তুমি ধরাবে কেন? কনক! মেয়েকে ডাকলেন।
দু’বোন কিছু দূরে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। কীভাবে কী করবে বুঝতেই পারছিল না। শূন্য বাড়ি। কোনও মহিলা নেই। প্রায় ধর্মশালার মতোই।
আসি, বলে কনক জানলার ধার থেকে সরে এল।
তুমি সব দেখেশুনে নাও। তোমাদের দু’বোনকেই সব করতে হবে বাপু। আসার পথে বাজার দেখে এলুম, আমি কিছু কেনাকাটা করে নিয়ে আসি।
সবই বাড়িতে আছে। আপনাকে আর বাজারে যেতে হবে না। ডিম আছে, তরিতরকারি আছে, চাল, ডাল সব আছে।
তা হলেও!
তা হলে আবার কী?
বেশ, যা আছে তাইতেই হোক। তোমার বাবা আসুন, তারপর যা-হয় হবে। কনক, তুমি ওদিক। সামলাও, মুকু, তুমি এদিকে সব খুলেটুলে ফেলো। আগে স্নান, তারপর কাপড়টাপড় ছেড়ে রান্না। সামান্য কিছু করলেই হবে। বেশি বাড়াবাড়ির প্রয়োজন নেই।
আমাদের রান্নাঘর আর এক মহলে। দুটি মহল বারান্দা দিয়ে জোড়া। বারান্দার বাঁক ঘুরতে ঘুরতে কনক বললে, বাঃ, তোমাদের বাড়ির এদিকটা তো ভারী সুন্দর। ওদিকটা শহর, এদিকটা গ্রাম।
আজ্ঞে হ্যাঁ, গাছপালা রয়েছে তো। একটু এগোলেই গঙ্গা।
আমাকে অত ভক্তি করে আজ্ঞে বলতে হবে না। আমি তোমার দিদি নই।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আবার সেই আজ্ঞে?
কী করি বলুন, কীরকম একটা অভ্যাস হয়ে গেছে।
আবার বলুন! আমার সঙ্গে খবরদার আপনি আজ্ঞে করবে না। নীচেটায় পাতকো বুঝি? বারান্দার ভাঙা রেলিং ধরে সামান্য ঝুঁকতেই আ-হা আহা করে হাতের ওপরদিকটা ধরে আমি টেনে নিলুম, ভাঙা, ভাঙা, পড়ে যেতে পারেন।
কোথায় ভাঙা?
এই যে রেলিং। সারা বাড়িটাই তো ভেঙেচুরে খলখলে।
একটু সারাওটারাও না কেন? এমন সুন্দর বাড়ি! কত বড় বলো তো।
টুকটাক সারাই বাবা নিজের হাতেই করেন। বিরাট ব্যাপার তো, একা ঠিক সামলাতে পারেন না। আর আমি তো একটা অপদার্থ।
তুমি কী করবে? মিস্ত্রি লাগালেই তো হয়!
বাবা বলেন, সেলফ হেলপ ইজ বেস্ট হেলপ।
পিতাঠাকুর রান্নাঘরটিকে সকালেই বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রেখে গেছেন। কথায় কথায় বলেন, এ হল পুরুষের কিচেন, মেয়েদের হেঁশেল নয়। আঁস্তাকুড় আর আঁতুড় এই হল বাঙালির দুই বৈশিষ্ট্য। রান্নাঘরের সামনে বারান্দা পুব দিকে কিছু প্রশস্ত। সেই অংশে গুছিয়ে রাখা কয়লা আর ঘুঁটে। ওই যে নীচের বাগানে পড়ে আছে কয়লার রঙে কালো একটি পাথর, পাশেই সদ্যোজাত সন্তানের মতো গড়াগড়ি যাচ্ছে একটি হামানদিস্তের হাতল। কয়লা আগে ওইখানে আসবে। ঘণ্টাখানেকের পরিশ্রমে টুকরো টুকরো হয়ে, ভারে ভারে ওপরে উঠবে।
কনক বললে, বাঃ ভারী পরিষ্কার তো! কে এমন সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে? তুমি?
না, ফাদার।
বাব্বাঃ, মেয়েছেলেও হার মেনে যাবে!
মনে মনে ভাবলুম মেয়েছেলে? মেয়েছেলে সম্পর্কে পিতার ধারণার কথা জানলে মেয়েছেলে হয়ে জন্মাবার সাধ চিরকালের মতো ঘুচে যাবে।
আমি তা হলে লেগে পড়ি, কী বলে?
