সর্বনাশ, অজ্ঞান হয়ে গেলেন? না মৃত্যু! সন্ন্যাস রোগ আজকাল খুব হচ্ছে। বুকে কান পেতে দেখলুম। সাঁ সাঁ শব্দ হচ্ছে। বেঁচে আছেন। পরক্ষণেই মনে হল, মারা গেলে বেঁচে যেতেন। কোনওদিনই জানতে পারতেন না স্বামীর মৃত্যুর কথা। পরক্ষণেই মনে হল, মারা গেলেই থানাপুলিশ হত। শুধু তাই নয়, ফঁকা জীবন আরও ফঁকা হয়ে যেত। তবু তো একজনের স্নেহ পাচ্ছি।
বিশ্রী ভঙ্গিতে শুয়ে পড়েছেন। কোনওরকমে তুলে আমার বিছানায় শুইয়ে দিতে পারলে বেশ হত। আমার সে শক্তি নেই। মেঝেতেই নানা কায়দা করে চিত করে শুইয়ে দিলুম। পা দুটো ধরে সোজা করে দিলুম। একরকম হল। খোঁপা বালিশের কাজ করছে। শাড়িটা জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। এত দৈন্য কেন? স্বামী ছাড়া কি পৃথিবীতে আর কেউ নেই?
কপালে ভিজে হাতের তালু, পাখার বাতাস, কাকিমা চোখ মেলে তাকালেন। পরিবেশে ফিরে আসতে আরও কিছুক্ষণ সময় লাগল।
চাপা স্বরে বললুম, আমার বিছানায় একটু শুয়ে নিন।
দেয়ালে ঠেসান দিয়ে বসতে বসতে বললেন, এখানেই বেশ আছি।
কী হয়েছে আপনার?
আগে ওই জলের গেলাসটা আন।
আলগোছে ঢকঢক করে জল খেলেন। হাত এখনও সামান্য কাঁপছে। বুকের কাছে জল ছলকে পড়েছে। চিবুকে একবিন্দু জল আটকে আছে। টেবিলের আলো পড়ে হিরের মতো চিকচিক করছে। গেলাসটা পাশে রাখলেন। সরাতে গেলুম, বললেন, থাক।
এইবার তা হলে বলুন, কী হয়েছে?
কাকিমা জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে আবার একবার তাকালেন। মহাশূন্য থেকে কেউ কি ভেসে ভেসে আসবে? ওঁর ভাব দেখে আমার নিজেরই কেমন ভয়ভয় করছে। হঠাৎ একটা কথা ভেবে গা হিম হয়ে গেল। এই নিস্তব্ধ অন্ধকার রাতে যে-কোনও মুহূর্তে কাকাবাবু আসতে পারেন। অপঘাতে মারা গেলে আত্মা সহজে মুক্তি পায় না। আপনজনের কাছে ফিরে ফিরে আসতে চায় পূর্বের দেহ ধরে।
কাকিমা আর আমার মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে সেটুকু ঘুচিয়ে দিতে পারলে একটু সাহস পাই। বলা যায় না ওইটুকুর মধ্যে প্রফুল্লকাকার আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে কি না! আমার চোখে আবার সেই মর্গের দৃশ্য ফিরে আসছে। ঢালু বেয়ে এক একটি দেহ গড়িয়ে আসছে। কারুর মুদিত, কারুর নিমীলিত, কারুর বিস্ফারিত আতঙ্কিত চোখ। আততায়ীকে দেখে ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, সেই
অবস্থাতেই মৃত্যু হয়েছে। কারুর ঠোঁটের কোণে খেলোয়াড়ি হাসি-মৃত্যুর পরোয়া করি না।
মানুষ মনের কথা পড়তে পারে কি না জানি না, কাকিমা বললেন, আমার কাছে সরে আয়। প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে বসলুম। মহিলার অনাবৃত ওপর বাহু বরফের মতো শীতল। লাল সুতোয় বাঁধা ছোট্ট একটি মাদুলি। জানি ওটি কীসের। সন্তানের প্রার্থনা। তাগার সুতো ঝুলছে। সেই ঝোলা। অংশ মাঝে মাঝে আমার হাত স্পর্শ করছে। প্রথমবার চমকে দিয়েছিল।
কাকিমা বললেন, কী ব্যাপার বল তো পিন্টু! এতদিন নীচে একা একা শুয়ে থাকি, কই কোনওদিন তো এমন হয়নি!
