পিতা বললেন, কী হল, মনে হচ্ছে তুমি যেন ঘোরে আছ? তোমার গালটা অমন করে আঁচড়ে দিলে কে? বাড়িতে তো বেড়াল নেই!
মিথ্যে যেন জিভের ডগায় ছত্রীসেনার মতো প্রস্তুত ছিল। তড়াক করে লাফিয়ে পড়ল, আজ্ঞে, সকালে গঙ্গার স্নানে গিয়েছিলুম, মাছে কাটা মেরে দিয়েছে।
সে কী? ওষুধ লাগিয়েছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
এক মিথ্যে আর এক মিথ্যেকে টেনে আনে। নিজের সাহসে নিজেই অবাক।
তুমি তা হলে কাকিমাকে বলে এসো, আমি ততক্ষণ কাপড়জামা পরে নিই।
নীচে নামতে পা কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল অপরাধী যেন অপরাধের জায়গায় ফিরে চলেছে। গিয়ে দেখব ক্ষতবিক্ষত পড়ে আছে পবিত্রতা। আবার ভালও লাগছে। কারা যেন জিভে সাপের ছোবলের নেশা করে! বারেবারে ফিরে ফিরে যায়। শরীর ভেঙে যায়, মৃতমাছের মতো চোখের দৃষ্টি হয়, গাল ভেঙে যায়, তবু যায়। বিষের এতই মাদকতা। গালিবের মতো বলতে ইচ্ছে করছে:
পিনহাঁ থা দাম সখৎ করিব আশিয়াঁ কে,
উড়নে নহ্ পায়ে থে কেহ্ গিরিফতার হম হুয়ে ॥
পাখি ফাঁদ পাতা ছিল বাসার খুব কাছে। ধরা পড়ে গেলে উড়তে-না-উড়তেই ॥
নীচের দৃশ্যটি ভারী চমৎকার। তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সিঁথিতে সিঁদুর পরছেন। আঙুল দিয়ে একবার করে লাগাচ্ছেন। মাথার পেছনের চুলে আঙুল মুছে আবার সিঁদুর তুলে আবার পরছেন। দরজার আড়াল থেকে আমি দেখছি আর ভাবছি, ভাগ্যের এ কী পরিহাস! কিছু বলতে পারছি না, ছুটে গিয়ে হাত চেপে ধরতে পারছি না। বেদান্তবাদী বলতেন, কী মায়া! যা নেই তা আছে। মনে করে কী বিভ্রান্তি।
ঘাড় ঘুরিয়ে কাকিমা বললেন, থাক আর চুরি করে দেখতে হবে না, ঘরে এসো দুষ্টু ছেলে।
কথা শুনে অপরাধবোধ অনেক কমে গেল। এ জগতের বিশেষ কিছুই তো জানি না! কীসে কী হয়! কার মনে কী থাকে! মহিলাকে এই মুহূর্তে ভীষণ তাজা দেখাচ্ছে। বহুদিন আগে এক ফসলের বাগানে শীতের ভোরে বাঁধাকপি দেখেছিলুম। পাতার ফাঁকে কপির ঠাস মুখটি উঁকি দিচ্ছে। সুন্দরী মহিলার নাকের ডগার ঘামের মতো ফুটে আছে সারারাতের শিশির। সেদিন সেই দেখেছিলুম, আজ দেখছি কাকিমার মুখ। সারা পৃথিবীটা ঈশ্বরের কী সুন্দর সৃষ্টি! কোথা থেকে একটু দুঃখ এসে সব মাটি করে দিয়ে যায়।
সিঁথিতে সিঁদুরের শেষ টান মেরে, মাথার পেছনে আঙুল মুছলেন। কৌটোর ঢাকা বন্ধ করে আয়নার সামনে রাখলেন। এ ঘরে বাতাস তো তেমন আসে না। শরীরের কয়েকটি জায়গা এরই মধ্যে অল্প অল্প ঘেমে উঠেছে। এক রাশ ভিজে কালো চুল পিঠ ছেয়ে পড়ে আছে। আজ যেন পটে আঁকা ছবির মতো দেখাচ্ছে। না কি আমার মনের ভুল! ভাল লাগার দৃষ্টিতে দেখছি বলেই কি ভাল লাগছে? যেমন পরকলা পরে পৃথিবীকে দেখবে পৃথিবী ঠিক তেমন দেখাবে। মায়ের স্নেহের দৃষ্টিতে যেমন সব সন্তানই সুন্দর!
