স্নেহভাজনেষু, অদ্যই এই শহরে আমার শেষ রজনী। কাল আমি লোটাকম্বল নিয়ে সরে পড়ছি। ভেবো না যেন আমি পরাজিত। একে তুমি বলতে পারো সাময়িক বাধা, এ টেম্পোরারি সেট ব্যাক। যাবার আগে তোমার সঙ্গে একটু কাব্য করে যাই। রবার্ট ফ্রস্ট পড়ছিলুম, কাল রাতে। তোমার প্রিয় গায়ক ধনঞ্জয়বাবুর সেই গানের লাইন ভাসছিল মনে, কাল সারারাত চোখে ঘুম ছিল না। ছিল না চোখে। আমার ছবিতে উনি যে দুটি গান করেছেন অনবদ্য হয়েছে। রেকর্ড কোম্পানি মাসখানেকের মধ্যেই ডিস্ক বাজারে ছাড়বেন, পারলে শুনে নিয়ে। একটি গান আছে দরবারিতে। আমার বিশ্বাস, ওই গান বহুকাল বাংলার আকাশে বাতাসে ঘুরবে। বড় বেদনার গান।
কাল রাতে প্রথম টের পেলুম প্রবাসী হবার কী বেদনা! মানুষ দীর্ঘকাল যেখানে বসবাস করে, গাছের মতো সেখানে তার শিকড় নেমে যায়। গৃহীমানুষ আর যাযাবর মানুষে এই তফাত। জিপসি হলে এইসব ছোটখাটো বন্ধন আমাকে আর এভাবে পীড়া দিতে পারত না। এই সাজানো সংসার। ওরা সব ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর আমি এক যক্ষের মতো এ ঘর থেকে ও ঘর, ও ঘর থেকে সে ঘরে দুঃস্বপ্নের মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম। কেবলই মনে হচ্ছিল, প্রদীপের তেল ফুরিয়ে আসছে, এখুনি নিবে যাবে, যতটা পারি, যতক্ষণ পারি দেখে নিই। একটা জিনিস বড় বেদনার হে, মানুষ চলে যাবার পরও এই পৃথিবী থাকবে। গাছপালা, চাঁদ তারা সব থাকবে, সুর থাকবে সংগীত থাকবে। কালকের রাত বড় গোলমেলে ছিল। জানি না বিদায়ের আগের রাত এইরকমই হয় হয়তো! বর্তমান মানুষকে খুব একটা কষ্ট দিতে পারে না, যত কষ্ট দেয় স্মৃতি। তা ধরো বছর তিরিশ ধরে এই জমিতে আমার শিকড় নেমেছে, তাকে উপড়ে ফেলতে একটু কষ্ট হবে না! তুমি কি জীবনকে অত সহজ ভাবো নাকি! বেঁচে থাকার একটা স্পন্দন নেই! মানুষ যেখানে থাকে সেখানে তার সঙ্গে আরও অনেক কিছু থাকে, দৃশ্য অদৃশ্য। দেহের যেমন ছায়া আছে, মনেরও তেমনি ছায়া আছে। শুধু মাটিতে নয়, মানুষ বেঁচে থাকে আকাশে বাতাসে মাটির গভীরে। চারপাশে বলয়ের মতো অদৃশ্য একটা ব্যাপার তৈরি হয়ে যায়। মাকড়সার জালের মতো অদৃশ্য জাল তৈরি হয়। সেই জাল ছিঁড়ে আমাকে বেরোতে হবে। মনের অবস্থাটা তা হলে একবার বোঝে। তুমি হলে কেঁদে ফেলতে। বসার ঘরের সোফাটোফা সব বিক্রি হয়ে গেছে, কাল সকালেই ক্রেতা এসে ঘর খালি করে সব নিয়ে যাবে। আমার সেই চাকা লাগানো সাধের রুপোলি খাট, যেটা আমাকে এক মহারাজা প্রেজেন্ট করেছিলেন, সেটাকেও বেচে দিলুম। অনেক পাওনাদার বাজারে, বুঝলে! এ ছাড়া অন্য আর কোনও রাস্তা চোখে পড়ছে না। সঙ্গে রইল আমার সাধের তম্বুরা আর স্কেল চেঞ্জ হারমোনিয়ম। এ জিনিস সহজে পাওয়া যাবে না। এক গাদা