তারে ছড়ের টান পড়ল। শুরু হল জৌনপুরী রাগে আলাপ। হৃদয়ের মোচড় পড়ল সুরে। পাখি উড়ে গেল।
আলগোছে গেলাসের জলটুকু শেষ করে কাকিমা বললেন, চলো না গো একবার দু’জনে নীচে যাই। ব্যর্থ চেষ্টা। ভদ্রমহিলা ঘুরেফিরে সেই এক প্রসঙ্গে আসছেন। রাত বয়ে চলেছে। আর কতক্ষণই বা! একটু পরেই পাখি ডেকে উঠবে। শেষরাতে মহিলা যদি পিতার সামনে দিয়ে এই ঘর থেকে বেরিয়ে যান, যতই কাকিমা বলি না কেন, বিশ্রী একটা সন্দেহ হতে পারে। এই কিছুদিন আগেই জবার ঘটনায় চরিত্রে দাগ পড়তে পড়তে বেঁচে গেছি। জ্যোতিষীরা একবাক্যে বলেছেন, খুব সাবধান ছোকরা, নারীঘটিত বদনামের তীব্র যোগ রয়েছে। আর বসে থাকা যায় না। রাত বড় ভয়ংকর সময়। অন্ধকারের শক্তি কখন গলায় ফাঁস পরিয়ে দেয় কে জানে?
চলুন তা হলে যাই। বড় টর্চটা সঙ্গে নিই।
মেঝেতে হাতের ভর রেখে কাকিমা মেঝে থেকে শরীর তুললেন। রাত্রির জড়তা লেগেছে। মাথার ওপর দু’হাত তুলে আড়ামোড়া ভাঙলেন।
ধীরে ধীরে শব্দ না করে ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিলুম। আলো আগেই নিবিয়ে দিয়েছি। অন্ধকারে পা টিপে টিপে দু’জনে নীচে নামছি। কাকিমার সেই ভয়ভয় ভাবটা আবার ফিরে এসেছে। একটা ব্যাপার কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না, স্বামীকে যদি ভালবাসা যায়, তা হলে স্বামীর প্রেতাত্মাকে কেন ভালবাসা যাবে না! মানুষের সবকিছুই কি ফঁকিতে ভরা!
সিঁড়ির বাঁক ঘুরে ভয়ে ভয়ে টর্চের বোম টিপলুম। কাকিমা বললেন বটে তিনি খুব সাহসী, সাহসের তেমন প্রমাণ পাচ্ছি না। আমার শরীরের সঙ্গে প্রায় লেপটে আছেন। নিজে কত সাহসী সে তো জানাই আছে। আলোর রেখা অন্ধকারের বুক চিরে সামনে এগিয়ে গেল। অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ল না। আলোর সরণিতে পিনপিন করে এক ঝাক মশা উড়ছে।
আমরা দু’জনে জড়াজড়ি করে অদ্ভুত এক অনিশ্চয়তার দিকে ধাপে ধাপে নেমে চলেছি। একটা সাতসেঁতে ভাব মুখে এসে লাগছে। এই রহস্যপুরীতে একটা কেন, একশোটা ভূত থাকতে পারে। কাকিমার শোবার ঘরের দরজা হাট খোলা। হ্যারিকেন নিবে গিয়ে এক পাশে ভূত হয়ে বসে আছে। বুকের ভেতরটা এবার সত্যিই কাঁপছে। চারপাশ খুব একটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। কারুর। ছেড়ে-যাওয়া আসনে বসলে যেমন উত্তাপ থেকে মনে হয় কেউ ছিলেন একটু আগেই, সেইরকম মনে হচ্ছে।
রান্নাঘরের দরজায় আলো ফেলতেই কাকিমা বললেন, ওই দেখো শেকল খোলা।
ব্যস! ওই একটিই কথা। ভারী শরীর কাঁচা মাটির পুতুলের মতো ধীরে ধীরে আমার শরীরের ওপর ভেঙে পড়ল। টর্চটা হাত থেকে ছিটকে পড়ে গিয়ে নিবে গেল। চারপাশে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার।
১.৪৭ তিনটে কাছি কাছাকাছি যুক্ত
জীবনে এমন একটা-দুটো রাত আসে, যে-রাত ভোর হলে বাঁচা যায়। ভয়ে চৈতন্য হারালে ভয়ের হাত থেকে বাঁচা যায়। না হারালে অবস্থা হয় আমার মতো। টর্চ ছিটকে চলে গেছে রান্নাঘরের সামনের নর্দমায়। ড্যাম্প লেগে আলোর তার নষ্ট হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ লিক করছিল। দেয়ালে হাত ঠেকলেই শক মারছিল। কানেকশন কেটে দেওয়া হয়েছে। কবে মিস্ত্রি আসবেন কে জানে, তারপর আলো জ্বলবে। সে এখন বিশবাঁও জলে।
পরিস্থিতি মানুষকে কীভাবে সাহসী করে তোলে! কী জানি কাকিমার চোখের ভুল কি না! হয়তো রান্নাঘরে শেকল তোলেননি। নিজের ভুলে নিজেই অজ্ঞান। অন্ধকারে যেখানে যেভাবে পড়ে আছেন, সেখান থেকে এখুনি সরাতে না পারলে ভূতের হাত থেকে বাঁচলেও, বিছে কিংবা সাপের হাত থেকে বাঁচা যাবে কি না সন্দেহ!
