পিতা বললেন, কী দেখছ? কোথায় তোমার ভূত? কোথায় লোহার বল! এই তো তোমার ছাত। দেখে নাও। আমি এখানে বসি। তুমি দেখো। যদি কিছু পাও, আমাকে জানিয়ো, গিয়ে চেপে ধরব। নকল ভূত, ইমিটেশন ভূত দেখেই জীবনটা কেটে গেল, একটা রিয়েল ভূত দেখার বাসনা বহুদিনের।
ভূতের দর্শন পাওয়া গেল না ঠিকই, তবে সে রাতে পিতার অদ্ভুত এক রোমান্টিক চেহারার সঙ্গে পরিচয় হল। জনপদের মাথার ওপর বিশাল এক নির্জন ছাতে আমরা দুটি ভূতার্থী প্রাণী জীবন্ত ভূতের মতো পাশাপাশি বসে রইলুম, দুই সমবয়স্ক বন্ধুর মতো।
পিতা বললেন, রোজই তো আমরা ভেঁস ভেঁস করে ঘুমোই, এসো আজ আমরা বসে বসে জাপানিদের মতো চাঁদের আলো দেখি। নীচে গিয়ে মাদুরটা নিয়ে এসো। কী, একা যেতে ভয় করবে?
কী করে বলি ভয় করবে! ভয় অবশ্যই করবে। রাত আমার কাছে ভীষণ রহস্যময়। যত রাত বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে, এই বনেদি ভগ্ন প্রাসাদের বিভিন্ন দিক একটু একটু করে আমার কাছে। অচেনা হয়ে ওঠে। এমনকী খাটের তলাটাও আমার হাতছাড়া হয়ে যায়। খাট থেকে পা নামাতে হলে মনে হয়, এই বুঝি কেউ খপ করে চেপে ধরল।
মাদুর এল। বিছানো হল। দু’জনে বসে আছি মুখোমুখি। রাত দুটো। পেটা ঘড়ি জানান দিল গঙ্গার দিকের থানা থেকে। পাহারাদারের পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল। মালা পাড়ায় একপাল। কুকুর চিৎকার করেই থেমে গেল। বহু দূরে ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের পাওয়ার হাউস। সশব্দে খানিকটা স্টিম ছেড়ে রাত্রির প্রশান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়ে গেল।
পিতা শুরু করলেন তার যৌবনের কাহিনি। ছাত্রজীবনে কত ক্লেশ সহ্য করেছেন! জ্ঞাতিদের উৎপাতে পিতামহের বাস্তুত্যাগ। প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে সংগ্রাম করে তার শিক্ষালাভ। তাঁর পাণ্ডিত্য। শিক্ষক হিসেবে অসামান্য খ্যাতি। ধমনীতে যে রক্তস্রোত বইছে, তার কণায় কণায় ত্যাগ, আদর্শ, সহিষ্ণুতা, উচ্চভাব, সন্ন্যাস। অর্থ নয়, জ্ঞান, ভোগ নয়, ত্যাগ, নীচতা নয়, উদারতা এ পরিবারের রক্তের সংকেত। মোর্স কোডে প্রতি দিন প্রতি মুহূর্তে সেই কথাই জানাতে চাইছে। ঊর্ধ্বে আরও ঊর্ধ্বে।
শেষে এসে পড়ল মায়ের প্রসঙ্গ। জীবনে সিল্কের পাঞ্জাবি পরেননি। হাতে ঘড়ি বাঁধেননি। বুকে সোনার বোতাম ঝোলাননি। চুলে গন্ধতেল মাখেননি। ধুতি আর শার্ট পরে বিবাহ করতে গিয়েছিলেন। বাসর থেকে মাঝরাতে মায়ের হাত ধরে উঠে এসেছিলেন ক্রোধে, চটুল মহিলাদের চপল রসিকতা সহ্য করতে না পেরে। বাড়ি ফিরে এসে প্রথমে স্নান করেছিলেন, তারপর মুগুর আর বারবেল ভেঁজে মনকে শান্ত করেছিলেন। মা খুব কেঁদেছিলেন, আর বিবাহের অধ্যম উত্তীর্ণ হবার আগেই পিতার ধমক খেতে শুরু করলেন। রাত কাটার আগেই নববধূর রোমান্টিকতা কেটে গেল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সংসার তাকে গ্রাস করে নিল। সামান্যতম সময় নষ্ট হল না বলে দাম্পত্য জীবন হয়ে উঠল খাগড়াই কাঁসার মতো।
