হঠাৎ মনে হল গঙ্গার জলে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। সব পাপ ধুয়ে যাক। ভূতের ব্যাখ্যা আমি পেয়ে গেছি। ভূত হল মানুষের দ্বিতীয় আমি। কখনও সে ছায়া, কখনও সে কায়া। সেই সুললিত কণ্ঠের মানুষটি, যিনি রোজ প্রাতে নাম গান করতে করতে স্নানে চলেন, তিনি চলেছেন। ভৈরবীতে ধরেছেন, রাই জাগো, রাই জাগো বলে ডাকে শুকসারি।
কোমরে গামছা বেঁধে রাস্তায় নেমে পড়লুম। পিচ এখনও ভিজেভিজে। রাত সারারাত শিশিরে কেঁদেছে।
একটি রাতের খতিয়ান বড় কম হবে না। কত লক্ষ প্রাণ এল, কত লক্ষ প্রাণ গেল, কত অপরাধ ঘটে গেল, কত পবিত্র অপবিত্র হল! ভোরের প্রসন্ন আলোয় পুরুষ আর মহিলারা স্নানে চলেছে। বিধবা মহিলাদের সাদা থান, হাতে ঝকঝকে কমণ্ডলু, কারুর কারুর হাতে পেতলের সাজিতে সাদা আর নীল অপরাজিতা। টকটকে চেহারার বিলাসী বধূরাও চলেছে। বুকের ওপর আড়াআড়ি পেতে দিয়েছেন লাল ডুরে গামছা। রাতের আলস্য পায়ে পায়ে জড়িয়ে আছে। শরীরে শয্যার গন্ধ, সুবাসিত তেলের গন্ধ, শাড়ির বেড় তখনও ঢিলেঢালা, খোঁপা আলগা। যাবার আগে রাত যেন আর এক তোলা যৌবন দান করে গেছে। সখীতে সখীতে কী যে আলাপ, চুড়ির শব্দের মতো হাসি উঠছে রিনরিনিয়ে।
সেই বিশাল সন্ন্যাসী চলেছেন। গলায় রুদ্রাক্ষ। রক্তাম্বর পরনে। শুভ্র কেশ, শুভ্র শ্মশ্রু, ঊর্ধ্ব নেত্র, পায়ে কাষ্ঠপাদুকা। গম্ভীর কণ্ঠে শুধু বলে চলেছেন হরি ওঁ, হরি ওঁ। প্রতি পদক্ষেপে পৃথিবী যেন সংকুচিত হচ্ছে। প্রতিবার মন্ত্র উচ্চারণে বাতাস যেন কেঁপে উঠছে। আমিও চলেছি তার পেছন পেছন।
গৈরিক জলধারা তরতর করে বয়ে চলেছে সমুদ্রের দিকে। সামনেই পশ্চিম। আকাশে তখনও অন্ধকারের শেষ পটিটুকু লেগে আছে। মন্দিরের চূড়া ভোরের আলো ধরে, সম্রাটের মতো মাথা তুলে পঁড়িয়ে আছে। জলে ভোরের আলো চুমকি বসিয়ে দিয়েছে। আকণ্ঠ নিমজ্জিত নরনারী, নানা সুরে স্তোত্র পড়ে চলেছেন। কেউ কেউ উধ্ববাহু হয়ে সবিতা স্তোত্র পড়ছেন, কেউ আবৃত্তি করছেন গায়ত্রী, কেউ করছেন পিতৃপুরুষের তর্পণ, অঞ্জলিবদ্ধ হাতের ফাঁক বেয়ে জল ঝরে পড়ছে। ঝরা জলে খেলছে সূর্যের সাতটি রং।
সেই রুদ্রাক্ষধারী সন্ন্যাসী সাঁতার দিয়ে প্রায় মাঝগঙ্গায় চলে গিয়ে শবের মতো চিত হয়ে ভাসতে ভাসতে ভাটার টানে শ্মশানঘাটের দিকে চলেছেন। দুটো হাত মাথার দু’পাশে টানটান, দুটো পা ছড়ানো, দেহ চিত, ঊর্ধ্বমুখী, কোনও স্পন্দন নেই, নিখুঁত শবাসনে ভাসমান। কাছাকাছি কোনও শকুন থাকলে শব ভেবে বুকের ওপর এসে বসে পড়ত। জলে আমার পাশে দাঁড়িয়ে একজন স্নান করছিলেন। তিনি খুব অবজ্ঞাভরে বললেন, ভেলকি দেখাচ্ছে, ভেলকি। কথা শেষ করে ভুস করে একটা ডুব মারলেন, পরক্ষণেই উঁহু উঁহু করে উঠে পড়লেন। যন্ত্রণায় বিকৃত মুখ। পরিচিত একজন জিজ্ঞেস করলেন, কী হল মুকুজ্যে?
