কী ত্যাগ?
সে ত্যাগের কোনও তুলনা নেই। সাধারণ মানুষ যা পারে না। তোমার মেসোমশাই যা কোনওদিন পারবেন না। সেই ত্যাগ বোঝার বয়েস তোমার হয়নি। মানুষ যার জন্যে পাগলপাগল। দিন নেই, রাত নেই, ছটফট ছটফট করছে।
একটু একটু বুঝেছি।
কাকিমা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। হুহু করে বয়ে আসছে দুপুরের গরম বাতাস। কানের পাশের চুল উড়ছে। ফেরানো মুখের ওপর আলোর আভা খেলছে। বড় বড় চোখের পাতা স্থির, নিশ্চল। কপাল আর নাকের অংশ প্রোফাইলে ধরা পড়েছে। নাকছাবির পাথর ঝিলিক মেরে উঠছে মাঝে মাঝে।
এমন একজন মহিলাকে যেচে স্বামীর মৃত্যুসংবাদ দিয়ে বৈধব্যের দিকে ঠেলে দেওয়া যায়! রঙিন একটা জগৎ থেকে স্নান বিমর্ষ এক জগতে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া!
কেন হারাবার লাগি এতখানি পাওয়া।
জানি না, এ আজিকার মুছে ফেলা ছবি
আবার নতুন রঙে আঁকিবে কি তুমি, শিল্পীকবি।
জীবন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলে তা কি আর জোড়া লাগে! যা আছে, যদ্দিন আছে, যেমন আছে সেইরকমই থাক। দেখাই যাক না কী হয়! তারপর না হয় প্রশ্ন করা যাবে, কেন মরে গেল নদী/আমি বাঁধ বাঁধি তারে চাহি ধরিবারে পাইবারে নিরবধি/তাই মরে গেল নদী ॥ গাড়ি হুহু করে ছুটছে। মাইলের পর মাইল পথ গিলে ফেলছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে এই চলা কখনও যদি শেষ না হত।
অনেক দূরে কোথাও কোনও শিমুল গাছে তুলোর বীজ ফাটলে, একটা-দুটো পলাতক বীজ পাখা মেলে উড়তে উড়তে জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকে বাতাসে ভাসতে থাকে। হঠাৎ কোথা থেকে অদ্ভুত একটা উড়ো চিন্তা মনের ঘরে ভেসে এল। বিলেতে একজন পুরুষ অথবা নারী বহুবার বিবাহ করতে পারে। সারাজীবন একই স্বামী বা একই স্ত্রীকে নিয়ে ঘর করতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। না পোষালেই বিবাহবিচ্ছেদ। বিপত্নীক কিংবা বিধবা হলেও আবার সংসার পাতারও কোনও বাধা নেই। তা হলে!
ছি ছি, এ আমি কী ভাবছি! মনের কোন স্তর থেকে আমার এই ভাবনার উদয়? কিছু বাজে বই। পড়ে কি আমি অসম্ভব রকমের ভেঁপো হয়ে গেলুম! কেন পড়তে গেলুম লরেন্সের ম্যানিফেস্টো’
…another hunger
Very deep, and revening…
redder than death, more clamorous,
The hunger for the woman…
