কাকিমা বললেন, জ্বলুক আলো। দিন ফুটলে তেজ কমে ফ্যাকাসে হয়ে যাবে। তখন আর বোঝাই যাবে না, শুধু শুধু আলো জ্বলছে। তুমি কাপছ, তোমার জ্বর আসছে! তুমি আমার কাছে এসো। আমি তোমাকে কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকি। আরাম পাবে। কে আছে তোমার? কেউ তো নেই!
যা আমি বলতে চাই, তা তো সাহস করে বলতে পারব না। আর একজন মুখ চেপে ধরছে। জ্বর নয়, এ হল আমার প্যাশন। এতকাল গর্তে শুয়ে ছিল ন্যাজ গুটিয়ে, শীতঘুমে। হঠাৎ জেগে উঠছে। গ্রীষ্ম এসেছে। সদর দরজার ফাটলে ফাটলে আগুনরেখার যে ঝিলিমিলি দেখেছিলুম, তা আমার জ্বলন্ত ধমনীরই প্রতিচ্ছবি। লাভার মতো রক্তস্রোত বইছে। আমি আমার ছোট্ট নির্জন ঘরে ফিরে যেতে চাই, যেখানে একটি দীপ জ্বলে আছে আমার অপেক্ষায়, আমার ফেলে আসা সাধনা, মুখ-আঁটা একটি খামে আছে, একটি মেয়ের কোনও গোপন কথা। আমি যে পারছি না ফিরে যেতে। কে প্রবল? আমি, না আমারই রক্তে পুষ্ট সেই অন্যজন। আমি তার কাছে পরাজিত হতে চলেছি। স্ট্রেট সেটে। দুটো শরীর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে একটি আয়োজনের দিকে পায়ে পায়ে। একজন। জানে না আর-একজন কীভাবে অন্য আর-একজন হয়ে গেছে। সে এখন পুরুষ। চৌকাঠ, মেঝে, নিবে-যাওয়া হ্যারিকেনের কেরোসিন গন্ধ, অন্ধকারে ভাসমান চৌকি, একটি অন্যের ব্যবহৃত বিছানা, শাড়ির ক্ষারক্ষার গন্ধ, দেহের কিছু আবৃত অনাবৃত অংশ, জমাট বাতাস, ফিকে অন্ধকার। এই সেই বিছানা, যার একজন অংশীদার কোনও এক রাতে, কোনও এক অরণ্যভূমির প্রান্তে, ভাগ্যের শিকার হয়ে নীল শীতল ঘরে একটি ধাতুর চাঁদরে পড়ে ছিলেন কারুর অনিশ্চিত অপেক্ষায়। কেউ আসেনি। সেখান থেকে লাশকাটা ঘরে, তারও পরে অবয়বহীন, নামহীন একটা হাড়ের খাঁচা। গভীর রাতে ভৌতিক চেরাই ঘরের দেয়ালে। ছাত্ররা আসবে, দেখবে চিনবে, ফেমার, পেলভিস, ইলিয়াম, স্কাপুলা, ম্যাকসিলা, ম্যানভিবল– সব মানুষেরই তখন এক নাম।
অন্ধকার আমাদের দুজনকেই গ্রাস করে নিয়েছে। ফিসফিস করে মহিলা বললেন, তুমি অমন থরথর করে কাপছ কেন? ম্যালেরিয়া আসছে নাকি? একটু শান্ত হও, একটু স্থির হও।
আমি নিজেকেই বোঝাতে পারছি না, তা এই মহিলাকে বোঝাই কী করে, এ এক অন্য ধরনের ম্যালেরিয়া। শরীরে আমাদের সাপ আছে। সাধকরা জানেন। সারপেন্ট পাওয়ার। এক স্থান মূলাধারে আর স্থান সহস্ৰারে। ভুজঙ্গ রূপা লোহিতা, স্বয়ম্ভুতে সুনিদ্রিতা। চতুর্দলবিশিষ্ট হস্তীপৃষ্ঠে পৃথীবীজ লং, স্বয়ম্ভশিববেষ্টিতা কুণ্ডলিনী নিদ্রিতা, দেবতা ব্রহ্মা ও দেবী সাবিত্রী। সেই সর্প পিঠ বেয়ে ঘাড়ের পেছন দিয়ে সোজা উঠে পড়েছে