প্রতিবেশী রকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, আজ দেখছি পেল্লায় জিনিস পেয়ে গেছ হরিশঙ্কর! ওটা কী?
দেখতেই পাচ্ছেন, জাহাজের চিমনি।
এবার তা হলে একটি মাস্তুল জোগাড় করে চাঁদ সদাগরের মতো ভেসে পড়ো জলে। মিস্ত্রিকে হুকুম হল, ফিট করে রান্নাঘরের ছাদে। দেখেই তার চক্ষুস্থির। ছাদ এ লোড নিতে পারবে না বাবু। ঘর নেমে আসবে। তুমি লোডের কী বোঝো হে। যা বলছি তাই করো, রোজ বুঝে নিয়ে সরে পড়ো। মিস্ত্রি বললে, এর ফঁদটা একবার দেখেছেন বাবু? ছাদের অতটা খাবলে তুলে নিলে, ছাদের আর থাকে কী? সবটাই তো চিমনি হয়ে গেল। বর্ষায় তো বান ডাকবে ঘরে। তা ঠিক, বলে ভাবতে বসলেন। চিমনি কিছুদিন পড়ে রইল আড় হয়ে একজোড়া দোয়েল এসে সংসাব পেতে বসল। বাচ্চাকাচ্চাও হল গুটিকয়েক। সকাল সন্ধেয় খুব গান শোনা গেল বছর খানেক। অবশেষে সেই চিমনি ছটকাটে সরু হয়ে দেয়াল ফুড়ে সোজা উঠে গেল আকাশে। আস্ত একটা পাঠাকে কাবাব বানানো যায় এমন একটি কড়া উপুড় হল উনুনের মুখে। কড়া যেদিন এল সেদিনও প্রতিবেশী বললেন, যাক, এতদিনে তা হলে পেলে। এইবার চিমনি ফিট করে ভেসে পড়ো সাত সমুদ্রের জলে।
চিমনি দিয়ে যেদিন ভলকে ভলকে ধোঁয়া উঠল আকাশে, সেদিন কী আনন্দ! জমিদারবাবু যেন পায়রা ওড়াচ্ছেন! ব্র্যাভো, ব্রাভো, হোয়াট এ গ্র্যান্ড সাকসেস! প্রতিবেশীরা দেখতে এলেন জনে জনে। একটা কল বানিয়েছ বটে হরিশঙ্কর, তোমার মাথা আছে! ব্যান্ডেজ করা ডান হাত তুলে। অভিনন্দনের প্রত্যুত্তর জানাচ্ছেন আহত হরিশঙ্কর হাসিমুখে। চিমনি ছাদে ওঠার আগে মোক্ষম একটি লাথি ঝেড়ে গেছে পিতার ডান হাতে।
সেই কড়া এখন আমাদের প্রায় কাত করে ফেলেছে। ভলভল করে ধোঁয়া উঠছে। কড়া বিদ্রোহ করে বসে আছে। টানা হ্যাঁচড়া চলেছে খুব। কনকের চুল ছুঁড়ে ধোঁয়া উঠছে। অবশেষে তিনি ঘাড়ে চাপলেন। চোখ লাল, জলে ভরা। কনক বলল, বাব্বাঃ, চোখে এখন সরষেফুল দেখছি।
কন্নকের চালচলন দেখে মনে হচ্ছে মনটা বেশ সাদা। খুব একটা অহংকার টহংকার আছে বলে মনে হয় না। সুখেনের থিয়োরিই ঠিক। যারা সুন্দর, তাদের সবকিছুই সুন্দর। বিপদ কটা-সুন্দরীদের নিয়ে। দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। ঠোঁট সবসময় উলটেই আছে, আমার ভাই দুধটুধ ভাল লাগে na। মা যখন রাতে শোবার আগে দুধ নিয়ে সাধাসাধি করে আমার কান্না পায়। যাদের দুধ জোটে না, তারা বেশ আছে! সুখেন বলে, মেলামেশা করতেই যদি হয় তো সাতপুরুষে বড়লোকের সঙ্গে মিশতে পারিস, একপুরুষে দেখলেই সাত হাত দূরে ছিটকে পালাবি।
আঁচলে চোখ মুছে কনক বললে, এইবার তোমার কোথায় কী আছে দেখিয়ে দাও। বেশি ঝামেলার দরকার নেই। শরীর আর বইছে না গো! একটু শুতে পারলে ভাল হয়।
আমি একটু-আধটু রাঁধতে পারি। যদি আপত্তি না থাকে!
