রেস্তোরাঁর খুপরি ঘরে দু’জনে বসতেই, হাফপ্যান্ট পরা একটা ছেলে এসে ময়লা পরদাটা টেনে দিয়ে গেল। একবার ভাবলুম বলি, না, ভোলা থাক, তারপর মনে হল একটু আবরু থাকা ভাল। তেলতেলে মোটা কাঁচের গেলাসে দু’গেলাস জল দিয়ে গেল। গেলাসটা দুহাতে ধরে কাকিমা জিজ্ঞেস করলেন, কী হল বলল তো?
কী বলি? কীভাবে বলি! একটু ইতস্তত ভাব। বিশ্বাসযোগ্য একটা গল্প বানাতে হবে। বয় এসে ধমকের গলায় জিজ্ঞেস করলে, কী খাবেন?
কী আছে?
ছেলেটি চোখ বুজিয়ে পাখিপড়ার মতো বলতে লাগল, মোগলাই, ফিশ চপ, ফিশ ফ্রাই, কবিরাজি, মটন কারি, কষা, কোরমা, মটন কাটলেট, প্রন কাটলেট, ডেভিল..।
গড়গড়িয়ে আরও কতদূরে চলে যেত কে জানে? থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, কেক আছে। ভাই?
প্যাস্ট্রি আছে।
দুটো ওই আর দুকাপ চা।
ছেলেটি ক্ষুণ্ণ হয়ে বললে, আর কিছু না!
১.৪৪ খেলার খেয়াল বশে কাগজের তরী
পশ্চিম আকাশ কাঁচের মতো লাল হয়ে উঠেছে। সূর্য অস্ত গেল এই কিছুক্ষণ আগে। একঝাক পাখি মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল পশ্চিম আকাশের দিকে। যত দূরে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে কে যেন একরাশ খুঁটি খেলার দানের মতো আকাশের দিকে চেলে দিয়েছে। পাখি কেন সবসময় আলোর দিকে উড়ে যায়! সূর্যকে কি অনুসরণ করা যায়। পশ্চিম আকাশের অদ্ভুত ওই সোনালি আলো একটু পরেই নিবে যাবে। এ আকাশে রাত নামল, ও আকাশে ভোর। না, অত দর্শন ভাল নয়!
নীচে থাকতে না পেরে ওপরে চলে এসেছি। মুকুরা প্রায় তৈরি হয়ে গেছে। একটু পরেই গাড়ি নিয়ে আসব, ছুটবে স্টেশনের দিকে। সারাবাড়িতে এখানে-ওখানে যা কিছু ছড়ানো ছিল সব ভরে ফেলেছে বাক্সে। আমাদের যেসব জিনিস ছিল, যেগুলো লেগেছিল ওদের ব্যবহারে, সেসব জিনিস ফিরিয়ে দিয়ে গেল। কুলুঙ্গিতে আয়না ছিল, চিরুনি ছিল, একটা বুরুশ ছিল, চুলবাঁধা ফিতে ছিল, পাউডারের কৌটো, মেসোমশাইয়ের শেভিংসেট ছিল। সব অদৃশ্য হয়েছে, পড়ে আছে নিঃসঙ্গ ব্রাশ। কেমন যেন লাগে। কাঁদতে ইচ্ছে করে। একটু আগেও তারে সার সার কাপড় ঝুলছিল। সব যেন ভোজবাজি হয়ে গেছে, হাওয়ায় উড়ছে সাদা একটা গামছা।
মানুষের জীবন কিছুতেই পূর্ণ হতে চায় না, কেবলই শূন্য হয়ে যায়!