কাকিমা ধীরে ধীরে আমার সামনে এগিয়ে এলেন, কাছে, খুব কাছে। বললেন, তুমি কী! তোমার কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই!
ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। কী বলতে চাইছেন? এমন কিছু, যা শোনার জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলুম না। কাকিমা আঁচলের গেরো খুলে, দলা পাকানো একটা সুতোর তাল বের করলেন। সুতোর দলা কপালে ঠেকিয়ে আমার সামনে ধরলেন।
ছি ছি, তোমার পইতে খুলে পড়ে গেছে খেয়াল নেই। আর একটু হলেই আমার পায়ে ঠেকে যেত। আজকালকার ছেলে তো, কোনও কিছু মানামানি নেই। নাও এখুনি পরে নাও।
অবাক হয়ে যাবার মতো ঘটনা। গলা থেকে পইতে খুলে পড়ে গেছে টের পাইনি। উন্মত্ততার শেষ সীমায় পৌঁছেলে মানুষের এইরকমই হয়। শুনেছি হাঙরে জলের তলায় পা কেটে নিয়ে গেলে মানুষ তখনই টের পায় না। পইতেটা নিয়ে বললুম, এটা আর পরা যাবে না। গঙ্গায় বিসর্জন দিতে হবে। নতুন পইতে চাই।
ব্রাহ্মণ মানুষ, গলা খালি রেখো না। নতুন পইতে আছে তো?
তা আছে। তৈরি করে পরে নোব। আমি আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছি। আমরা একবার মামার বাড়ি যাচ্ছি। ওপর খোলা থাকছে।
থাক না। আমি তো এখুনি রান্না চাপাব। কী হবে, কিছু বলেছেন?
না, আপনার যা খুশি।
ওপরে আসতেই পিতা বললেন, তুমি এই বাক্সটা সাবধানে ধরো, বেশি ভারী নয়। আচ্ছা, এখন কি রিকশা পাওয়া যাবে?
কেন যাবে না। ওই তো মোড়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে।
তা হলে চলল। দেরি করে লাভ নেই।
রিকশা চলেছে প্যাকোর প্যাকোর করে। রাস্তায় নোক থইথই করছে। নিজেকে কেমন যেন বিবাহিত বিবাহিত লাগছে। কেমন যেন পাকাঁপাকা। পিতার গায়ে গা লেগে গেলে মনে হচ্ছে, একটা মন্দির অপবিত্র করে দিলুম। আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন পুরুষ এই মুহূর্তে আমার মুখের দিকে তাকালেই বলে দিতে পারতেন, এই ছোকরাটি কুমারত্ব হারিয়েছে। আমি সব দেখছি; কিন্তু কেমন ফেন নেশায় বুঁদ হয়ে। সাপের ছোবল খেয়েছি আমার পরিষ্কার জিভে।
বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মাতুলের গাড়ি। গাড়িতে স্টার্ট রয়েছে। ইঞ্জিন আদুরে বেড়ালের মতো ঘড়ঘড় করছে। স্টিয়ারিং-এ বসে আছেন চোখা এক ভদ্রলোক। গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে মাতুল সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছেন। আমরা রিকশা থেকে নামতে নানামতেই গাড়ি ছেড়ে দিল। রাস্তার একপাশে মাতুল এমন মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন যেন তার মেয়েকে নিয়ে জামাই চলে গেল। গাড়িটার সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে ছিল। মানুষ কত কষ্ট করে একটা কিছু গড়ে তোলে, সেই গড়া জিনিস ভেঙে গেলে মন তো খারাপ হবেই। আমারই হচ্ছে।