কী হল?
হাতপাখা টানতে টানতে কখন একসময় ঘুমিয়ে পড়েছি। খেয়াল নেই। ইঁদুর, আরশোলা খুটুর খুটুর করছিল। ও অমন রোজ করে। অভ্যাস হয়ে গেছে। আলো নিবে গেলে ওদেরই রাজত্ব। কেন। জানি না, হঠাৎ একসময় ঘুম ভেঙে গেল। সারাদিন খাটাখাটুনির পর বিছানায় শুলেই আমি মরে যাই। পড়লুম কি মরলুম। ঘুম ভাঙে সেই ভোরে। ঘুম ভাঙল, ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। কেমন যেন শ্বাসপ্রশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে। উঠে পড়লুম বিছানা ছেড়ে। ভাবলুম বাইরে বেরিয়ে ফাঁকা জায়গার একটু হাওয়া বাতাস লাগালে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। অন্ধকারে দরজা খুলে বাইরের গলিতে পা দিয়েই ভয়ে কাঠ হয়ে গেলুম। রান্নাঘরের সামনের রকে সাদামতো কে একজন উবু হয়ে বসে। মাথাটা যেন দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে। চোর নয় তো! বদমাইশ লোকও হতে পারে। খুব জোরে কে বলে চিৎকার করার চেষ্টা করলুম, গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোল না। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালার ইচ্ছে হল, চলতে পারলুম না। শরীর যেন পাথরের মতো হয়ে গেছে। সেই মূর্তি উঠে দাঁড়াল পিন্টু। তোমার কাকাবাবু। তখন আমার সাহস ফিরে এল। আমি বললুম, একী, তুমি কখন এলে? কে তোমাকে সদর খুলে দিলে? এখানে বসে আছ, আমাকে ডাকোনি কেন? মুখে কোনও কথা নেই। ভাবলুম, কোনও খবর না দিয়ে এতদিন পরে ফিরেছে, তাই বোধহয় লজ্জায় কোনও কথা বলছে না। আমাকে পাশ কাটিয়ে মুখ নিচু করে ঘরে ঢুকে পড়ল। আমি পেছন পেছন ঘরে ঢুকে, হাতড়ে হাতড়ে দেশলাই বের করতে করতে রাগের গলায় বললুম, তোমার সেই ভাঙা লাইটারটা জ্বেলে ধরেও তো একটু উপকার করতে পারো। স্বার্থপর। আলো তো জ্বলল পিন্টু, তারপর যা হল, তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। ঘরে কেউ নেই। বিছানায় নেই, খাটে নেই, খাটের তলায় নেই, কোথাও নেই। আলো হাতে বাইরে এলুম, জোরে জোরে বললুম, কী গো, আমার সঙ্গে চোরচোর খেলছ নাকি! চারপাশ বাক্সর মতো বন্ধ, মানুষটা এল কোথা দিয়ে! রান্নাঘরের দরজায় বাইরে থেকে শেকল ভোলা। হঠাৎ ঘরের মধ্যে দুম করে একটা শব্দ হল। আলো হাতে ছুটে গেলুম। ঘরের মাঝখানে তবলা-ঠোকা হাতুড়িটা পড়ে আছে। তুমি বিশ্বাস করো পিন্টু, হাতুড়িটা ও যাবার সময় ঝুলিতে ভরে নিয়ে গিয়েছিল। আমি কোনওরকমে হামাগুড়ি দিয়ে ওপরে তোমার কাছে পালিয়ে এসেছি।
