যা ভেবেছিলুম তাই, মেসোমশাই যুবকটিকে লুফে নিলেন। সারাটা পথ কবজা করার চেষ্টা করবেন। স্বার্থসিদ্ধি করতে গিয়ে বড় মেয়েটিকে খুইয়েছেন। হয়তো পড়েছেন, অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। লোভ জাগলে সে কথা আর মনে থাকে না। মানুষ নামক প্রাণীর এইটাই মনে হয় স্বধর্ম। ভুল, আবার ভুল, ভুলের ওপর ভুল, অবশেষে সেই স্কুপ চাপা পড়ে মৃত্যু।
গার্ডের বাঁশি বেজে উঠল। আচ্ছা আসি, সাবধানে যাবেন, মাকে আপনার কথা বলব, গিয়ে চিঠি ইত্যাদি মিলিত মিশ্রিত কথার স্রোত ঠেলে আমরা প্ল্যাটফর্মে নেমে এলুম। সেই মহিলা তখনও মাতুলের দিকে ‘সতৃষ্ণ নয়ন’ বলে যাকে, সেই চোখে তাকিয়ে আছেন। ওঁর স্বামীটির জন্যে বড় বেদনা হল। সংসারকে জ্ঞানীরা এমনিই বলছেন- ধোঁকার টাটি, মাতুলের মুখে কবীরের ভজন শুনেছি, কঙ্কর চুন চুন মহল বানায়া, লোভ কহে ঘর মেরা, না ঘর মেরা, না ঘর তেরা, তারপর ভুলে গেছি। সেই সংসারী মানুষ যদি এমন স্ত্রীর সঙ্গে ঘর বাঁধেন, যাঁর আঁখিপাখি খাঁচাছাড়া, তার অবস্থা কী হবে! বসে থাকতে হবে পথ চেয়ে। যৌবনের পালক ঝরে গিয়ে স্ত্রী যতদিন না রোঁয়া-ওঠা শালিক হচ্ছেন ততদিন বালুকাবেলায় বসবাস।
মুকু ইশারায় জানলার কাছে সরে আসতে বলল। ট্রেনের শেষ পতাকা গার্ডের কামরার কাছে দোল খাচ্ছে। পাশের কম্পার্টমেন্টের জানলার কাছে একটি শিশু মায়ের কোলে ঝিকি মেরে মেরে কাঁদছে আর চিৎকার করছে, বাবা বাবা। মেয়েটির বাবা জানলা দিয়ে হাত বের করে ক্রমান্বয়ে নাড়ছেন। ড্রাইভারে আর গার্ডসায়েবে পতাকায় পতাকায় কথা হচ্ছে, ভেঙে দে, ভেঙে দে, মিলনমেলা ভেঙে দে। আর সময় নেই। ইঞ্জিনে গতির টান লেগেছে। কী আশ্চর্য! মুকু কিছু বলছে না কেন?
বলো, কিছু বলো।
মুকু বললে, বাড়ি গিয়ে মায়ের ছবির পেছনটা একবার দেখো।
ট্রেন ধীরে ধীরে সামনে এগোচ্ছে। মুকু চট করে আমার হাতের মুঠোয় একটা চিরকুট গুঁজে দিল। গতির টানে হাত থেকে হাত খুলে গেল। মুকু আমার হাতে কী গুঁজে দিল, দেখতে গিয়ে যেই মুঠো খুললুম, চলমান ট্রেনের নিশ্বাসে একটুকরো কাগজ উড়তে উড়তে ট্রেন আর প্ল্যাটফর্মের খাঁজে ঢুকে গেল।
পেছন থেকে পিতা আর মাতুল বলছেন, চলে এসো, চলে এসো।
কথা আমার কানে ঢুকছে না। লাইনে আর অপসৃয়মান সরীসৃপের চাকায় চাকায় ঝটাপটির শব্দ হচ্ছে। দূরে ইঞ্জিনে তাল ধরেছে, ভেঙে যায় চুরে যায়, ভেঙে যায় চুরে যায়। হাত নেড়ে বললুম, যাচ্ছি।
ঠ্যাঙা গার্ডের কামরা, এক জোড়া নুলো হাতের মতো বাফার আর লাল আলো নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। শূন্য প্ল্যাটফর্ম আর অনেক নীচে জোড়া জোড়া লাইন। রত্ন হারিয়ে মানুষ যে-চোখে তাকায় সেই চোখে পাতা লাইনের দিকে তাকালুম, যদি পাই লাফিয়ে পড়ব। কোথায় কী! এক টুকরো কাগজের বদলে অসংখ্য টুকরো পড়ে আছে। পড়ে আছে কলার খোসা, ডাবের খোলা, তেল কালি, কয়লা ছাই।
কাঁধে হাতের স্পর্শ। মাতুল বললেন, চলে আয়। স্মৃতি লাইনে কেউ ফেলে যায় না, রেখে যায়। মনে। কত যাবে, কত আসবে, মন খারাপ করলে চলে! ভাবকে চেপে রাখবি মনে, তবে সে ঠেল মারবে সৃষ্টিতে!
