খেলার খেয়াল বশে কাগজের তরী
স্মৃতির খেলনা দিয়ে দিয়েছিনু ভরি
যদি ঘাটে গিয়ে ঠেকে প্রভাত বেলায়
তুলে নিয়ে তোমাদের প্রাণের খেলায়
মুকু ধরাধরা গলায় বললে, আমার একেবারেই যেতে ইচ্ছে করছে না।
আমি বললুম, সময় হয়ে এল, একটু আগে বেরোনোই ভাল।
মুকু আরও ধরাগলায় বললে, কাল তোমরা থাকবে, আমি থাকব না।
আমি বললুম, সব গোছগাছ হয়ে গেছে? কিছু পড়ে নেই তো? একবার ভাল করে সব দেখে নিয়েছ?
মুকু বললে, কতদিন লাগবে তোমাদের ভুলতে!
আমি বললুম, তোমরা এসেছিলে দু’জন, ফিরে যাচ্ছ একজন।
মুকুর গলায় এবার কান্নার শব্দ, দিদি রইল, পারো তো খুঁজে বের কোরো। যদি দেখা হয় বোলা মুকুকে যেন ভুল না বোঝে।
মুকু সারা ছাতটা একবার ঘুরে এল। ছাতে এলেই কনকের একটা নিজস্ব বসার জায়গা ছিল। ফুলগাছের টবের পাশে সেই বসার জায়গায়, মুকু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে, কারুর সমাধির সামনে মানুষ যেভাবে দাঁড়ায়।
মুকুর পাশে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বললুম, এবার চলল।
মুকু সামনে ঝুঁকে ছিল। দুটো হাত ছিল সামনে জোড়া হয়ে। কথা শুনে মুকু সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিশ্বাস নেবার চেষ্টায় শরীর টানটান হল। খুব মৃদু গলায় বললে, তুমি যদি আমাকে রাখতে পারতে পিন্টু! চিরকালের জন্যে এখানে যদি আমাকে রাখতে পারতে!
মুকু আমার কাঁধের ওপর ভেঙে পড়ল। আমার খুব অবাক লাগছে, এতদিন পরে বাড়ি ফিরছে, কোথায় আনন্দে মন যাই যাই করবে। পরবাস থেকে নিজবাসে ফিরে চলার আনন্দ নেই! তা হলে এ বেদনা কীসের? মুকু আমার কাঁধে মাথা রেখে বারেবারে বলতে লাগল, তুমি পারলে না, পারলে না, পারবে না, পারবে না।
কেমন যেন নেশাচ্ছন্নের মতো লাগছে! কে যে কখন কত আপন হয়ে যায়! মুকু দু’হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল, তুমি তুমি তুমি তুমি!
আমি দাঁড়িয়ে আছি বেওকুফের মতো। যে-কোনও কথাই এই আবেগের কাছে বড় খেলো হয়ে যাবে। এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে মানুষের মনের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ভাবপ্রকাশ কথায় সম্ভব হয় না, চোখের জলে হয়তো কিছুটা হয়, ঠোঁটের হাসিতে হয়তো হয়, চোখের দৃষ্টিতেও হতে পারে। শব্দ শব্দের সীমা ছাড়াতে পারে না। যে-আর্তনাদ মুখে ফোটে না, সে আর্তনাদ বুকে দাগ কেটে বসে। যে-জল সমুদ্রে পথ পায় না সে জল শুষে নেয় মাটি। সিনে কা দাগ হৈ বহ নালা কা লব তক নগয়া/খাক কা রিজক হৈ বহ কতরা জো দরিয়া ন হুআ ॥
বিদায় ছাত বলে নীচে নামার মুখে সিঁড়িতে কাকিমার সঙ্গে দেখা হল, তোমাদের ডাকতে যাচ্ছিলুম। ওঁরা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
কাকিমা অবাক হয়ে মুকুর দিকে তাকাচ্ছেন। আমাদের চেয়ে মুকু যেন বেশি বিচলিত হয়ে পড়েছে। চাপা স্বভাবের মানুষের এই এক সমস্যা। প্রথমে কেউ তাদের চিনতে পারে না, ধরতে পারে না, যখন পারে তখন সে চলে যায় ধরার বাইরে।
এতক্ষণ ছাতে ছিলুম। সোনার বরণ আকাশ থেকে আঁধার আকাশ হয়ে তারার আলো গায়ে মেখে নীচে নেমে এসে বিদ্যুতের আলো কেমন যেন অস্বাভাবিক হলুদ হলুদ লাগছে। মনে হচ্ছে সব ন্যাবা হয়েছে। বড়ঘরে কাকিমা দুটি আসন পেতেছেন। মুকু আর মেসোমশাই খেয়ে যাবেন। এ বাড়িতে তাঁদের শেষ আহার। কাকিমার যেন কোনও ক্লান্তি নেই। দুপুরে কম ছুটোছুটি হয়েছে!
