বেশি না, আর সাত-আট পা এগোতে পারলেই সদর। পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায় গোটা দুয়েক দাঁচ মেরে। সিঁড়ির তলায় ঘুপচিতে আগে আমাদের কুকুর থাকত। সেসব দিন চলে গেছে, এখন আমরা ঝাড়া হাতপা।
দরজার দিকে চোখ পড়তেই বুকটা আবার ছাত করে উঠল। দরজার তলার দিকে ছোট্ট একটা আলোর টিপ স্থির হয়ে আছে। জোনাকি? জোনাকির আলো স্থির হয় না। জ্বলে আর নেভে। ভয়ে, কৌতূহলে পা থেমে পড়ল। বিন্দু সূক্ষ্ম সরলরেখার আকারে বিশেষ একটি ফাটা ধরে জ্বলন্ত সুতোর মতো এঁকেবেঁকে বিদ্যুৎগতিতে নীচের দিক থেকে ওপরে উঠছে। যেন আলোর পুঁয়ে সাপ। এরকম একটা নয়, দেখতে দেখতে চোখের সামনে অসংখ্য আলোর ঝিলমিল তৈরি হয়ে গেল। মনে হচ্ছে দেওয়ালির রাত। আলোর রং কেমন যেন হলদেটে।
মন এইবার যুক্তিতর্কের বাইরে চলে যাচ্ছে। এসবের মানে বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। মনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের শক্তি কমে আসছে। এ লোকের চেয়ে পরলোকের ক্ষমতা অনেক বেশি। কোনওরকমে যেখানে দাঁড়িয়েছিলুম সেইখানেই ধীরে ধীরে বসে পড়লুম। অশরীরী! কোনও অন্যায় তো করিনি, তবে কেন এমন করে ভয় দেখাচ্ছ।
চিন্তা, দৃষ্টি ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। পাতলা এক পরদা কুয়াশা নেমে আসছে। চিন্তায় কিংবা কাজে সত্যিই কি আমি কোনও অন্যায় করিনি, পাপ করিনি! জোর গলায় বলতে পারো? কীসের স্বার্থে তুমি একজন মহিলার কাছে তার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ চেপে রেখেছ! তোমার অনুকম্পা! নিজের ভেতরটা একবার ভাল করে হাতড়ে দেখো তো?
দোতলা থেকে অস্পষ্ট ভেসে আসছে গভীর ঘুমে শোনা স্বপ্নের শব্দের মতো, ওপার নদী থেকে ভেসে আসা পিতার ভারী কণ্ঠস্বর, একী, সব খুলেটুলে রেখে গেল কোথায়, বাথরুমে নাকি? কোথায় গেলে হে। বাতাসে যে বইয়ের পাতা উড়ছে! আঃ ছিঁড়ে যাবে এক্ষুনি।
প্রায়-সংজ্ঞাহীন সেই অবস্থায় অদ্ভুত এক পাপবোধের তাড়নায় প্রাণপণ চেষ্টা করলুম উঠে দাঁড়াবার। কাকিমার স্বার্থে এখুনি আমার ওপরে উঠে যাওয়া উচিত, এমন একটা নির্দেশ উঠছে মনে। পারছি না, কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। দেহ যেন তালশাঁসের মতো থ্যাসথ্যাস করছে।
দরজার দিকে চোখ চলে গেল। সেই আদ্যিকালের ফাটাফাটা দরজা, খিল দিয়ে জমপেশ করে আঁটা। আলোর ঝিলমিলি আর নেই। খেলা করে চলে গেছে। এতক্ষণ গলায় কোনও স্বর ছিল না। স্বর ফিরে এসেছে। ভাগ্য খুবই সুপ্রসন্ন। কাকিমা ধীরে ধীরে আমার কোল থেকে মাথা তুললেন। ফিসফিস করে বললুম, কোনও ভয় নেই, সট করে সিঁড়ির তলায় ঢুকে পড়ুন। বাবা উঠেছেন। একটু আগেই যাকে বিছে কামড়াতে পারে ভেবে অস্থির হয়েছিলুম, প্রাণে মরার ভয়ে তাকেই ঠেলে দিলুম অন্ধকার আবর্জনায়। তিনিও ভূত ভুলে অম্লানবদনে সেখানে চলে গেলেন। কেন গেলেন, না গেলে কী হত এসব ভাবার কোনও প্রয়োজন হল না। আমরা দুজনেই মনে হয় এক নৌকোয় চেপে বসে আছি। উই আর অন দি সেম বোট, ফাদার।
মিথ্যে বলার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলেছি। গলা তুলে বললুম, আমি নীচে।
অন্ধকারে নীচে কী করছ?