দেখো তো ভাই, পিঠে কী একটা মেরে গেল। মনে হচ্ছে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। ভীষণ জ্বলছে।
জল থেকে একটু ওপরে উঠতেই দেখা গেল, চওড়া পিঠের বাঁ পাশে মেরুদণ্ডের কাছে রক্ত বেরোচ্ছে। চোখের ভুল কি না জানি না, রক্তের অক্ষরে পরিষ্কার একটি শব্দ ফুটে উঠেছে, ওঁ। কে যেন দেগে দিয়ে গেছে গরম লোহা দিয়ে।
সবাই বলতে লাগলেন, ওহে, আড়ট্যাংরায় কাটা ঝেড়েছে। বেশ ভোগাবে কিছুদিন। আমার মনে হল ভদ্রলোক সন্ন্যাসী-নিন্দার ফল হাতে হাতে পেয়ে গেলেন। আমরা সবাই স্নান করছি, ট্যাংরা মেরে গেল বেছে বেছে ওই নিন্দুককেই।
পুব আকাশ লাল হয়ে উঠেছে জবাফুলের মতো। পাশের খেয়াঘাট থেকে একটি নৌকা ছেড়ে। গেল ওপারের দিকে। তিনজন মঠবাসিনী বসে আছেন উদাস হয়ে। দুটো জেলেনৌকা তরতর করে দক্ষিণ দিকে চলে গেল। কে একজন হেঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কী মাছ আছে গো কত্তা? তারা কোনও উত্তর দিল না।
মেয়েদের স্নানঘাটের দিকে দৃষ্টি চলে গেল। কোমর পর্যন্ত জলে নেমে কে একজন পেতলের। ঘড়া জলে ভাসিয়ে দোল খাইয়ে খাইয়ে জল ধরার চেষ্টা করছে। ছোট ছোট তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। চমকে উঠলুম, মায়া। আমার দিকে তাকিয়ে আছে স্থির দৃষ্টিতে ভিজে শাড়ি লেপটে গেছে সারাশরীরে। আমার পাশে দাঁড়িয়ে একজন হাতের মুদ্রা করে, চোখের সামনে ধরে সূর্য নমস্কার করছেন, ওঁ নমঃ বিবস্বতে। চোখ তার সূর্যের দিকেই নেই, জবাকুসুমসঙ্কাশং যেন নেমে এসেছেন মায়ার টোল-খাওয়া বুকে। মনে হল একবার বলি, এই ব্যাটা, আকাশের দিকে তাকা। সকাল না-হতেই মানুষের খিদে। পেটের খিদে, মনের খিদে, দেহের খিদে।
শরীরের অদ্ভুত ভঙ্গি করে মায়া ঘড়াটা কাঁখে রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে ইশারা করলে, উঠে এসো। ভদ্রলোকের স্তোত্র ভুল হয়ে যাচ্ছে, জবা জবা করছেন। থাকতে না পেরে বলে ফেলেছি, কুসুম সঙ্কাশং। ভদ্রলোক বলে উঠলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ কুসুম সঙ্কাশং।
ভিজে পাতা যেন সোনার পাত। জলের কিনারায় ফুল ভাসছে, ভাসছে চিতার কাঠকয়লা। ঘাটের বাইরে কাখে কলসি নিয়ে মায়া পঁড়িয়ে আছে যক্ষিণী মূর্তির মতো। ভিজে কাপড় থেকে জল ঝরেছে পায়ের কাছে। সামনে দাঁড়াতেই মায়া বললে, কী গো একেবারে ভুলে গেলে? বলেই সে ধীর পায়ে চলতে লাগল। দূরে আরও দূরে। বৈষ্ণব কবি হলে লিখতেন, আমার আঁখিভ্রমর জড়িয়ে গেল তার ভিজে কাপড়ে জড়ানো শরীরের ছন্দে।
» ১.৪৮ I may load and unload
I may load and unload
Again and again
Till I fill the whole shed,
And what have I then.
মুকুর খামটা আর খোলার অবসর পাচ্ছি না। একটু নির্জনতা চাই। সে তো মধ্যরাতের আগে আসবে না। দুপুরের দিকে একটু অবসর মিলতে পারে। মাতুলের বাড়িতে যে-নেপালি যুবকটি কাজ করে, সেই বাহাদুর এসেছে একটি চিঠি নিয়ে।