থাক আর বেঁধে দরকার নেই। তোমার কেরামতি পরে দেখা যাবে।
মাছ ছাড়া সবই আছে। সুব্যবস্থার শেষ নেই। ফর্দ করে বাজার হয়। তেল, নুন, মশলাপাতি সারা মাসের মতো মজুত। লেবেল-আঁটা ঝকঝকে টিনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তাকে পাশাপাশি ক্যাটালগ মিলিয়ে অবস্থান করছে। লাইব্রেরির বইয়ের মত। ঝালের দিকে ঝাল, মিষ্টির দিকে মিষ্টি। চিনি, মোটা, মাঝারি, মিহি দানার, ভেলি, কাশীর চিনি। লাইন দিয়ে চলেছে ডালের কৌটো। এমন মানুষকে দেখিয়েই লোকে বলে, বিয়ে হলে তোমার বউ বড় সুখে থাকবে হে। আর কী হবে! সবই তো শেষ হয়ে গেছে। মা তোতা আর ফিরে আসবে না। কনককে দেখে মনটা কেমন যেন করে উঠছে। স্বপ্নে পুরনো ঘটনা মানুষ দৃশ্য দেখা দিয়ে ভেসে চলে যায়। মায়ের চেহারা আমার মনে নেই। যাঁরা দেখেছেন তাদের বর্ণনা থেকে একটা সাদৃশ্য তৈরি হয়েছে কল্পনায়। আমার মা বোধহয় কনকের মতোই দেখতে ছিলেন। পাতলা পাতলা পায়ের চেটো, ছিপছিপে গড়ন, কোমর-ছাপানো চুল। আমি অবশ্য ভোলামামার মতো আমার মা এসেছেন, আমার মা এসেছেন বলে চিৎকার করব না। ভোলামামার এই পাড়াতেই বাস। মাছের ভেড়ি আছে। রোজ রাত বারোটার সময় মদ খেয়ে বাড়ি ফেরেন। মামি রোজই ঝাটাপেটা করেন। এক এক ঘা ঝাটা পড়ছে পিঠে, মামা চিৎকার করছে, আমার মা এসেছে, মা। মায়েরা যেমন ছেলেকে মুখপোড়া বলে, মামিও তেমনি মামাকে মুখপোচ্ছা। বলেন, ঠিক ওই সময়টিতে। পাড়ার গিন্নিবান্নিরা সেই স্ত্রীলোকটিকে সোহাগ করে বলেন, আহা তোমার কী ভাগ্য মা, রোজই ঝেটিয়ে স্বামীকে ঘরে তুলতে হয়। তবে এই গ্রীষ্মের দুপুরে কোনও এক রমণীর চলনে বলনে অতীতের দিন ফিরে এসেছে মনে করে মন যদি সুখী হতে চায়, তোক না!
এই হল তোমার গিয়ে আলু। কনক হিসেব মেলাচ্ছে। পটল, কুমড়ো, তেঁড়স, ঝিঙে, করলা, বরবটি, পেঁপে, কাঁচকলা, মোচা, ঘোড়, কিছুই দেখছি বাকি নেই। ও বাবা, ডুমুরও রয়েছে দেখছি। তুমি কী খাবে?
আমার যে-খানা পাকানো আছে সে খানা দেখলে কনক ঘাবড়ে যাবে। যেমন তার বর্ণ, তেমনি তার গন্ধ।
আমার আছে রুগির ঝোল আর গলা ভাত। সবে পেটের অসুখ থেকে উঠেছি তো!
তা হলে আমিও ঝোল ভাত করে ছেড়ে দিই।
ডিম আছে।
না ডিম চলবে না গো। বাবার আবার অনেক বায়নাক্কা। ডিম খেলে মানুষের পেট গরম হয়। পেট গরম হলে মাথা গরম হয়। ডিম না খেয়ে বাবার মাথা যে কত ঠান্ডা হয়েছে দু-এক দিনের মধ্যেই টের পাবে। যাক উনুন ধরতে ধরতে চানটা সেরে ফেলা যাক। তোমাদের চানের ঘর?