ভাল ভাল ফুলগাছের টব আছে। তোমার যদি নেবার ইচ্ছে থাকে জানাও। বাহাদুরকে দিয়ে ঠেলায় চাপিয়ে পাঠিয়ে দোব। সাত-আট রকমের গোলাপ আছে। ফুল ফুটলে তবু আমার কথা মনে পড়বে। ছেড়ে চলে যেতে মন কি চায়! কী করব বলো? সাধারণ চাকরি আমি করতে পারব না, অসম্ভব। কলকাতার সংগীত জগতে বড় দলাদলি। এখানে থাকলে, দেহ আর মন দুটোতেই শুকিয়ে মরতে হবে। যাই কিছুদিন ঘুরে আসি।
হ্যাঁ যে কারণে চিঠি, এক, আজ সন্ধেবেলা ইনস্টিট্যুটে গুরুজি সংগীত পরিবেশন করবেন। সঙ্গে আমিও আছি। পারলে তোমরা এসো। ধরে নিতে পারো, কলকাতার আসরে এই আমার সোয়ান সং। দুই, তোমার পিতৃদেবকে জিজ্ঞেস করো, বাহাদুর ছেলেটি বড় ভাল, ভীষণ কাজের, তোমাদের সংসারে ওর একটু স্থান হতে পারে কি? সঙ্গে নিয়ে যাবার ইচ্ছে ছিল। যদি না পারি তোমরা ওকে রাখবে কি?
যদি গান শুনতে আসো, গেটে আমার নাম করলেই হবে।
মন ভীষণ খারাপ, সাংঘাতিক আবেগ আসছে। এ আমার জয় না পরাজয়? শোনো তো রবার্ট ফ্রস্ট কী বলছেন:
The tree the tempest with a crash of wood
Throws down in front of us is not to bar
Our passage to our journey’s end for good
But just to ask us who we think we are.
চলি রে। ইতি তোর মামা ।।
চিঠিটা পিতার হাতে তুলে দিলুম। পড়তে পড়তে ক্রমশই তার মুখের ভাব গম্ভীর থেকে গম্ভীরতর হল। চিঠিটা টেবিলের ওপর চশমা চাপা দিয়ে রেখে বাহাদুরের দিকে তাকালেন, তোমার বাবু এখন কী করছেন?
গান করছেন।
পিতা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, আমাকে বললেন, গেট রেডি।
আপনি কি এখন ও বাড়িতে যাবেন?
অফকোর্স! একটা সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, শেষ চেষ্টা একবার করে দেখা যাক। তোমার কাকিমা নিশ্চয়ই বাড়িটা একটু আগলাতে পারবেন?
কাকিমার নাম শুনে বুক হঁত করে উঠল। কণ্ঠতালু শুকিয়ে এল। লোহা তপ্ত হয়েছিল, ভোরবেলায় জলে ডুবিয়ে এনেছি। গুরুজনের মুখের দিকে সোজা তাকাতে পারছি না। ভুলতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। আদৌ ভোলা যাবে কি? চরিত্রের স্ফটিক গোলক হাত ফসকে পড়ে গেছে। ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যা ঘটে গেছে, তা আর কেউ জানে না, জানে রাত আর জানে দুটি মাত্র প্রাণী। রাতের স্রোতে ভাসতে ভাসতে ঘটনা চলে যাবে দূর থেকে দূরে, অতীত থেকে অতীতে। ঘটনা কোথায় চলে যায়! মানুষের ক্রিয়াকাণ্ড কি সময়ের নদীর কোনওখানে গিয়ে পলির মতো সঞ্চিত হয়? চর জেগে থাকে? যেখানে মানুষ আবার কোনওদিন ফিরে গিয়ে খুঁজে খুঁজে দেখতে পারে, জীবনের পর জীবন ধরে সে কী করেছে! সুকর্ম কুকর্মের নুড়ি নুড়ি সঞ্চয়। জানা নেই আমার প্রারব্ধ কী, আর আরব্ধ কী?
