মন যে এক নিয়ন্ত্রণহীন বিশ্রী বস্তু, আর একবার জানা হল এই মুহূর্তে। রাত যখন নিস্তব্ধ গভীর, পৃথিবী যখন ঘন ঘোর, অশরীরীরা যখন বিচরণশীল, সাধকরা যখন ধ্যানের আসনে, সেইসময় সন্তান কেমন করে মায়ের প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে এইসব ভাবতে পারে! মানুষ বড় ক্ষুধার্ত প্রাণী।
ছবিটা একপাশে সামান্য হেলে আছে। মধ্যরাতে পরলোকগত কোনও নিকটজনের প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়ালে যে গা ছমছম করে, শরীরে এক ধরনের শিহরন হয়, এই প্রথম অনুভব করলুম। ঘর থেকে ঘরে লাল মেঝে চলে গেছে। ওপাশের স্টোর রুমে, জানলার খাজে ফার্পো রুটির একগাদা খালি ঠোঙা, পিতৃদেবের, যাকে রাখো সেই রাখের নির্দেশে পর্বতপ্রমাণ হয়ে আছে। সেখানে ধেড়ে ইঁদুর নৃত্য করছে। বাইরে বাতাসের দীর্ঘশ্বাস।
দেয়ালে কোনও ছবি হেলে আছে দেখলে, পিতা বড় অসন্তুষ্ট হন। ঘটনা ঘটে গেছে বিকেলে, তারপর তিনি আর এঘরে আসার সুযোগ পাননি। যদি আসতেন, ছোটখাটো একটা কুরুক্ষেত্র হয়ে যেত। মৃতের প্রতি এত বড় অসম্মান! পারলে অপরাধীকেই ছবি করে ঝুলিয়ে দাও।
দু’হাত বাড়িয়ে ছবিটাকে সোজা করতে গিয়ে আবার হাত সরিয়ে নিলুম। মা যেন ফিসফিস করে বললেন, খোকা! তুই কত বড় হয়ে গেছিস!
সাহস করে মায়ের মুখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালুম। চোখদুটো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এখুনি হয়তো চোখের পাতা পড়বে। শ্বাসপ্রশ্বাসের মৃদু শব্দ শোনা যাবে। ভয়ভয় ভাবটা কেটে গেল। মনে হল জিজ্ঞেস করি, তুমি এখন কোথায় আছ মা? শুনেছি পরলোকে অনেক স্তর আছে! কোন লোকে তোমার অবস্থান!
মা যেন বললেন, জীবন কেমন লাগছে?
এ প্রশ্নের উত্তর এখনই আমি কেমন করে দেব! যেমনই লাগুক, জীবন থেকে তো বেরিয়ে যেতে পারব না। পুরো মেয়াদ আমাকে খেটে যেতে হবে।
মনে আর চোখে যে ঘোর লেগেছিল, হঠাৎ সে ঘোর যেন কেটে গেল! ছবি সেই ছবিই। বহুকাল আগে বেঁচে থাকা কোনও এক স্নেহময়ী জননীর ধূসর হয়ে আসা একটি পট। যিনি ছিলেন এখন আর নেই। ঠোঁটের কোণে সুখের দিনের একচিলতে হাসি। যাকে ভুলতে ভুলতে প্রায় ভুলেই এসেছি। আজকাল ল্যাবরেটরিতে একটা জিনিসের দিকে প্রায়ই হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। বোতলের মুখে ফানেল, ফানেলে ভাঁজ করা ফিল্টার পেপার, কাঁচের মতো স্বচ্ছ তরল পদার্থ টুপটুপ করে পড়ছে, ফিল্টার পেপারে জমে উঠছে তলানি। জীবনের নির্যাস কালের বোতলে টুপটুপ করে পড়েই চলেছে, আমরা সব রেসিভিউ।
রবিবাবু মাঝে মাঝে প্রশ্ন করেন, কী অমন দেখো বলো তো হাঁ করে?
