কাউন্টারে একের পর এক শাড়ি নামছে। কচি কলাপাতার রং, নীল, আরও নীল, কমলা, লাল। একটু দেখতে শুনতে ভাল কোনও মহিলা কাউন্টারে এসে শাড়ি দেখতে চাইলে দোকানদারের উৎসাহ বেড়ে যায়। পাশ থেকে শাড়ি বেরোয়, মাথার ওপর থেকে শাড়ি নামে। তিন-চারজন চার পাশ থেকে ব্রহ্মাস্ত্রের মতো শাড়ি ছুঁড়তে থাকেন। কাকিমার নীলের ওপর একটা দুর্বলতা আছে। একটা নীল হাতে তুলে নিতেই বিক্রেতা বললেন, নীল তো পরেই আছেন, একখানা চাপাফুল নিন না, জমিটা খুব ভাল।
কাকিমা আড়চোখে আমার দিকে তাকালেন। কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললুম, আপনারও একটা হবে। বলেই মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল। ঠিক যেন সমুদ্রের বালিতে বাড়ি তৈরির চেষ্টা। গোটাকতক ঢেউয়ে সব চুরমার।
কাকিমা বললেন, আর দু’-একটা দোকান দেখা যাক। সেলসম্যান হতাশ হয়ে বললেন, এত দেখালুম, তাও পছন্দ হল না!
এইবার মহামায়া থেকে যোগমায়া। আরও বড় দোকান। অনেক বেশি আলো, অনেক বেশি খদ্দের।
কাকিমা দোকান দেখে খুব খুশি হয়ে বললেন, কিনতে হলে বড় দোকান থেকে কিনব, ভাল দোকান থেকে কিনব। জানো তো, আমার মামাশ্বশুরের বিশাল বড় কাপড়ের দোকান ছিল। বিয়ের পর থেকে কাপড়ের কথা শুনতে শুনতে, কাপড় চিনতেও শিখে গেছি।
কাকিমা আজ রাজরানির মতো হয়ে গেছেন। চেহারায়, চলনে বলনে। দুঃখের পরিবেশ ছেড়ে বেরোতে পারলেই মানুষ সুখী হয়ে ওঠে। সুখ কোথায় আছে কীসে আছে কারুর সঠিক জানা নেই। অনেকটা চোরকাটার মতো। ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, হঠাৎ একসময় নীচের দিকে তাকাতেই অবাক। কাপড়ে ফিনকি ফিনকি রাশি রাশি আটকে আছে। আজ যেসব সুখের মুহূর্ত দিয়ে জীবন চলেছে, একটু পরেই চলে যাবে বহু দূরে। রেলগাড়ি যেমন ব্রিজ বা টানেল পেরিয়ে চলে যায় রাতের অন্ধকারে। মাইলের পর মাইল সামনে পড়ে থাকে বৈচিত্র্যহীন দু’সার অনুভূতিহীন লৌহপথ। কেন জানি না, আজ বড় একঘেয়ে জীবন-ভাবনা আসছে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধের মতো। জীবন যদি ব্লটিং পেপারের মতো এক ফোঁটা সুখের মুহূর্তকে ধরে অনেকটা বড় করে দিতে পারত, তা হলে বেশ হত।
দুমদাম কাপড় নেমে এল কাউন্টারে। ঝলমলে রঙের বাহার। চোখে জীবনের নেশা লেগে যাচ্ছে। শাড়ির সঙ্গে সঙ্গে শরীর দেখতে পাচ্ছি। শরীরের ভেতর মন দেখতে পাচ্ছি। মায়ার বন্ধন দেখতে পাচ্ছি, যেবাঁধনে জগৎসংসার ধুকছে, ফুঁসছে, ছিঁড়ছে, জোড়া লাগছে। শাড়ির রঙিন জমিতে স্বপ্ন হাঁটছে। আমি হাঁটছি, আমার পাশে মুকু হাঁটছে। সুখের হাত মেলানোয় কোনও তৃপ্তি নেই। দুঃখের সঙ্গে সুখ মিলে যখন দুঃখের চোখের জল মুছে গিয়ে মুখে হাসি ফোটে তখন মন যেন কানায় কানায় ভরে ওঠে। দেহ কিছু নয়, অভ্যাসে বাঁচাটা বাঁচা নয়। মনের সঙ্গে মন মিলে গেলে পৃথিবীটাই স্বর্গ হয়ে ওঠে!