মাতুল বীরের মতো বলছেন বটে, কিন্তু তারও চোখদুটি ছলছল করছে। চশমার কাঁচে আলো পড়লেও দেখা যাচ্ছে। মাতুল শিল্পী মানুষ, তিনি সৃষ্টির কথা বলতে পারেন, আমার তো সবই। অনাসৃষ্টি।
এসেছিলুম পাঁচ জন। ফিরে চলেছি তিন জন। ঘটনা প্রতি মুহূর্তেই জীবনের সার কথা বলে যেতে চায়। পাগল ছাড়া কেউ বোঝে না। আমাদের মণিপাগলি বেশ বলে, সুর করে গায়, আমার দিন থাকে না, আমার রাত থাকে না। আমার প্রাণ থাকে না, আমার মান থাকে না। তারপর মার্চিং সঙের মতো ধমকে ধমকে বলতে থাকে, দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক, শূন্য, ফক্কা ফাঁক।
মাতুল পিতাকে বললেন, চলুন, আজ আপনাকে সারা কলকাতা ঘোরাব। এমন সুন্দর রাত! দখিনা বাতাস বইছে।
কলকাতায় কী ঘুরবে! শুধু শুধু সময় নষ্ট। চলো বাড়ি ফিরে যাই।
কাল তো রবিবার! ভয় পাচ্ছেন কেন? অদ্যই শেষ রজনী। কাল তো আর গাড়ি থাকবে না! কলকাতার শনিবারের রাত দেখে নিন। কতদিন পরে আবার আপনার সঙ্গে দেখা হবে! আপনি আমার পিতার মতো, নেকস্ট টু মাই ফাদার!
তোমার কথায় আজ বড় বৈরাগ্যের সুর বাজছে। ব্যাপারটা কী বলো তো! তখন বললে পথের সন্ধান পেয়েছ, সমস্যার সমাধান করে ফেলেছ। খুলে বলো তো!
মাতুল চালককে বললেন, পার্ক স্ট্রিট চলল। তারপর পিতাকে বললেন, সহজ সমাধান। সিম্পল সলিউশন। ছবিটা যে-অবস্থায় আছে, সেই অবস্থাতেই পড়ে থাক। গাড়িটা বেচে দিয়েছি। সেই টাকায় ছোটখাটো দেনা শোধ। আমি একটা চাকরি পেয়েছি।
সে কী? চাকরি! দাসত্ব তোমার মেজাজে ধরবে না। তুমি রজোগুণী মানুষ!
চাকরিটা একটু অন্যরকম, তাই সাহস করে নিতে পেরেছি। টিসকোর একটা মিউজিক কলেজ আছে। সেই কলেজে প্রিন্সিপ্যালের চাকরি। মনে হয় দশটা-পাঁচটার ব্যাপার নয়। মাইনেও ভাল। যদি কিছু টাকা জমাতে পারি, যদি একজন ফাঁইনান্সার পাই, ছবিটা শেষ করব। যদি হিট করে, এক সপ্তাহে টাকা উঠে আসবে, তখন বাড়িটার মর্টগেজ ছাড়াব। গয়না উদ্ধার করব। এক মাস যদি রমরম করে চলে, মধুপুরের বাড়িটার সংস্কার করব, নতুন আর একটা ছবি করব।