এই ছাতে কত কী ঘটে গেল। কত রাতে আমি আর কনক পাশাপাশি বসে থেকেছি। ক্ষয়া চাঁদ দেখেছি, পূর্ণ চাঁদ দেখেছি। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়েছে। কনকের শাড়ির আঁচলে দু’জনে একসঙ্গে মাথা ঢেকেছি। তখন মনে হয়েছিল, এইসব মুহূর্ত বুঝি রাজার মাথার উষ্ণীষের হিরা, চুনি, পান্নার মতো, যতদিন বাঁচব ততদিনই মাথায় থেকে যাবে। কোথায় কী! মালা ছিঁড়ে মানিক পড়ে গেল কালের স্রোতে। ভাসতে ভাসতে চলে গেল। দূর থেকে দূরে! আর ফিরবে না। স্মৃতি ক্ষীণ থেকে। ক্ষীণতর হবে। নতুন স্মৃতির পলি পড়বে। কোনও একদিন যক্ষের মতো কোনও এক নির্জন ঘরে সিন্দুকের ডালা খুলব। কাঁচ করে শব্দ হবে। ভেতরে দেখব থরে থরে সাজানো আমার জীবনের মৃতঝরা মুহূর্ত। মাকড়সার ঝুলে ঢাকা, ধূসর। তখন আমি বৃদ্ধ; হাত কাঁপছে, পা কাঁপছে। চুল সাদা। চোখদুটো মৃত মাছের মতো। এই তো মানুষের জীবন, মানুষের নিয়তি! এই পথেই সকলকে চলতে হবে। বর্তমানের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে না পারলে, অতীত বড় কষ্ট দেয়। সোনার হরিণ সামনে ছেড়ে পেছন পেছন ছুটে চলল। রোজই দাও নতুন নেশা।
প্রতি পদক্ষেপে গন্তব্যের সুদূরতা আমার কাছে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে, আমার চলাকে পেছনে ফেলে জনশূন্য বনভূমি এগিয়ে চলে আরও জোরে।
দুঃখের দিনে গালিবকে বড় ভাল লাগে, হর কদম দূরী-এ মনজিল হৈ নুমায়া মুঝসে;/মেরি রফতার-সে ভাগে হৈ বয়াবা মুঝসে ।
শেষের ক’টা দিন মুকুও এই ছাতে এসেছে। আলসেতে বসেছে। কত কথা হয়েছে। জীবনকথা। রাত বেড়ে গেছে। পেটা ঘড়ি বেজেছে। মাঝরাতে অদ্ভুত একটা ভৌতিক বাতাস ওঠে, প্রকৃতি ছমছম করতে থাকে। দু’হাত দূরে বসে থাকা মুকুকে কেমন যেন রহস্যময় মনে হতে থাকে। মধ্যরাতে মানুষ কেমন যেন জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে। এই ছাদে আমি কাল আসব, পরশু আসব, তার পরের দিন আসব, আসব একা, পাশে কেউ থাকবে না। যত দিন যাবে স্মৃতি ততই পুরনো হতে থাকবে। কালের হাত ধরে এরা অদৃশ্য হয়ে যাবে। সমুদ্রে জাহাজ যেমন হারিয়ে যেতে থাকে। সব শেষ মাস্তুলের ডগাটিও চলে যায় দৃষ্টিপথের বাইরে। সমুদ্র পড়ে থাকে ঢেউ নিয়ে, ফেনরাশি নিয়ে। মানুষের তিনটি অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী, আকাশ বাতাস আর শূন্যতা। এই তিনটিকে কেউ কখনও কেড়ে নিতে পারবে না।
আকাশের সোনালি আগুন নিবে গেছে। গোলাপি পেখম মেলে রাত উড়ে আসছে। বন্ধু কাঁদতে দাও, শোনো, তিরস্কার কোরো না, হৃদয়ের দুঃখভার কখনও তো খালি করতে হবে! রোনে সে ওই নাদিম সলামত ন কর মুঝে। আখির কভি তো অকদএ দিল বা করে কোই।
খসখস শব্দে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখি মুকু দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল ছাত এপাশ থেকে ওপাশে চলে গেছে। পশ্চিমে গাছগাছালি ভরা বিশাল এক ভূখণ্ড ক্রমশ ঢালু হতে হতে নেমে গেছে গঙ্গার কুলে। দূরে অন্ধকার আকাশ ফুঁড়ে উঠে গেছে মন্দিরের ত্রিশূল। গাছের মাথায় মাথায় অন্ধকার নেমে আসছে ডানা-মোড়া পাখির মতো। উনুনের ধোয়া কিছু দূর উঠেই বাতাসে থমকে গেছে।
মুকু আমার দিকে দু’পা এগিয়ে আসতেই চার পাশে সন্ধ্যার শাঁখ বেজে উঠল। দিন ঘুমিয়ে পড়ল রাতের কোলে। মুকু কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। শরতের একখণ্ড মেঘ থেকে চাপা একটা আলো এসে পড়েছে মুখে। চোখদুটো যেভাবে চকচক করছে, তাতে মনে হচ্ছে সামান্য জল এসেছে। মুকু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কোনও কথা নেই মুখে। অনেক সময় না বলা কথা বলা কথার চেয়ে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষের এমন অনেক ভাব আছে যা কথা দিয়ে স্পর্শ করা যায় না। ভোরের মতো সন্ধ্যার অস্বচ্ছ আলোয় উন্মুক্ত এই ছাদে মুকুর শেষবারের মতো দাঁড়ানো। মুহূর্তের নদীতে একই জলে মানুষ দু’বার স্নান করতে পারে না। মুকু কী বলছে আমি জানি,
