স্নেহের ঋণ অর্থে শোধ করা যায় না, জয়। সে চেষ্টা কোরো না। পৃথিবীটা তা হলে বিশাল এক গোলদারি দোকান হয়ে বসবে। কারেন্সি নোটে স্নেহ বিক্রি হবে। দশ টাকার ভালবাসা, বিশ টাকার ভালবাসা।
মাতুল করুণ মুখে বললেন, আপনার হিসেব থেকে একটা দিন আমাকে দিন, ওনলি ওয়ান ডে, তা না হলে মনে হবে, আপনি আমাকে পপার ভাবছেন!
যেদিন তুমি প্রকৃত নিঃস্ব হবে সেদিন তো তুমি আরও কাছে চলে আসবে। মনে আছে, তুমি আমার কোলে বসে প্রথম আসরে গান গেয়েছিলে, একটি ভজন, জয় রঘুপতি, শ্রীরামচন্দ্র, সীতাপতি রঘুরাই। শ্রোতারা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। প্রতিভা মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়, আর তখনই সে হয় প্রকৃত ধনী।
মাতুল করুণ মুখে বললেন, তা হলে আমি কী করব! আমার যে বড় আশা ছিল।
ঠিক আছে, আজ তুমিই দাও। অনুমতি দিলুম।
সামান্য ব্যাপার কত অসামান্য হয়ে ওঠে। মাতুলের মুখ দেখে মনে হল হাতে স্বর্গ পেলেন। টাকাপয়সা মিটিয়ে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলুম। রাত যেন আরও মদির হয়েছে।
মাতুল বললেন, এইবার আমরা আর এক জায়গায় যাব, যেখানে গেলে আপনি ভীষণ খুশি হবেন।
কোথায়?
আমার গুরু এসেছেন, অনেকদিন পরে এই কলকাতায়।
তোমার তো তিনজন গুরু।
শেষ তালিম যার কাছে, সেই বিখ্যাত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
বলো কী। তিনি এসেছেন! কোথায় উঠেছেন?
প্রিটোরিয়া স্ট্রিটের এক বাড়িতে।
চলো তা হলে?
নিউ মার্কেট থেকে তা হলে কিছু ফল আর ফুল কিনে নিই। বড় সাত্ত্বিক মানুষ। এক ভরি ভাল আতর কিনতে পারলে বেশ হত।
আতর তুমি এ পাড়ায় পাবে না, ছুটতে হবে কলুটোলা।
নিউ মার্কেটের দিকে গাড়ি ঘুরল। ফলের বাজার লাল করে রেখেছে আপেল। আঙুর এসেছে। আপেলের দাপটে ন্যাসপাতি কোণঠাসা। দেখতে দেখতে ঠোঙা ভরে উঠল। থরে থরে সাজানো শুকনো ফল। নিজেকে মনে হচ্ছে ওমর খৈয়াম। পারস্যের কোনও এক অতীত রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আধঘণ্টার মধ্যেই মাতুলের আশি টাকা শেষ। গাড়ি চলেছে প্রিটোরিয়া স্ট্রিটের দিকে। ফল আর মেওয়ার গন্ধ ফুলের গন্ধের সঙ্গে মিশে নতুন এক সুগন্ধ তৈরি করেছে। মনে হচ্ছে এখুনি বুলবুল শিস দিয়ে উঠবে।
দেবদারু গাছ দিয়ে ঘেরা সাবেক আমলের বিশাল এক বাড়ি। কলকাতার নির্জনতম এলাকা। যত না রাত, মনে হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি রাত জমেছে এ তল্লাটে। আদ্যিকালের আলোকস্তম্ভ থেকে পাণ্ডুর আলো অন্ধকারের নিতম্বে সামান্য লজ্জাবস্ত্রের মতো দুলছে।
সামনেই বিশাল গেট। গেটের বাইরে আলোকিত কাঁচের ফলকে গৃহস্বামীর নাম ও নম্বর। মোরাম-বিছানো পথ বাঁ দিকে চলে গেছে ভদ্র মোচড় মেরে, অতি গভীর এক গাড়িবারান্দার দিকে। সেখানে সাদা একটা ডুম থেকে বৈধব্যের আঁচলের মতো আলো লুটিয়ে পড়েছে। গাড়ির চাকায় চাকায় মোরামের মুমূর্ষ আর্তনাদ।