সেই নোংরা রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে চোরের মতো আমরা আবার সেই শাড়ির দোকানে ফিরে এসেছিলুম। দোকানের সেলসম্যান প্রশ্ন করেছিলেন, তখন কী হয়েছিল বলুন তো! অমন করে পালালেন কেন?
রেস্তোরাঁয় বসে বসে উত্তর একটা কাকিমার জন্যে তৈরিই করে ফেলেছিলুম, তারই একটা অংশ কাজে লেগে গেল। বললুম, একজন চেনা ভদ্রলোককে দেখে পালাতে হয়েছিল।
সেলসম্যানের চোখেমুখে কেমন যেন একটা সন্দেহের ছায়া ঘনিয়ে এসেছিল। কাকিমার মুখের দিকে বারেবারে তাকাতে লাগলেন। জানি কী ভাবছিলেন। অবৈধ প্রণয়-ট্রনয়ের কথা নিশ্চয়ই। মন এমন জিনিস! সেই মুহূর্তে কেন জানি না নিজেকে বেশ ভাবুক ভাবুক লাগছিল। কাকিমাকে গল্পটা অবশ্য বেশ গুছিয়ে বলতে পেরেছিলুম। অফিসে শরীর খারাপ বলে ছুটি নিতে হবে তো, তাই অফিসের চেনা লোক দেখে অমন দুদ্দাড় করে পালিয়েছিলুম। গল্পে অবশ্য অনেক ফঁক ছিল। কাকিমা যদি প্রশ্ন করতেন, উনিও কি ছুটিতে আছেন। তা হলে আবার আমাকে আর একটা কিছু ভাবতে হত।
কাকিমা বললেন, তুমি আর বটঠাকুরও কিছু খেয়ে নাও, আসতে রাত হবে তো!
আমরা কত বেলায় খেয়েছি, আপনার খিদে পেয়েছে?
আমার ক্রমশই পেট ফুলছে।
তা হলে? আপনি বরং বাবাকে কিছু খেতে দিন।
উনি খাবার কথা শুনলে বিরক্ত হন।
তা হলে থাক।
দু’জনে প্রথমতো আহারে বসলেন। মেসোমশাই যদিও দু’-একখানা খেলেন, মুকু স্রেফ খেলা করে গেল। কাকিমা অবশ্য করেছিলেন অনেকরকম। নানা ধরনের লোভনীয় পদ। এই অল্প সময়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় আর কাউকে না পারুন আমাকে চমকে দিয়েছেন।
পিতা ঘড়ি দেখলেন। আমাকে বললেন, যাও এবার বেরিয়ে পড়ো, একটা গাড়ি ডেকে নিয়ে এসো।
কিছুদূর গিয়েই দেখি উলটো দিক থেকে একটা গাড়ি আসছে। রংটা বেশ চেনাচেনা। সামনে একটা ঠ্যালা পড়ায় গাড়িটা আস্তে আস্তে আসছে। পেছনের আসনে মাতুল বসে আছেন। সেই পরিচিত ভঙ্গি, গালের ওপর একটি আঙুল। দোকানের আলোয় অনামিকার আংটির পাথর জ্বলছে। শুনেছি পাথরটা হিরে।