মৃত্যুর জড়তার চেয়ে বেঁচে থাকার ইচ্ছে মানুষের কত প্রবল! শরীরে কোথা থেকে পালোলায়ানের মতো শক্তি এসে গেল। বড় এক বালতি জল তুলতে যার হাত কাঁপে, দম বেরিয়ে আসে, সে
অনায়াসে একজন মহিলাকে, একটা হাত দুটো পায়ের তলায়, আর একটা হাত পিঠের নীচে দিয়ে। কেমন অক্লেশে তুলে ফেলল! ভীষণ ভয় করছে। পৃথিবীর সবই প্রায় অচেনা, নিজের বসতবাটিও যে কত অচেনা, ভয়ংকর, এই মুহূর্তেই বুঝছি।
বেড়াল যেভাবে মুখে বাচ্চা নিয়ে লটরপটর করে হাঁটে, আমিও সেইভাবে সিঁড়ির দিকে এগোতে শুরু করলুম। কাকিমার পিঠ ঘামে একেবারে ভিজে গেছে। সারাশরীর এলিয়ে আছে। দুটো হাত শরীরের দু’পাশে লটপট করছে। হাতের ওপর দিয়ে ঝুলে আছে ভাঁজ করা দুটো পা। হাঁটুর ভাজ ভিজেভিজে। এই অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে যে-দৃশ্য মনে পড়ল, মন তোমার খুরে খুরে নমস্কার। রোগাপটকা রাজকাপুর যেন আওয়ারা ছবিতে দিঘল নার্গিসকে নিয়ে ড্রিম-সিনে ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে।
পা দিয়ে কী একটা সুট করলুম। হৃৎপিণ্ডে ধড়াস করে একটা শব্দ হল। সেই টর্চ। এতক্ষণ পাশেই পড়ে ছিল। এইবার সত্যি সত্যিই নর্দমায় গিয়ে পড়ল। যাক, আপদ শান্তি, বিপদ শান্তি। কোনওরকমে সিঁড়ি অবদি পৌঁছোতে পারলে, ধাপের ওপর বসিয়ে একটু বাতাসটাতাস করলে। হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবেন! এ দেশের মেয়েদের সাজপোশাকের কোনও মাথামুন্ডু নেই। লজ্জা রাখতে গিয়ে হার্টফেল করার অবস্থা! বুক বেঁধে মানুষ বিপদে ঝাঁপ দেয়, মাঝরাতে বিছানায় শুতে যাওয়ার কী মানে? মেয়েদের অনেক কিছুরই মানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। চেষ্টা করাই বৃথা।
যে-দিকে চলেছি সেই দিকেই সদর। সিংহ দরজা বললেই ভাল হয়। মানসিংহ স্বচ্ছন্দে টাট্টু চেপে টগর গিয়ে ঢুকে পড়তে পারেন। দরজাটা আবার তিনপাট। বহুকালের পুরনো। বাঘের আঁচড়ের মতো কালের আঁচড় খেয়ে ফাটাফাটা, সরু সরু চিড় ধরেছে। এপাশ থেকে ওপাশের আলো নজরে পড়ে। যেন ঝিলমিল দরজা। এখন বাইরে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। আলো দেখার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