কাকিমা শাড়ি পছন্দ করে ফেলেছেন। আমি বললুম, এবার আপনারটা। রং আমি পছন্দ করি, জমি পছন্দ করুন আপনি।
এই প্রস্তাবের পেছনে আমার একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল। খুব চড়া নয়, হালকা কোনও একটা রং বেছে নেব। বলা যায় না, যদি রঙিন শাড়ি পরা বন্ধ হয়ে যায় তা হলেও যেন পরতে পারেন। সেলসম্যান বলছেন, দিদির আমার পছন্দ আছে। সেরা শাড়িটাই বেছেছেন।
কাকিমার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। যেন হোমের আগুন লেগেছে মুখে।
আমি বললুম, এইবার দু-একটা হালকা রং দেখাবেন?
দেখাতে বলে যেই পেছন দিকে মুখ ঘুরিয়েছি, ভয়ে কণ্ঠতালু শুকিয়ে গেল। এতক্ষণ সুখের যে বুদবুদটি ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল, একটি পিনের খোঁচায় যেন নিমেষে ফেটে গেল। সেই অদ্ভুত চেহারার অষ্টাবক্র লোকটি, যে আমাকে গল্প শুনিয়ে হাতঘড়িটা নিয়ে সরে পড়েছিল, কোণের কাউন্টারে পাজামা কিনছে ঝুল মেপে মেপে। পাশে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অশ্লীল একজন মহিলা। দেখলেই মনে হয়, মহিলা দেহে বেঁচে আছেন, মনে নয়।
লোকটির সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়েছে। চোখ সরিয়ে নিলেও দেখতে পাচ্ছি, সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এখুনি আক্রমণ করবে। পাঁচ মারবে? এবার ধরে ফেলবে দু’জনকে একসঙ্গে। সেভাবে না তাকালেও আমি দেখতে পাচ্ছি, লোকটি হাসছে। চোখদুটো হয়ে উঠেছে। শিকারি বেড়ালের মতো। পাজামা ফেলে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
আমি কাকিমার ডান হাত মুঠোয় চেপে ধরলুম। কাকিমা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকালেন। মুখের চেহারা দেখে ভয় পেয়েছেন। জিজ্ঞেস করলেন, কী হল? কী হল তোমার!
আর সময় নেই। কাকিমার হাত ধরে টেনে নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে চলে এলুম দোকানের বাইরে। পায়ে পায়ে জড়িয়ে পড়ে যাবার মতো হচ্ছিল। কোনওক্রমে সামলে নিলুম। পেছন থেকে সেলসম্যান চিৎকার করছেন, কী হল দাদা, শাড়ি! শাড়ি নেবেন না!
লোকটি দোকানের মাঝখানে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। দেখেছি আমি।
ভিড়ে গা মিলিয়ে মিশে গিয়ে কাকিমাকে হাত ধরে টানতে টানতে, ছোটাতে ছোটাতে, ট্রাম ডিপোর পাশ দিয়ে আর একটা রাস্তায় পড়লুম। লোক চলাচল কম। জনারণ্যে মিশে হারিয়ে যেতে হবে। বুঝতে না পেরে কাকিমা নানারকম প্রশ্ন করে চলেছেন। আমার জবাব দেবার অবসর নেই। এ রাস্তা ও রাস্তা করে একসময় মনে হল অনেক দূরে চলে এসেছি। আর ধরতে পারবে না, তবু সাবধানের মার নেই। সামনেই বিশ্রী চেহারার এক রেস্তোরাঁ। কলেজের ছেলেমেয়েদের প্রেম করার জন্যে পরদা-ফেলা ছোট ছোট খুপরি। একটু গা-ঢাকা দিয়ে বসে থাকা উচিত। বিশ্রামের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কাকিমা হাঁপাচ্ছেন।
