পিতা মেসোমশাইকে ছোটখাটো নানারকম পরামর্শ আর আশ্বাস দিতে লাগলেন। গিয়েই একটা পৌঁছোনো-সংবাদ পোস্ট করে দেবেন, ভুলবেন না। মেসোমশাই হ্যাঁ বলতে পারতেন, বললেন না। আইনের লোক বললেন, চিঠি লেখার অভ্যাস আমার তেমন নেই, ওই মেয়েকে বলব, সেই একটা পোস্ট করে দেবে।
পিতা বললেন, ওদিক থেকে আপনি চেষ্টা চালান, এদিক থেকে আমরাও চালাই। কনককে যেমন করেই হোক ট্রেস-আউট করতে হবে।
মেসোমশাই বললেন, আপনাদের কী-ই বা করার আছে!
মেসোমশাইয়ের জবাবে গা জ্বলে জ্বলে উঠছে, আচ্ছা ঠোঁটকাটা লোক তো! পিতা প্রসঙ্গ পালটে মাতুলের সঙ্গে কথা শুরু করলেন, তোমার গাড়িটা বেশ কমফর্টেবল্ হে! চলো, একদিন দূরে কোথাও ঘুরে আসা যাক!
তা হলে আজই চলুন। কাল আর এ গাড়ি থাকবে না। আজই আমার গাড়ি চাপার শেষ দিন। আজই আমাদের লাস্ট রাইট টোগেদার।
হঙ্ক হঙ্ক, হর্নের শব্দে মাতুলের কথা চাপা পড়ে গেল। শিস দিয়ে ট্রাম চলেছে।
১.৪৫ Lead us not into temptation
আটটা বেজে দু’মিনিটে ট্রেন ছাড়বে। এখনও সময় আছে। হুইলারের স্টলে দাঁড়িয়ে মাতুল ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছেন। চারপাশে লোকজন ছোটাছুটি করছে। আঁকা ঝকা ফজলি এসেছে। মালদা থেকে। প্ল্যাটফর্মে পড়ে আছে। নীল পোশাক পরা রেলের একজন কর্মচারী লম্বা একটা কাগজে পেনসিলের টিক মেরে চলেছেন। মাথায় বিরাট বিরাট বোঝা নিয়ে পোর্টাররা ছুটছে। পেছন পেছন তাল রেখে চলার চেষ্টা করছেন এক একটি পরিবার। এইসব কালা আদমিদের মাঝখানে, প্ল্যাটফর্ম আলো করে দাঁড়িয়ে আছেন এক সায়েব দম্পতি। সায়েবের বুকের কাছে ঝুলছে। ছোট্ট একটি ক্যামেরা। মুকু, মেসোমশাই আর পিতৃদেব দাঁড়িয়ে আছেন কিছু দূরে ঘড়ির তলায়। এই বিপুল ব্যস্ততার মাঝে মানুষ কিছুই আর ভাবতে পারে না। গতির চিন্তা ছাড়া আর কোনও চিন্তাই আসে না। এখানে এলেই মনে হয় যেতে হবে, যেতে হবে। বেরিয়ে পড়েছি, একটা কোথাও যেতে হবে।
মাতুল বললেন, এই দেখ আমার ছবি বেরিয়েছে।
একটি সিনেমা পত্রিকার পাতায় মাতুলের ছবি। পাশে আরও দু’-তিনজন দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন সুন্দরী চিত্রা দেবী। আর একজন মানুষ দু’জনের কাঁধের ফাঁক দিয়ে মুভুটা সামনে বের করে চোখ আর মুখের এমন একটা ভাব করেছেন, দেখলেই হাসি পায়। মাতুল বললেন, চিনিস না? এঁর নাম নবদ্বীপ হালদার।
চতুর্দিকে এঁর গলা শুনেছি। সময় সময় একটু ভালগার মনে হলেও, সেরা কমেডিয়ান। মাতুল আর একজনকে দেখিয়ে বললেন, এঁকে চিনিস?
