কাকিমা হঠাৎ দু’হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলেন, ও আর বেঁচে নেই, কিছুতেই বেঁচে নেই।
আর একটু হলেই আমার মুখ ফসকে সত্যি কথা বেরিয়ে পড়ছিল, মিথ্যে বলার নৈতিক সাহস পেলুম এই ভেবে, মর্গে আমিই যে ঠিক দেখেছি, তার কী প্রমাণ আছে।
আমি জোর গলায় বললুম, আপনার চোখের ভুল। বড় বেশি ভাবছেন, তাই স্বপ্ন দেখেছেন।
তুমি বলতে চাও আমি স্বপ্নে দরজা খুলেছি, স্বপ্নে আলো জ্বেলেছি? স্বপ্নে মানুষ এসব পারে!
কী বলছেন আপনি? মানুষ স্বপ্নের ঘোরে মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতে পারে। বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তাস খেলে আসতে পারে। খুন করে আসতে পারে। দিনের পর দিন এইরকম হলে ওটা হয়ে দাঁড়ায় একটা অসুখ, ইংরেজিতে বলে স্লিপ ওয়ার্কিং। তখন ডাক্তার ডাকতে হয়। লেডি ম্যাকবেথ রাজাকে খুন করার পর, ওইভাবে মাঝরাতে প্রাসাদে বাতি হাতে হেঁটে বেড়াতেন।
অদ্ভুত নাম শুনে কাকিমার যেন একটু বিশ্বাস হল। জিজ্ঞেস করলেন, লেডি ম্যাকবেথ কে?
ম্যাকবেথের বউ। ওসব হল রাজরাজড়ার ব্যাপার। উদ্বেগে দুশ্চিন্তায় মানুষের ওরকম হয়।
পিন্টু, তুমি আমার সঙ্গে একবার নীচে যাবে! একবার ভাল করে দেখা দরকার। তুমি যাই বলল, এ আমার চোখের ভুল নয়। আমি খুব একটা ভিতু মেয়েমানুষ নই। পাড়াগাঁয়ে মানুষ। কাল আমি একবার থানায় যাবই। শুনেছি মানুষ হারিয়ে গেলে থানায় খবর দিতে হয়।
থানা কিছু করে না। নাম ঠিকানা লিখে রেখে ছেড়ে দেয়। বড়জোর একটা ছবি চাইতে পারে। ছোট ছেলে হলে একটু যত্ন নেয়। ছেলেধরার উৎপাত আছে। উদ্ধার করতে না পারলে, বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষে করাবে। বড়রা কোনওদিনই ছেলেধরার হাতে পদবে না। হারিয়েও যাবে না। বড়দের রাস্তাঘাট সব চেনা। পুলিশ জানে, কেউ সব ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে যায়। কেউ পরিবারকে জব্দ করার জন্যে গা-ঢাকা দিয়ে বসে থাকে অনেকদিন। কেউ কোনও অন্যায় করে ফেরার হয়ে যায়। সময় হলে সবাই আবার সুড়সুড় করে ফিরে আসে। পুলিশ সব জানে। জানে বলেই বাজে কাজে সময় নষ্ট করে না।
কিন্তু কনকের মতো কেউ যদি মারা গিয়ে থাকে?
কনক মারা গেছে কে বললে?
দেখো দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গা বড় সাংঘাতিক জায়গা। চান করতে করতে বান এসে গেলে সাঁতার-জানা লোকও সামলাতে পারে না। ডুবে না গেলে মেয়েটা যাবে কোথায়? মেয়েরা কি ছেলেদের মতো পালাতে পারে?
কেন পারবে না? পালানোর ব্যাপারে ছেলেতে মেয়েতে বিশেষ তফাত নেই। আমাদের পাড়ার ভারতী নায়িকা হবে বলে একা একা বম্বে পালিয়েছিল।
তারপর কী হল?