চিন্তাটাকে যতই চেপে রাখতে চাইছি, ততই যেন ঠেলে ঠেলে উঠছে। যা ভাবছি, তা যদি ঘটে যায়, আমি মনে মনে ভীষণ সুখী হব। এমন একটা আলয় পেয়ে যাব, স্নেহের আলয়, যা দেহবোধে কলুষিত নয়! এ দেশের রক্ষণশীল মানুষের সে সাহসই হবে না। চরিত্র বড় আদরের বস্তু, সমমানের বস্তু। বস্তুটা আসলে কী তা জানা নেই। যদি এমন হত, আহারে চরিত্র নষ্ট হয়, তা হলে বহু মানুষ অনাহারে মারা পড়ে প্রমাণ করে যেতেন, তিনি চরিত্রবান। হিন্দু রমণীর আদর্শ সামনে রেখে কাকিমা বলবেন, ছি ছি, তা হয় না, তা হয় না। জীবন এক ধরনের লটারি। মারার সুযোগ একবারই পাবে। লেগে যায় ভাল, নয়তো দান আর বাজির টাকা দুটোই তামাদি হয়ে গেল। কাকিমাকে গ্রহণের কথা বললে তিনি আমাকে নির্ঘাত জুতোপেটা করবেন। অথচ কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে পরিষ্কার বিধান দিয়ে গেছেন, স্বামী যদি নীচ চরিত্রের হন, যদি প্রবাসী হয়ে থাকেন, রাজদ্রোহের অপরাধে অপরাধী হন, খুনি হন, তিনি যদি কোনও কারণে পতিত হয়ে থাকেন, কিংবা ক্লীব, সন্তান উৎপাদনে অক্ষম, তা হলে স্ত্রী অমন স্বামীকে ত্যাগ করতে পারেন। বিধবা বিবাহ চালু করতে গিয়ে বিদ্যাসাগরের মতো রিফর্মার হিমশিম খেয়ে গিয়েছিলেন। তাও কি ঠিকমতো চালু হয়েছে! করা যায়। কিন্তু ক’জন করেন? করলেও সমাজ আওয়াজ দেয়। কেমন একটা ব্যভিচারের ইঙ্গিতে সকলে আধ-বোজা চোখে তাকাতে থাকে।
থাক, ঘটক হয়ে আর দরকার নেই। ভাবনার রাশ টেনে রাখো। কেউ শুনলে বলবে, ছোকরার জ্ঞানের বদহজম হয়েছে। তবু মনে হয়, আমাদের বগাহীন সংসারে বগা ধরার ক্ষমতা, আমার পাশে কোলের ওপর আলতো পড়ে থাকা ওই দুটি হাতের ছিল। যে-হাতে অনধিকারীর মতো এখনও একজোড়া শাখা প্রাণদণ্ডের প্রহর গুনছে।
কাকিমা হঠাৎ আমার দিকে ফিরে তাকালেন।
মেয়েছেলে হয়ে জন্মাসনি খুব বেঁচে গেছিস! আমাদের জীবন বর্ণপরিচয়ের প্রথম দুটো অক্ষরে পড়ে আছে।
তার মানে?
অ, আর আ। অ-এ অজগর আসছে তেড়ে, আ-এ আমটি খাব পেড়ে।
কাকিমা হাসতে লাগলেন, আর আমি ভাবতে লাগলুম কথাটা অনেক অংশেই নির্ভুল। খুব ন্যায়ের কথা হচ্ছে, নীতির কথা হচ্ছে, সাহিত্য হচ্ছে, সংগীত হচ্ছে, হতে হতে শেষ কথা, চলো, তা হলে এবার একটু শোওয়া যাক। শুদ্রকের মৃচ্ছকটিকের গোটাকতক লাইন মনে পড়ছে, প্রমোদিনীরা সবসময় যুবকের সঙ্গী হবে। পথের পাশের লতানে গাছের মতো, সকলেরই তার ওপর সাধারণ অধিকার থাকবে। তোমার শরীর হল পণ্য, স্বর্ণের বিনিময়ে বিকিয়ে যাও। এখনকার কালে স্বর্ণ শব্দটি কেটে দাও, তার বদলে লেখো, অন্ন আর বস্ত্র।
আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। পাশাপাশি সার সার দোকান এ মাথা থেকে ও মাথায় চলে গেছে। যোগমায়া বস্ত্রালয়, মহামায়া বস্ত্রালয়। সবই মায়ার খেলা। বাইরের আলোয় কাকিমাকে এর আগে এত ভাল করে দেখিনি। গাঢ় নীল রঙের শাড়ি। সাদা ব্লাউজ। গায়ের রং ফরসা আর স্বাস্থ্য ভাল হলে মেয়েদের গালে অদ্ভুত একটা গোলাপি আভা খেলে। ঈশ্বর এক জীব সৃষ্টি করেছিলেন বটে, যার সবটাই নরম। মন নরম, দেহ নরম, পাউরুটির ভেতরের অংশটির মতো।