পিতা বললেন, তোমার মায়ের মেটালটা অসম্ভব ভাল ছিল, তাই এত সুন্দর অ্যালয় হয়ে গেল, বোঝাই যেত না কে আমি, আর কে তুমি! সেম ভাইব্রেশন! তোমার দুভার্গ্য! জন্মালে মরুভূমিতে উটের মতো। তুমি তখন ছোট, সবে হামা দিতে শিখেছ, আমরা সব শিমুলতলায় গেলুম বেড়াতে। এমনি চাদিনি রাত। গোলাপ বাগান। দূরে আকাশের গায়ে পাহাড়। তোমার মায়ের মুখে চাঁদের আলো পড়েছে। কোলে শুয়ে আছ তুমি। কপালে সিঁদুরের টিপ জ্বলজ্বল করছে। আমি চাঁদ দেখব না তোমার মায়ের মুখ দেখব! কে বেশি সুন্দর! দেখতে দেখতে চোদ্দোটা বছর কেটে গেল। মৃত্যুর আগে ছমাস যমে-মানুষে টানাটানি চলল। ছ’মাস আমি রাতে ঘুমোইনি। একবার রুগির শিয়রে, একবার এই ছাতে। কত রাত একা একা কাটিয়ে গেছি এই ন্যাড়া ছাতে। অমাবস্যা গেছে, পূর্ণিমা গেছে। উত্তরে তাকিয়ে প্রার্থনা করেছি, দক্ষিণে তাকিয়ে করেছি, দিক-দেবতার ক্ষমতা নেই মানুষের যাবার পথ আটকায়। দীর্ঘ রোগ ভোগ করার পরও মুখের চেহারার এতটুকু পরিবর্তন হয়নি। রাত বারোটার সময় চিতায় শোয়ালুম। কোমর পর্যন্ত চুল চারপাশে ছড়ানো। পা দুটো আলতায় টুকটুক। করছে, চাঁদের মতো মুখে গোল লাল টিপ, সিঁথির সিঁদুর চলে গেছে ঊষার পথের মতো। সেই চিতায় আগুন দিতে হল। হোমের শুকনো কাঠের মত দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। তোমাকে একটা কথা বলে রাখি, মৃত্যু আগুন আর সতী যেখানে আছে সেখানে পাপ থাকতে পারে না, ভূত থাকতে পারে না, ভয় থাকতে পারে না। সে এলাকা হল ভগবানের। গায়ে পুট করে এক বিন্দু জল পড়েছিল। মাথার ওপর নির্মল নির্মেঘ নীল আকাশ, জল এল কোথা থেকে! পিতা বলেছিলেন, হয়তো স্বাতী নক্ষত্রের জল। ঝিনুকে পড়লে মুক্ত হত। তোমার গায়ে পড়েছে, দেখো মনটা যদি মুক্তোর মতো হয়ে ওঠে! আমি যদি ঈশ্বর হতুম, সেই রাতে পিতার কাছে তার জীবনসঙ্গিনীকে, আমার মাকে ফিরিয়ে দিতুম। অন্তত এক রাতের জন্যে। তারপর পাশে বসে মজা করে শুনতুম তাদের দু’জনের দীর্ঘ চোদ্দো বছরের জমা কথা। অমন রাত এখনও পর্যন্ত আর আসেনি, আসবে কি না তাও জানি না। অতীত দুঃখ আর সুখের স্মৃতি নিয়ে দূরাগত পাখির মতো পাখা মুড়ে বসেছিল। একসময় বললেন, আমার এসরাজটা নিয়ে এসো।
চাঁদ ক্রমশ পার হয়ে আসছে দীপ-নেবা জীবনের মতো। রাতের ছড়ানো মায়াজাল ক্রমে ক্রমে গুটোতে শুরু করেছে, পুবের আকাশে সূর্যের নখরচিহ্ন দেখা দিয়েছে। এসরাজ কাঁধে তুলে নিতে নিতে পিতা বললেন, আমার সবচেয়ে সমঝদার শ্রোতা ছিল তোমার মা। জানলার ধারে পা মুড়ে বসত। কোলের ওপর লুটিয়ে পড়ত চাঁদের আলো। বসে বসে বাজনা শুনত।