একমাস পরে ফিরে এল। ভারতীর মা রেগে তার সব চুল কামিয়ে ন্যাড়া করিয়ে দিলেন। পাড়ার লোক নায়িকা ভারতীর বদলে বলতে লাগল ন্যাড়া ভারতী।
নানা প্রসঙ্গ টেনে কাকিমাকে সহজ করে আনার চেষ্টা সফল হচ্ছে বলেই মনে হল। কাকিমার, চেয়ে বেশি ভয় পেয়েছি আমি। কাকাবাবু একবার যখন এসেছেন, আবার আসবেন। ভৌতিক বইয়ে পড়েছি, মৃত আত্মা অনেক সময় খুনের কিনারা করে দিতে আসে। এইভাবে কত ক্রিমিন্যাল ধরা পড়েছে। পুলিশ পারছে না, বাঘা বাঘা গোয়েন্দারা ঘোল খেয়ে যাচ্ছে, মৃতের আত্মা এসে আততায়ীকে ধরে দিয়েছে। কাকিমার সঙ্গে কথা বলছি, চোখদুটো পড়ে আছে দু’দিকে, একটা অন্ধকার জানলার দিকে আর একটা বন্ধ দরজার দিকে। কোনওরকম আওয়াজ পেলেই কান খাড়া হয়ে উঠছে। রাতের দিকে এ বাড়িটা এমনিই কেমন যেন হয়ে ওঠে! যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, আমার বিশ্বাস তারা ফিরে আসেন। কখনও শুধুই অপ্রাকৃত শব্দ, কখনও সূক্ষ্ম শরীরে দর্শন। পিতৃদেবকে নিজের সন্দেহের কথা বলে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে এনেছি। তিনি বলেন, ভগবান না হলে ভূত দর্শন হয় না! বেশ, দর্শন না হোক শ্রবণ তো হয়। মাঝরাতে ছাদে গড়গড় করে কী একটা শব্দ প্রায়ই হয়। বিশাল ছাদের এ পাশ থেকে ও পাশে লোহার বলের মতো কী একটা গড়িয়ে চলেছে। পিতাকে প্রায়ই বলি। তার বিশ্বাসও হয় না, তেমন পাত্তাও দেন না। শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে বললেন, এবার হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ডাকবে।
সেদিন ছিল পূর্ণিমা। মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। শুরু হল সেই শব্দ। ভারী লোহার বল গড়িয়ে চলেছে পুব থেকে পশ্চিমে। পিতাকে জাগালুম, উঠুন উঠুন, সেই শব্দ। এর আগে একবার হয়েছিল, যেই ডাক শুনে তিনি উঠে বসলেন, শব্দ থেমে গেল। বিছানায় আধশোয়া হয়ে আমরা দু’জন, আবার হবার অপেক্ষায় রাতটা জেগেই কাটিয়ে দিলুম। পিতা বললেন, তুমি ভুল শুনেছ। খাওয়ার গোলমালে জ্যান্ত মানুষের পেট মাঝরাতে অমন গড়গড় করে জানান দেয়, অতি আহারে ভূত হবার সম্ভাবনা। মিতাহারী হও, মিতবাক হও।
সেদিন আমার ভাগ্য ভালই ছিল। শব্দ থামল না, হতেই লাগল। তিনি শুনলেন, তারপর বললেন, চলো, লেট আস সি। প্রস্তাব শুনে গলা শুকিয়ে গেল। তিনি ছাড়ার পাত্র নন, আজ আমি তোমাকে ভূতদর্শন করাবই। ভগবান আর ভূত একই বস্তু। ভাইব্রেশনের ইতরবিশেষ। যেমন কনডেনসেশনের ওপর নির্ভর করে, জল থেকে কুয়াশা, জল থেকে স্নো কিংবা আইস।
ছাদের দরজা বন্ধ। সিঁড়ি ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। বন্ধ দরজার ফাটলে সুতোর মতো চাঁদের আলোর রেখা। হাতড়ে হাতড়ে উঠছি। বেঁচে আছি না মরে গেছি বোঝার ক্ষমতা নেই। দরজার হুড়কো খোলার শব্দ হল। বন্যার জলের মতো চাঁদের আলোয় সিঁড়ির ধাপ ভেসে গেল। ধুধু ছাদ, চাঁদের আলোয় ফটফট করছে। গাছপালা, আকাশ বাতাস সব যেন চাঁদের আলোয় স্নান করে উঠেছে। আমরা যখন ঘুমিয়ে পড়ি প্রকৃতি তখন যেন জেগে ওঠে। বিশাল আরও বিশাল হয়ে যায়। উত্তর দিকে আলসে ঘেঁষে একটা নিম গাছ উঠে গেছে, ঝাকড়া হয়ে। তার পাতায় পাতায় চাঁদের আলো কুচিকুচি হয়ে ঝুলছে। মাঝে মাঝে বাতাস এসে প্রকৃতির ঝাড়লণ্ঠন দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। বিশাল আকাশের তলায় গড়ের মাঠের মতো ছাতে আমরা দুটি প্রাণী। ক্ষুদ্র যে কত ক্ষুদ্র হতে পারে সেদিন বুঝেছিলুম।
