সবই ভাল, তবে কী জানো, বড় বেশি যদি রয়েছে। যদিগুলোকে যদি বাদ দিতে পারতে!
আজ্ঞে টাকার অভাব হলেই যদি আসবে। একমাত্র টাকাতেই যদির উৎপাটন সম্ভব! টাকাই হল সুপ্রিম ডেনটিস্ট।
তোমার বুঝি সেইরকম ধারণা?
আজ্ঞে হ্যাঁ। টাকা হল জার্মান ট্যাঙ্কের মতো, গড়গড়িয়ে চলে।
খুব ভাল ধারণা হে! এই তো একজন মানিড ম্যানকে আমরা সি-অফ করে এলুম। তিনি কি সুখী! টাকা তার জীবন-সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে? পারেনি। একটা মজার ইংরিজি উক্তি শোনো, মন দিয়ে শুনবে, অনেক ‘পান’ আছে: The only incurable troubles of the rich are the troubles that money cannot cure. /Which is a kind of trouble which is even more trou blesome if you are poor. শুনলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, তবে ও হল গরিবের দ্রাক্ষাফল টক জাতীয় কথা। পিতা শব্দ করে হাসলেন, হেসে বললেন, তা হতে পারে, বড়লোক না হলে যাচাই করা যাবে না।
টাকার দুটো পিঠই যে সমান, টাকা না হলে বুঝি কী করে!
প্রসঙ্গ পালটে পিতা বললেন, ও অমন ম্যাদামারা হয়ে বসে আছে কেন?
আমার কথা হচ্ছে। মাতুল বললেন, মন খারাপ হয়েছে। মা-মরা ছেলেরা সকলকে বড় আঁকড়ে ধরতে চায়। বড় ভাবপ্রবণ হয়। মনে একটা শূন্যতা নিয়ে ঘোরাফেরা করে।
তা বললে তো চলবে না। তোমার ইমোশনকে কে বসে বসে পাখার বাতাস করবে? মনকে শক্ত করতে হবে। যোদ্ধা হতে হবে।
মাতুল বললেন, বি চিয়ারফুল মাই বয়।
পেছনের কোনও কথাই আমার তেমন কানে যাচ্ছে না। আমি ভাবছি মুকু শেষ মুহূর্তে আমার হাতে যে চিরকুটটা গুঁজে দিয়েছিল, তাতে কী লেখা ছিল? কী এমন কথা যা মুখে বলা যায় না! অদৃষ্টলিপির মতো যা ট্রেনের চাকায় চাকায়, ইঞ্জিনের নিশ্বাসের টানে উধাও হয়ে গেল! কী লেখা ছিল! মায়ের ছবির পেছনে কী আছে! কী রেখে গেছে মুকু! এই আলোকিত পার্ক স্ট্রিট, এই রাতের কলকাতায় উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াবার প্রস্তাব, কোনওটাই আমার ভাল লাগছে না।
মাতুলের নির্দেশে গাড়ি রাস্তার বাঁ দিকে থেমে পড়ল। আমাদের নামতে বললেন। সামনেই খুব ভদ্র চেহারার সায়েবি রেস্তোরাঁ। সামনের দিকটা পুরো কাঁচ দিয়ে ঢাকা। ভেতরে মোম-মোলায়েম আলোর বাহার। যাঁরা বসে আছেন, তাদের বাইরে থেকে যতটুকু দেখা যাচ্ছে, তাইতেই মনে হচ্ছে ফিল্টার করা ভদ্রলোক।
পিতা বললেন, এখানে তুমি কী করবে?
আপনাকে এক কাপ সর্বাঙ্গসুন্দর চা খাওয়াব, আর দু-একটা সুইস প্যাস্ট্রি।
বড় ফ্যাশানেবল জায়গা যে! কৃত্রিম মানুষে ভরা। এখানে খাওয়ার চেয়ে খাওয়ার ভড়ংটাই বড় হয়ে উঠবে, জয়।
ও আপনি একটু ক্ষমাঘেন্না করে নেবেন। চায়ের তৃষ্ণাটা মিটিয়ে নিই। এই শহরে আজ আমার শেষ রাতের আগের রাত। আজ একটু বেহিসাবি হতে দিন।
বেহিসাবি? তোমার বেহিসেবটাই তো হিসেব, জয়! শিল্পীর জীবন, তোমাকে ক্ষমা করা যায়। তুমি যদি খেরোর খাতা খুলে বসো বড় বেমানান হবে! কবে যাচ্ছ তুমি?