প্রাসাদের মতো বিশাল বাড়িটি যেন সুরসাগরে ভাসছে। কোথাও কোনও এক জায়গায় একসঙ্গে গোটা তিনেক তানপুরা বাজছে। মাতামহ ঠিকই বলেন, সুরে বাঁধা তানপুরায় হরি ওঁ, হরি ওঁ শব্দ ওঠে। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হতেই, দেবদারুর পাতায় পাতায় বাতাসের শব্দের সঙ্গে সুর ভেসে এল। ভেতরে আলাপ চলেছে। ভরাট নিটোল কণ্ঠ।
গাড়ি থেকে নেমে আমরা তিনজন কিছুক্ষণ স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলুম। সুরে অবগাহন। পাথরের সিঁড়ি ধাপে ধাপে উঠে গেছে পালিশ করা বিশাল দরজার দিকে। সেখানে ঝকঝক করছে পেতলের হাতল। একটি মকরের মুখ।
মাতুল ফিসফিস করে বললেন, আহা মারু বেহাগ।
আমাদের অবস্থা ফণা-তোলা সাপের মতো। স্থির হয়ে গেছি। নড়তে চড়তে পারছি না। শরীর প্রতিটি কোষ দিয়ে আরকের মতো সুর শুষছে। ইতিমধ্যে আলাপ থেকে শিল্পী নেমে এসেছেন বাণীতে,
ভবানী স্তোতুং ত্বাং প্রভবতি চতুর্ভিনবদনৈঃ
প্রজানামীশোন ত্রিপুরমথনঃ পঞ্চভিরপি।
ধরতাই ভবানী শব্দটি খাদ থেকে একেবারে তারায় চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কুণ্ডলিনী শক্তি সাধকের সহস্রার ভেদ করে জ্যোতিলোকে চলে যাচ্ছে।
আমরা সিঁড়ি বেয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধাপে ধাপে উঠছি। হাতে ফল। একগুচ্ছ সাদা গোলাপ।
১.৪৬ The hour has come
হলঘরে মায়ের ছবির সামনে এসে দাঁড়ালুম। রাত বেশ গভীর। সারাবাড়ি আজ নিস্তব্ধ। অন্যদিন হলে ঠিক পাশের ঘরেই মেসোমশাইয়ের নাক ডাকার শব্দ শোনা যেত। শোনা যেত মুকু পাশ ফিরছে, ঘুমের ঘোরে হাত তুলেছে তাই চুড়ির মৃদু প্রতিবাদ, আঃ কী হচ্ছে!
এই চুড়ির শব্দের সঙ্গে আঃ, কী হচ্ছে শব্দটা এমনভাবে আমার মনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, কিছুতেই যেন ভুলতে পারি না। মনের সঙ্গে শব্দটা ভাল কিছু জড়িয়ে দিতে পারেনি, যেমন ঘণ্টা আর শাঁখের শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেবালয়ে আরতির দৃশ্য, ধূপ আর ধুনোর গন্ধ, পুরোহিতের পইতা শোভিত, উদার-অনাবৃত গৌরবর্ণ পৃষ্ঠদেশ। উঃ আর আঃ-র সঙ্গে রোগশয্যা। ওই শব্দটি বড় দেহবাদী। মধ্যরাতে কাছাকাছি দুটি দেহের অবস্থান। উত্তাপ আবেগ, জীবলীলার যাবতীয় উষ্ণ প্রক্রিয়া। ইচ্ছা জড়ানো একটি প্রতিবাদ শব্দ। যৌবন উদগমে, আমার এক বন্ধুর বাড়িতে একটি ঘরে শুয়ে, সারারাত পাশের ঘরে এমনি শব্দ শুনেছিলুম। চুড়ির রিনরিন আর আঃ কী হচ্ছে! পরের দিন। সকালে আমার সেই একান্ত বান্ধবের দাদার মুখের দিকে ভাল করে তাকাতে পারিনি। সকালে বউদি যখন চা দিতে এলেন আমি মুখ নিচু করে রইলুম। সব মানুষই অক্লেশে কেমন দুটো জীবন, বহন করে চলে। সবাই জানে পোশাকের তলায় থাকে নগ্ন শরীর। এ জানা আরও এক ধাপ বেশি জানা।