সঙ্গে টর্চ আছে। কী একটা শব্দ হল, তাই দেখতে এসেছি।
অ্যাঁ, তাই নাকি? সাহস তা হলে বেড়েছে বলো! ভেরি গুড। সন্দেহজনক কিছু পেলে? আমি নামব?
আজ্ঞে না। তেমন কিছু দেখছি না।
সদরের খিলটা একবার ভাল করে চেক করো। ওটার দুপাশই খোলা হ্যাঁচকলের মতো, ঠিকমতো লাগে না। বাইরে থেকে সরু পাত গলিয়ে ঠেললেই খুলে যায়।
আজ্ঞে হ্যাঁ, চেক করেই উঠব।
আমি এবার তা হলে শুয়ে পড়ছি, তুমি উঠে এসো। শোবার আগে ফুল এক গেলাস জল খেয়ে শোবে।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমার ভুরুর কাছটা কুঁচকে উঠেছে। বেশি কথা না বলে উনি শুয়ে পড়ছেন না কেন? দরজা বন্ধ ও ছিটকিনি লাগানোর শব্দ হল। কী আশ্চর্য! ওঁর ঘরে ঢোকার জন্যে, ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেবার জন্যে আমি হঠাৎ এত ব্যস্ত হয়ে পড়ছি কেন? আমার কি কিছু হয়েছে?
প্রায় শিস দেবার মতো করে বললুম, বেরিয়ে আসুন।
অন্ধকারে কাকিমা এগিয়ে আসছেন। সাদা শাড়ি, সামান্য চুড়ির শব্দ, জীবন্ত একটি মনুষ্য শরীরের উত্তাপ আর গন্ধ, রহস্যময় রাত্রি। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কাকিমা ঠিক আমার পাশটিতে এসে দাঁড়ালেন। চারপাশের দেয়াল কোথায় যেন সরে গেছে। মনে হচ্ছে গভীর এক অরণ্যে দাঁড়িয়ে আছি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহিলা, আমার আর পাশে নন, একেবারে শরীরের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। মাংসপিণ্ড গলে গলে পড়ছে।
তুমি অমন থরথর করে কাঁপছ কেন পিন্টু! একী, তোমার গা যে আগুনের মতো গরম! জ্বর আসছে নাকি! ঘরে এসো, ঘরে এসো। এই নীচে কিছুতেই আমি আর একা থাকতে পারব না। ভোর অবদি তুমি আমার কাছে থেকে যাও। উনি জানতে পারবেন না।
ওপরে আমার ঘরে আলো জ্বলছে।
নিজের কণ্ঠস্বরে নিজেই চমকে উঠলুম। এ কার গলা! ধরাধরা, ভাঙাভাঙা। আমার ভেতর থেকে আর একজন কেউ বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমি তাকে চিনি না। অনেকদিন ধরে দেখে আসছি, বাগানের একপাশে ছোট একটা গর্ত। সবাই বলে, ও কিছু নয়, ইঁদুরের গর্ত। মাঝে মাঝে দেখার চেষ্টা করি, কে আছে ভেতরে! একফালি অন্ধকার। সময় সময় কী একটা নড়েচড়ে, কোনওদিন দেখতে পাই না। হঠাৎ একদিন ফোঁস করে তেড়ে উঠল একটা সাপ। ফণা তুলে হেলছে, দুলছে। বিস্ময়ে আমি জড়বৎ। সত্যিই তা হলে ছিল! ইঁদুরের গর্তে সাপ থাকে একথা তা হলে মিথ্যে নয়!