মাথায়। মেরুদণ্ডে নিউরনের সংকেত থ্যালামাসে গিয়ে ধাক্কা মারছে। আজ্ঞাচক্রে এ কীসের আজ্ঞা ভেসে বেড়াচ্ছে! দ্বিদলবিশিষ্ট এই চক্রের একটি দলে হং অন্যদলে ক্ষং বীজ। মুক্ত ত্রিবেণীতে কোথায় আমার ওঁকারধ্বনি। পরশিব, দেবী সিদ্ধকালী, ষড়মুখ ও চার হস্তযুক্ত হাকিনী দেবীই বা কোথায়! শুধুই থ্যালামাস। সেরিব্রাল করটেক্স বলছে, বড় নরম, বড় গরম, বড়ই গভীর আর গোপনীয়। সহস্রারে, সহস্রদলের মাঝে মিথুনাত্মক পরমশিব আর আদ্যাশক্তি। আমি তিনবার বলেছি, বাঁচাও বাঁচাও। কেউ আসেননি আমাকে বাঁচাতে। আমার দ্বিতীয় ‘আমি’ শুধু খ্যাখ্যা করে হাসছে। তুমি কার কথায় ভুলেছ রে মন, ওরে আমার শুয়া পাখি। : আমারই অন্তরে থেকে, আমারে দিতেছ ফাঁকি।
কাকের গলায় বললুম, আমি ওপরে যাই। টেবিলে আমার আলো জ্বলছে।
অন্য তরফে সাড়া নেই। বিস্ফোরণে প্রকোষ্ঠ আমার ভেঙে পড়েছে। ওই যে রাত্রে এসে ছয়টা চোরে মেটে দেয়াল ডিঙিয়ে পড়ে। অন্ধকার আমাদের আবৃত করে রেখেছে, তাই আর একধাপ নীচে নামলেই কাল দিনের আলোয় নিজের মুখের সামনে নিজেই আর দাঁড়াতে পারব না। দেহের ওপর দেহ ভাঙছে, তটের ওপর ঢেউ ভাঙছে, নিদ্রাশেষে স্বপ্ন ভাঙছে, মৃত্যু এসে ঘট ভাঙছে। সবই যখন ভাঙনের খেলা, আমার আমিও ভাঙবে, তবু শেষ চেষ্টা। এই বদ্ধঘরেও ভেসে এল দূর থেকে ভোরের প্রথম পাখির শিস।
এস্কিমোরা যেমন কুঁজো হয়ে ইগলু থেকে বেরিয়ে এসে অরোরা বোরিয়ালিস দেখে, আমি সেইভাবে আর একটি শরীরের তলা থেকে বের করে আনলুম আমার ঘৃণিত শরীর। তোমাকে আমার ধিক্কার জানাই। তুমি শঠ, তুমি প্রবঞ্চক, তোমার ভেতরে বসে আছে তক্ষক। তুমি তার। শিকার।
সদর দরজার ফাটলে সার সার রুপোলি রেখা। সদরে দিন এসে দাঁড়িয়েছে। এ দীনের আর ভাবনা কী! দুরারোগ্য ব্যাধিতে মরমর হয়েছিল। আবার বেঁচে ফিরে এসেছে। ধাপে ধাপে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে, যেন বহুকাল পরে, কত অচেনা! দোতলার বারান্দায় ঊষার আঁচল উড়ছে, প্রতিদিনের মতো তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারছি না। অপবিত্র হয়ে মানুষ যেমন বলে, একটু সরে দাঁড়াও, আমাকে যেতে দাও, আমাকেও সেইভাবে পাশ কাটিয়ে সরে আসতে হল। টেবিলের আলো আমার জন্যে জেগে জেগে ঘুমিয়ে পড়েছে। জ্ঞান-ঠাসা কেতাব, সোনার জলের লেখায় ব্যঙ্গের হাসি হাসছে। শূন্য ঘরে কেউ নেই, তবু মনে হচ্ছে অদৃশ্য একঘর মানুষ হইহই করে বলছে, এসো, এসো। মায়ের ছবির দিকে তাকাতে পারছি না। দুটি চোখে আগের রাতের স্নেহের দৃষ্টি যেন আর নেই। ঘৃণা ধিক্কার, ঠোঁটের অভ্র হাসি মিলিয়ে গেছে। রক্তের ঋণ শোধ করে এলুম মা।