অনুমতি নিয়ে ছবির পেছনে হাত দিলুম। দেয়াল আর ছবির মাঝখানে একটা খাম ছিল। দেয়াল বেয়ে খস করে মেঝেতে পড়ে গেল। চমকে উঠেছিলুম। ছবিটিকে জ্যামিতিক কোণ মেপে সোজা করে, টেবিল ল্যাম্পের তলায় এসে বসলুম।
এখন আমার একটা নিজস্ব ঘর হয়েছে। ব্যবস্থা হয়েছিল কয়েকদিন আগেই। দখল নিয়েছি আজ। পিতা যেদিন ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়ে উঠলেন হঠাৎ, সেইদিনই বললেন, রাতই হল মানুষের সাধনার সময়, অলৌকিক দর্শনের সময়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একই সময়ে বিভিন্ন মতাবলম্বী সাধকরা বসেছেন আসনে, পৃথিবীর নাভিপদ্ম থেকে উঠছে অনাহত ওঁকারধ্বনি, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে ঝরনা কলম্বনে, উত্তাল হিমবাহ নামছে ভীমগর্জনে, সাইবেরিয়ার বরফ-সমুদ্রে সশব্দে। ফাটল ধরছে, এই সময়ের সঙ্গে কেউ যদি নিজেকে একবার জুড়ে দিতে পারে, তার আরোহণ কেউ ঠেকাতে পারবে না। জীবন বড় সংক্ষিপ্ত। যে যেখানে আছ শুরু করে দাও। শুরু করে দাও এখনই। সেই লালাবাবুর মতো। যেই শুনলেন মা ডাকছে মেয়েকে, ওরে আয়, বেলা যে পড়ে এল, অমনি তিনি বেরিয়ে পড়লেন। সব ছেড়ে। জানি প্রথম প্রথম একা শুতে একটু ভয়ভয় করবে, পরে অভ্যস্ত হয়ে যাব। সন্দেহ হয়, এ ব্যবস্থা বোধহয় আমার পিতার পূর্ব-পরিকল্পনা। জীবনে একটি মেয়ে আসছে। ফল পেকে টুসটুসে হয়ে ঝুলছে।
সিলকরা খাম। ভেতরে শক্তমতো কিছু একটা আছে। আলোর সামনে তুলে ধরতেই বোঝা গেল, ভেতরে একটি আংটি, আর ভঁজ করা একটি কাগজ রয়েছে। খামটা সাবধানে ছিঁড়তে যাব, দরজায় টোকা পড়ল। তাড়াতাড়ি ড্রয়ারে ঢুকিয়ে দিলুম। গোপনে দেখতে হবে, কী রেখে গেছে মুকু।
দরজা খুলেই চমকে গেলুম। পঁড়িয়ে আছেন কাকিমা। চোখমুখ ভয়ে কেমন যেন বিবর্ণ। আমার পাশ দিয়ে ঘরে ঢুকে এসে ফিসফিস করে বললেন, দরজা দাও, দরজা দাও।
দরজার ছিটকিনি তুলে দিয়েই মনে হল, কাজটা বোধহয় ঠিক হল না। হঠাৎ পিতা যদি উঠে আসেন খোঁজখবর নেবার জন্যে, আর যদি দেখেন ইনি রয়েছেন, তা হলে এমন কিছু ভাববেন না তো, যা একটু অন্যরকম। ভাবা গেল কিছু করা গেল না। কাকিমা মেঝেতে বসে পড়েছেন।
ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলুম, কী হল? ফিসফিস করেই বললেন, কাছে আয়, বলছি।
পাশে বসতেই আমার একটা হাত চেপে ধরলেন। হাত কাঁপছে। পিন্টু, আমি নীচে শুতে পারলুম না রে! এই দেখ আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে।
কেন, শীত করছে?
না, না শীত নয়। ভয়ে।
কীসের ভয়!
কাকিমা এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। খোলা জানলায় অন্ধকার আকাশ, সেই দিকে ভয়ে ভয়ে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলেন। আমার হাতে তার হাতের মুঠো শক্ত হল। দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসেছিলেন, হঠাৎ একপাশ কাত হয়ে পড়ে গেলেন।