শাড়ির আঁচল কোমরে জড়িয়ে কনক কয়লার গাদার সামনে উবু হয়ে বসল। শাড়িটা মনে হয় বেশ দামি। কয়লার গুঁড়োয় ময়লা হয়ে যাবার সম্ভাবনা। এ কার্যটি তো রোজ সকালে আমাকেই করতে হয়। আমিই কেন হাত লাগাই না! এর নামই বোধহয় দুর্বলতা! কোনও গুফো লোক যদি এই মুহূর্তে কয়লার গাদায় বসতেন আমার মন কি এমন আকুলি-বিকুলি করত!
সরুন, আমি উনুন সাজিয়ে আগুন ধরিয়ে দিই।
কেন?
শাড়িতে কালি লেগে যাবে যে!
বাঃ, লজ্জা তো বেশ কেটে এসেছে! জিভ তো আর তেমন জড়িয়ে যাচ্ছে না। কেমন মিঠি মিঠি বাত বেরোচ্ছে! এর নামই কি অ্যাটাচমেন্ট! পিতা যেমন মাঝেমধ্যে জগৎ-সংসারের দিকে তাকিয়ে হুংকার ছাড়েন, ছায়া, মায়া, কায়া।
কয়লা তোলার, নিয়ে যাবার অনেক সাজসরঞ্জাম আছে। পিতার উদ্ভাবন। হাত না ঠেকালেও চলে। যেমন মিনি বেলচা। ছোট বালতি। কয়লার গাদায় বেলচা চালাতেই এঁকেবেঁকে কিলিবিলি করে লাল মতো যে প্রাণীটি বেরিয়ে এল, সেটি একটি মধ্যম মাপের দাঁড়াটাড়াঅলা তেঁতুলে বিছে। গেঁটে গেঁটে শরীর।
মা গো, বলে কনক স্প্রিং-এর ইঁদুরের মতো লাফিয়ে সরে গেল। আমার তো তেমন সাহস নেই। ভিতুই বলা চলে। কনকের শরীরের আড়াল থেকে সেই রসহীন শুষ্ক প্রাণীটিকে একবার দেখে। নিলুম। চালচলন আমার মতোই উদ্দেশ্যহীন। নিতান্ত ভীরু ব্যক্তিও বাহবার লোভে বড় কাজ করে ফেলে। আমার উক্তি নয়, স্বামী বিবেকানন্দের। ভাগ্যিস পা দিয়ে ঘেঁতো করার চেষ্টা করিনি। বেলচা দিয়ে এক ঘা লাগাতেই তিনি কেতরে কেতরে আবার কয়লার গাদায় গিয়ে ঢুকলেন।
কনক বললে, এইবার কী হবে?
বীরের উক্তি, কী আবার হবে? পাশ থেকে কয়লা নিয়ে উনুন ধরাব।
যদি কামড়ায়?
ওষুধ আছে। কেরোসিন তেলে কয়লা ঘষে লাগিয়ে দোব। কিছুক্ষণ জ্বলবে, তারপর সব ঠান্ডা।
তোমাদের বাড়িতে আর কী কী আছে?
আর এক রকম বিছে আছে, তার নাম কঁকড়া বিছে। নীচের বাগানে গোটাকতক পোষা সাপ আছে। বড় বড় পাঞ্জামাপের মাকড়সা আছে। টনখানেক আরশোলা আছে। ইঁদুর আর ছুঁচোর অভাব নেই। সন্ধেবেলা বেশ বড় সাইজের একটা চামচিকি বেড়াতে আসে। মাঝরাতে চিলেকোঠায় বসে। ডাকে একজোড়া প্যাচা।
মহীশুরের টানাটানা চোখ, পাঞ্জাবের খাড়া নাক আর কুলু আপেলের রঙে রাঙানো গাল নিয়ে কনক অবাক হয়ে চেয়ে রইল। নাকের ডগায় ছাঁট-হিরে ঘাম।
১.০৪ Nothing begins and nothing ends
উনুনে আগুন পড়েছে। ধোঁয়া বের করার একটা কেরামতি আমার পিতাঠাকুরের উদ্ভাবনী মাথা থেকে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর, ডিসপোজালে এখানে-ওখানে নানারকমের জিনিস বিক্রি হত। সেই পড়তি মালের আড়ত থেকে হরেকরকমের জিনিস কেনার একটা নেশা চেপে গিয়েছিল বেশ কিছুদিন। অনেক কিছুই এসেছিল, কাজেও লেগেছিল। সবচেয়ে কাজে লেগেছে জাহাজের একটা চিমনি। ঠ্যালাগাড়িতে লোড হয়ে সেই বস্তু যখন পাড়ায় ঢুকল, হাতি দেখার মতো ভিড় জমে গেল। কী তার বাহার! কালোর ওপর লালের ডোরা। ঠ্যালায় চেপে চিমনি চলেছে, পেছন পেছন চলেছে একপাল কুচোকাঁচা। হইহই ব্যাপার।
