মাতুল আমাকে দেখতে পাননি। ভাব কি ভাবনা জানি না, বিভোর হয়ে বসে ছিলেন। জানলার সামনে দাঁড়িয়ে মামা বলে ডাকতেই চমকে উঠলেন। মুহূর্তের বিস্ময় কেটে যেতেই মুখে খেলে গেল। সেই ছেলেমানুষি হাসি। মাতুলের মধ্যে একটি শিশু লুকিয়ে আছে। মাঝে মাঝেই ছুটে ছুটে বেরিয়ে আসতে চায়।
জিজ্ঞেস করলেন, চললি কোথায়?
একটা গাড়ি ডাকতে।
কেন গাড়ি কী হবে?
মেসোমশাইরা স্টেশনে যাবেন, আজ চলে যাচ্ছেন।
মাতুল দরজা খুলে দিয়ে বললেন, আয়, উঠে আয়। গাড়ি ডাকতে হবে না, আমি পৌঁছে দেব। আসনে বসতেই মাতুল বললেন, কীরকম সময়ে এসে পড়েছি বল? জাস্ট ইন টাইম।
বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই, জানলায় একটা মুখ উঁকি মেরে সরে গেল। মাতুল সিঁড়ি ভেঙে আগে আগে উঠছেন, আর হেঁকে হেঁকে বলছেন, গাড়ি আ গিয়া হুজুর।
গলা পেয়ে পিতা বেরিয়ে এসেছেন সিঁড়ির মুখে, আরে, জয় তুমি! আনএক্সপেক্টেড। এ যেন মেঘ না চাইতে জল।
মাতুল বললেন, তাই কি! আমার মনে হল, আপনি আমাকে ডাকছেন।
তুমি বুঝতে পেরেছিলে?
তা না হলে এলুম কেন?
বুঝলে, সেদিন তুমি চলে যাবার পর ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। আমি একটা রাস্তা খুঁজে পেয়েছি, মনে হয় তোমার খুব কাজে লাগবে।
আপনার আগেই কিন্তু আমি একটা রাস্তা খুঁজে পেয়েছি।
তাই নাকি, তাই নাকি?
পিতা ভীষণ উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন, ঠিক আছে পরে শোনা যাবে। আমি জানতুম, হেয়ার দেয়ার ইজ এ উইল দেয়ার ইজ এ ওয়ে। তা হলে চলল এঁদের আমরা পৌঁছে দিয়ে আসি। তোমার অসুবিধে হবে না তো!
কাল হলে অসুবিধে হত। আজ আর কী অসুবিধে!
মাতুলের এই কথার মধ্যে কীসের একটা ইঙ্গিত রয়েছে। পিতা তেমন খেয়াল করলেন না, আমার কানে কিন্তু লাগল।
সামান্যই জিনিসপত্র। হাতে হাতে উঠে গেল গাড়িতে। কাকিমা কোথা থেকে বিভিন্ন মাপের কৌটো জোগাড় করে গরম লুচি, আলুমরিচ, সন্দেশ, এমনকী একটা শিশিতে আচারও ভরেছেন।
মাতুল মুখ কাচুমাচু করে বললেন, আমার জন্যে যেন একটু থাকে বউদি, আমি ফিরে আসছি।
কাকিমার মুখটা মাঝে মাঝে কেমন যেন মেরী মাতার মতো হয়ে ওঠে। মুখচোখ সব কিছু চুঁইয়ে অদ্ভুত একটা স্নেহের ধারা নেমে আসে। এখন অত ভাবার সময় নেই, পরে ভাবা যাবে।
কাকিমা বললেন, আজ তো আমার রান্না দেবতার ভোগ হয়ে গেল, আপনি এলেন। সব রাখা আছে, ভালয় ভালয় ফিরে আসুন।
সব প্রস্তুত। সময় যেন হেঁকে বলছে, চলে এসো।
মুকু কোথায়! দেখো দেখো মেয়েটা আবার কোথায় গেল। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
মুকু দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণের নির্জন ঘরে। যে-ঘরে এতদিন তারা থেকে ছিল। রাতের পর রাত মুকুর সেই অনন্ত লেখাপড়া। মেসোমশাইয়ের পড়ানো। জীবন যে-ঘরে ছড়িয়ে ছিল এখন তা আবার গুটিয়ে গেছে। শূন্য ঘরে কণ্ঠস্বর এক ধরনের প্রতিধ্বনি তোলে।