কালকের দিনটা আছি।
মাতুলের সঙ্গে আমরা রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লুম। এলাহি ব্যাপার। পিতা কিন্তু বেশ মানিয়ে নিলেন। একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব বেরিয়ে এল। মনে হল রোজই তিনি সকাল-বিকেল এখানে চা খেতে আসেন। ওঁরা কথা বলতে লাগলেন, আমি তাকিয়ে রইলুম দেয়ালে সাঁদ করানো বিশাল অ্যাকোরিয়ামের দিকে। স্বপ্ন ভরা, কাঁচের চৌকো আধার। আলোর তরল ধারায় রঙিন ইচ্ছের মতো মাছ ঘুরপাক খাচ্ছে। ঠিক নীচেই বসেছেন একজন পুরুষ আর মহিলা পাশাপাশি। দুজনেই সুন্দর। মহিলার মুখ চোখ ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সুখের সমুদ্রে পদ্মের মতো পাপড়ি মেলেছেন। বাতাসে নৌকা ভাসিয়েছেন। আমার ভীষণ মুকুর কথা মনে পড়ছে। আজ থেকে হয়তো সাত বছর পরে ওইরকম কোনও সুবেশ সুন্দর তরুণের সঙ্গে মুকু ঠিক ওই জায়গাটিতে এসে বসবে। ওইরকম সুখী চেহারা নিয়ে। পেছনে মাছ খেলবে। ঘাড় একপাশে কাত। বড় ঘনিষ্ঠ। কুচকুচে কালো চুলের চকমকে খোঁপা পিঠের কাছে, একমুঠো নরম কামনার মতো দলা পাকিয়ে থাকবে। কী আশ্চর্য মানুষের মন। পাশেই বসে আছেন দুই গুরুজন। আর আমি কী সব ভাবছি! মানুষের আগুন কীভাবে জ্বলে ওঠে! জলে ভাসমান এক টুকরো জ্বলন্ত কর্পূরের মতো!
বড় সুস্বাদু প্যাস্ট্রি। জিভে পড়ামাত্র মিলিয়ে যাচ্ছে চকোলেটের গন্ধ নিয়ে। চায়ের তেমন কোনও আহামরি বুঝছি না। পিতা কিন্তু খুব তারিফ করছেন। বলছেন, রিয়েল ইংলিশ টি।
পিতা বললেন, তুমি কি একলা যাচ্ছ?
না, সপরিবারে।
থাকার ব্যবস্থা?
ভাল কোয়ার্টার।
বেশ, তা তোমার পিতৃদেব?
নিয়ে যাওয়া যাবে না। তিনি একই দিনে রওনা হচ্ছেন হরিদ্বার। আটকানো গেল না।
কই আমাকে তো কিছু বললেন না?
নিশ্চয়ই বলবেন। আপনি ওঁর বড় ছেলে। আমার ওপর ভীষণ অভিমান হয়েছে। অভিমান হলেই ওঁর বৈরাগ্য আসে।
তুমি কী বুঝবে বলো! একে বলে, ওয়ান চাইল্ড সিন। ওঁর আর আমার একই অবস্থা!
বিল এসে গেল। পিতৃদেব আর মাতুল একসঙ্গে হাত বাড়ালেন। মাতুল বললেন, এটা আমার বিষয়।
পিতা বললেন, পাগল হয়েছ, জীবনে আমি কখনও অন্যের পয়সায় খাইনি, তুমি আমার সে রেকর্ড নষ্ট করে দিতে পারো না! তা হলে তোমার অপরাধ হবে। তা ছাড়া, আমার বয়েস। বয়েসটার কথা একবার ভাবো!
বয়েস আমি ভাবতে রাজি আছি। আপনি আমার চেয়ে বড়। বয়েসে, সম্মানে; কিন্তু পরের পয়সা! কথাটায় বড় আঘাত পেলুম। আমি তো কখনও আপনাকে পর ভাবিনি। আপনি আমি আর দিদি একই বিছানায় দিনের পর দিন শুয়েছি। অসুখে আপনি আমার সেবা করেছেন। সেসব ঋণ আমি জীবনে শোধ করতে পারব।
