেই সানাইয়ের সুর, সেই ফুলের গন্ধ। সময়ের চেয়ে মানুষের আর বড় শত্রু কে? দেখো না, এই দশ মিনিট আগেও আমার বয়েস দশ মিনিট কম ছিল। জয়ের গাড়িটা ছিল। আমাদের বয়েসে দশ মিনিট যোগ হল, পরমায়ু দশ মিনিট ক্ষয় হল, একটা সম্পদ চলে গেল। সময়কে আর একটু এগোতে দাও, দেখবে এই ঘর খালি, আর একটু এগোতে দাও, সব ভোঁ ভাঁ। শূন্য ঘরে, ঘুলঘুলির চড়াইয়ের ডাক ঝনঝন করছে, যেন শাখার ওপর শাঁখারির আধ-খাওয়া চাঁদের মতো করাত চলছে। এ বড় শক্ত ঠাই হে হরিশঙ্কর। এত দেখেও মনটাকে বাঁধতে পারলুম না!
মাতামহ সোফা ছেড়ে গালচের ওপর স্থান নিলেন। ভীষণ ব্যস্ততায় কাঁধে তুলে নিলেন তম্বুরা, সুর বাঁধাই ছিল, আঙুল ঠেকাতেই বাতাস ভরে গেল। গান ধরলেন:
উঠো গো করুণাময়ী
খোলো গো কুটিরদ্বার
আঁধারে হেরিতে নারি
হৃদি কাঁদে অনিবার ॥
মাতামহ ওস্তাদের মতো হাঁটু মুড়ে বসেছেন। সামনে খাড়া হয়ে আছে তম্বুরা। চোখদুটি মুদিত। মুখ জবাফুলের মতো লাল। চোখের কোল বেয়ে নামছে জলের ধারা। এত সুন্দর গান কদাচিৎ শোনা যায়। এ যেন মাতামহের ‘সোয়ান সং’।
পিতা বললেন, নেমে বোসা, নেমে বোসো।
দু’জনেই নেমে বসলুম। চারপাশ তকতকে পরিষ্কার। মাতুল এ ব্যাপারে একটু শুচিবায়ুগ্রস্ত। যা কাল ছেড়ে যেতে হবে, তাকে আজও সুন্দর করে রেখেছেন। অবহেলায় এলোমেলো নয়। মাতুল এসে আসরে বসেই মাতামহের সঙ্গে হারমোনিয়ম ধরলেন। এ যেন এক মণিকাঞ্চন যোগ। বাইরে প্রথম শরতের রোদ ঝলমল করছে। গোটাকতক হলদে আর সাদা প্রজাপতি খুব নাচানাচি করছে।
পিতা আপন মনেই বললেন, আহা এ লীলা কি ভাঙা যায়!
মাতামহ প্রথম গান শেষ করে, দ্বিতীয় গান ধরলেন,
রাজরাজেশ্বর দেখা দাও।
করুণা-ভিখারি আমি, করুণা-নয়নে চাও।।
পিতা বললেন, আহা সকালেও কাফি কী সুন্দর লাগে!
মাতুল সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন,
চরণে উৎসর্গ দান, করিয়াছি এই প্রাণ,
সংসার-অনলকুণ্ডে ঝলসি গিয়াছে তাও ॥
কলুষ কলঙ্কে ভরা আবরিত এ হৃদয়,
মোহে মুগ্ধ মৃতপ্রায়, হয়ে আছি দয়াময়,
মৃতসঞ্জীবনী দানে শোধন করিয়া লও ।।
একটি সুন্দর ট্রে-তে বেশ দামি কাপডিশ সাজিয়ে মাইমা ঘরে এসেছেন। মাথায় পরিমিত ঘোমটা। গরম শিঙাড়ার গন্ধ ভাসছে। চায়ের পট তোয়ালের জামা পরেছে। বাহাদুর ট্রে-টি মেঝেতে সাবধানে নামিয়ে রাখল। ভোজনরসিক মাতুল আজও আয়োজনের কোনও ত্রুটি রাখেননি। রাতে নিশ্চয়ই লুচিমাংসের ব্যবস্থা হয়েছে। মাতুল প্রায়ই ঠাকুরের একটি কথা বলেন, রাজার ছেলের মাসোহারার অভাব হয় না।
রাজরাজেশ্বর দেখা দাও।
প্রথম চরণটি গেয়ে, গান শেষ হল। তম্বুরা রেখে মাতামহ উঠে দাঁড়ালেন। পিতা বললেন, চললেন কোথায়? বসুন স্থির হয়ে।
আমি, আমি বসব? আমি যে একটা পেঁয়ো লোক, হেটো লোক!
আমিও তো তাই, আমি বসলে আপনিও বসবেন।
মাতুল মাথা নিচু করে আছেন। মাইমা একপাশে জড়োসড়ো। বাহাদুর নিলডাউন। পিতার কথা অমান্য করার সাহস মাতামহের নেই। তিনি বসলেন।
পিতা বললেন, বউমা, দাও, এবার সবাইকে দাও। শিঙাড়া কি তুমি ভাজলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমাদের সামনে ডিশ ধরে দেবার জন্যে মাইমা যেই হাত বাড়ালেন, তখনই নজরে পড়ল, হাতে শাখা ছাড়া আর কিছু নেই। সব অলংকার ছায়াছবিতে ভোজবাজি হয়ে গেছে।