আজ্ঞে না।
সেকী রে! ইনি হলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য।
মানুষটিকে ভাল করে একবার দেখার ইচ্ছে হল। গানে গানে পাগল করে রেখেছেন। আজ দুপুরেই শুনেছি বাঁকা ভুরু মাঝে আঁকা টিপখানি, আঁখি হিল্লোলে মরিমরি, কী ছাদে বেঁধেছ। কবরী। যেমন কণ্ঠ তেমনি আবেগ। আমাদের পাড়ায় বিশাল এক ফাংশনে এসেছিলেন। প্যান্ডেলে যারা ঢুকতে পারেননি, এইরকম কয়েক হাজার শ্রোতা দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে বসেছিলেন। শিল্পীর এমনই জনপ্রিয়তা, মাইকে যেই বললেন, আমার অনুরোধ, গান শোনার জিনিস, দেখার নয়, আপনারা শান্ত হয়ে বাইরে থেকেই শুনুন, অমনি সব গোলমাল থেমে গেল।
মাতুল কাগজটা কিনলেন। মুকুর জন্যে কিনলেন শার্লক হোমসের হাউন্ডস অফ বাস্কারভিল। মাতুলকে হঠাৎ কেনায় পেয়ে বসল। লজেন্স, চকোলেট, মুসাম্বি, চোখে যা পড়ছে সবই কিনছেন, শেষে একটা ব্যাগ কিনে সব ভরে ফেললেন।
বোঝার আয়তন দেখে মুকু কেমন যেন বিব্রত হয়ে পড়ল। বলা উচিত নয়, মেসোমশাই কৃপণ না হলেও বেশ হিসেবি। মেয়েকে কখনও কোনও উপহার কিনে দিয়েছেন বলে মনে হয় না। অথচ মানুষ উপহার পেতে ভালবাসে। মেয়েরা আরও বেশি।
পিতা বললেন, বেশ করেছ। এসব ব্যাপারে তোমার কোনও তুলনা হয় না। তোমার মনটা হল রাজপথের মতো।
ভসভস শব্দ করতে করতে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে লাগল। শুরু হয়ে গেল প্রাথমিক খণ্ডযুদ্ধ। আমাদের চিন্তা নেই, রিজার্ভেশন আছে। অবস্থা মোটামুটি আয়ত্তে আসতেই মেসোমশাই বললেন, এবার তা হলে এগোনো যাক। মিনিট দশেক আর সময় আছে।
কম্পার্টমেন্টের বাইরে নামের লিস্ট আর টিকিট নম্বর ঝুলছে। সেই দেখে মেসোমশাইদের স্থান খুঁজে নিতে অসুবিধে হল না। সহযাত্রীদেরও বেশ ভাল বলেই মনে হল। উলটো দিকের বার্থে স্বামী-স্ত্রী। চাকরি নিয়ে বিদেশে চলেছেন। স্বামীর চেয়ে স্ত্রীই বেশি চটপটে। তাদের মাথার ওপর একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। মেসোমশাইয়ের মাথার ওপর একজন যুবক। যেমন স্বাস্থ্যবান, তেমনি সুরূপ। চা বাগানের মালিক। কলকাতায় এসেছিলেন বন্দুকের কার্তুজ কিনতে, আর নতুন একটা গাড়ি বুক করতে। সঙ্গে এক পাঁজা ঝকঝকে ভাল ভাল বই সংস্কৃতির পরিচয় দিচ্ছে। মাতুলের সঙ্গে পরিচয় বেরিয়ে গেল। ছেলেটির মা আর মাতুল একই গুরুর কাছে সংগীত শিক্ষা করেছেন। ছেলেটি ভদ্রতা জানেন। পরিচয় বেরিয়ে পড়তেই মাতুলকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন।
চাকরেবাবুর স্ত্রী আড়ে আড়ে মাতুলকে দেখছিলেন। না দেখে উপায় নেই। এমন খাপ-খোলা তরোয়ালের মতো চেহারা সহজে চোখে পড়ে না। হিংসে করার মতো অভিজাত চেহারা। আমার মাতামহেরই কৃতিত্ব। রক্তের ধারায় গন্ধর্ব আর কিন্নরের বীজ ঘুরছে।