মুকু বলে ডেকে নিজেই চমকে উঠলুম। নিজের গলা নিজের বলা নিজের কাছে ফিরে এলে যা হয়। মুকু দাঁড়িয়ে ছিল আমার মায়ের ছবির সামনে। অবাক কাণ্ড! ডাক শুনে চমকে নয়, ধীরে ফিরে তাকাল।
মুকু, এবার চলো, ট্রেনের সময় হয়ে যাবে।
হ্যাঁ যাই।
মুকু আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমার চোখের ওপর তার স্থির পরিষ্কার দৃষ্টি। ঠোঁট দু’বার কাপল, তিনবারের বার শব্দ বেরোল, আমি তা হলে যাই।
নিচু হয়ে প্রণাম করার চেষ্টা করছিল, হাতদুটো ধরে ফেললুম। প্রণাম নেবার একটা বয়েস আছে। যখন আর কিছু নেবার থাকে না মানুষ তখনই প্রণম্য হয়ে ওঠে। মুকুর হাত সেই যে ধরেছিলুম ছাড়লুম এসে সদরে। কাকিমা মুকুকে দু’হাতে বুকে চেপে ধরে চাটনি খাওয়ার শব্দ তুলে অমোচন করতে লাগলেন। পরস্পরের আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে দু’জনেই ফুলে ফুলে উঠছেন।
আর সময় নেই, এবার চলে এসো। কালের হুংকার।
দু’পা এগিয়ে এসে কাকিমা মুকুকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আঁচলে চোখ মুছতে লাগলেন। একে একে সবাই গাড়িতে উঠছেন। মেসোমশাই উঠতে উঠতে বললেন, আপনাদের ওপর যথেষ্ট উৎপাত করে গেলুম, ক্ষমা করবেন। গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বের করে কাকিমাকে বললেন, আসি তা হলে? বলার সময় মুখে এক ধরনের হাসি ফুটে উঠল। হাসির প্রলেপ মাখিয়ে মেসোমশাই বললেন, ভুলব না কোনওদিন।
কাকিমার মুখ দেখে মনে হল ভীষণ ভয় পেয়েছেন। কেউ কিছু ভুলতে চান, কেউ কিছু মনে করিয়ে দিতে চান, কারুর স্মৃতিতে আনন্দ, কারুর বিস্মৃতিতে আনন্দ। কী বিচিত্র এই পৃথিবী!
পেছনের আসনে পিতাকে বসাবার জন্যে মাতুল ঝুলোঝুলি করছেন।
পিতা বললেন, ভাবছি আমি আর যাব না, তোমরা তো রয়েইছ।
মাতুল বললেন, বাঃ, আপনাকে গাড়িতে একবার তুলব বলেই আমার আজ আসা।
তার মানে? সে আবার কী? হঠাৎ তোমার এমন উদ্ভট ইচ্ছে হল!
আজই যে শেষ দিন। অদ্যই শেষ রজনী।
কথা না বাড়িয়ে পিতৃদেব পেছনের আসনে বসলেন। মানুষের কথায় অনেক কিছু লুকিয়ে থাকে, গুটোনো টেপের মতো, দেখতে ছোট্ট এতটুকু, খুলতে শুরু করলে ফুটের পর ফুট কাহিনি বেরোতে থাকবে। সামনের আসনে আমি আর মাতুল বসলুম। গাড়ি ছেড়ে দিল। চাপা স্বরে সকলে বললেন, দুর্গা দুর্গা।
এতক্ষণের ছড়ানো ছত্রাকার জিনিস বেশ যেন গুছিয়ে উঠেছে। গাড়ির এই স্বল্পপরিসরে সব কাহিনি বেশ জমাট বেঁধে উঠেছে। যাওয়া আর থাকা দুটো দিকই গতিশীল, এর মাঝে মাতুল এক রহস্যের উপাদান। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালুম। আমাদের সদরে সাদা শাড়ি পরে কাকিমা তখনও পঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ মনে হল অত বড় একটা ভুতুড়ে বাড়িতে কাকিমাকে একা পাহারায় রেখে আসা কি ঠিক হল? যতক্ষণ আমরা না ফিরছি ততক্ষণ কী বিশ্রী লাগবে! একেবারে ফাঁকা। শুধু বিশাল এক গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ির পদচারণের শব্দ!
