কাকিমারও নিজস্ব একটা জগৎ আছে। যেই জানবেন এখানকার পাট শেষ হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফিরে যেতে চাইবেন তার নিজস্ব ব্যবস্থায়। নিরালম্ব মানুষ বাঁচতে পারে না, বিশেষত মেয়েরা। মেয়েরা বাঁচতে চায় দাবি নিয়ে, যে-কোনও একটা সম্পর্ক নিয়ে। বলতে খারাপ লাগছে, কোনও কোনও মহিলা কারুর রক্ষিতা হয়েও বেশ দাপটে বেঁচে থাকেন। আমাদের পাড়ার ললিতবাবু! তার। একজন রক্ষিতা ছিলেন। বাবু মারা গেছেন। তার সম্পত্তিতে মহিলা এখনও কেমন দাপটে বেঁচে আছেন! দান-ধ্যান, পূজাপার্বণ। রাধাগোবিন্দর মন্দির সংস্কার করিয়ে দিয়েছেন। সেখানে পাথরের ফলকে উৎকীর্ণ নাম জ্বলজ্বল করছে। বছরে একবার বাড়িতে বিশাল ভোজ হয়। সকলকেই তো পাতা পেড়ে খেতে দেখি। নিন্দনীয় সম্পর্ককে মেনে নেবার উদারতা সমাজের এসেছে। কাকিমা কী সম্পর্কের জোরে এখানে থাকবেন! যে-জমির ওপর মালিকানা নেই, সে জমির ওপর কেউ ইমারত বানায় না। ভালবাসার ভিত কোথায়! বাতাসের মতো। শ্বাসপ্রশ্বাস নিলেও মূল্য বোঝা যায় না। কারুর আশ্রিতা হয়ে, কারুর দয়ায় বেঁচে থাকার পাত্রী কাকিমা নন।
বেরোবার সময় মুকু জিজ্ঞেস করলে, দু’জনে সেজেগুঁজে চললে কোথায়?
ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই ফিরে আসছি। তুমি বাড়ি পাহারা দাও।
কোথায় চললে বলবে তো?
ফুল কিনতে।
ফুল? ফুল কী হবে?
তোমার গলায় পরাব মালা করে।
হঠাৎ মুখ ফসকে এমন একটা অশালীন কথা বেরিয়ে গেল। প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে ভেবে ভীষণ ঘাবড়ে গেলুম। বোমার পলতেয় আগুন লাগিয়ে মানুষ যেমন সিটিয়ে থাকে আমি সেইভাবে বেশ কিছুক্ষণ রইলুম। দৃষ্টি মুকুর মুখের দিকে। ভাবের কোনও পরিবর্তন যদি ধরা পড়ে!
না, বিস্ফোরণ হল না। মুখে ক্রোধের কোনও প্রকাশ দেখা গেল না।
কিছু মনে করলে তুমি?
মুকু মুখ নিচু করল। যখন মুখ তুলল, চোখদুটো ছলছলে। মালা পরার ভাগ্য করে আমি জন্মাইনি। মুকু আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। প্রায় ছুটে চলে গেল। কাকিমা আমার মুখের দিকে তাকালেন, আমি কাকিমার মুখের দিকে। ব্যাপারটা কী হল কিছুই বোঝা গেল না। মুকুর কোথাও একটা তীব্র বেদনা, তীক্ষ্ণ হতাশা জমে আছে। কেন? কারণটা কী? বড়লোকের মেয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ ডিঙোতে চলেছে। তার আবার দুঃখ কীসের!
আজ আমি নবাবি করব। ট্যাক্সি চাপব। বাইরে কোথাও বসে প্রাণ যা চায় তাই খাব। পেট্রল পাম্পে শরৎদার গাড়ি তেল নিচ্ছে। চেনা গাড়িতে উঠব না। সারাটা পথ বকবক করবে। দু’পা এগোতেই আর একটা গাড়ি পেয়ে গেলুম। গাড়িটা কোথা থেকে এল কে জানে! শ্মশান থেকে নাকি! পেছনের আসনে সাদা ফুলের ছেঁড়া পাপড়ি পড়ে আছে। গাড়ি চলেছে শ্যামবাজারের দিকে। মুকুর মুখ কিছুতেই কেন ভুলতে পারছি না। সব বেদনা আজ যেন দুধের মতো উথলে উঠেছে। মানুষ বুকের ভেতর কী যে বয়ে নিয়ে বেড়ায়। ওপর দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই। বিজলী ছলিয়া যায়, কাঁদে মেঘ ঝরি ঝরি;/বসন্ত জ্বলিয়া যায়, থাকে শুষ্ক পাতা পড়ি/স্বপন চলিয়া যায়/তন্দ্রা করে হায় হায়!
পাশে বসে আছেন কাকিমা অনেকটা করুণ ভৈরবীর মতো নারীর যতরকম রূপ আছে, সব মিলেমিশে এই বাইরে এসে কাকিমাকে এমন দেখাচ্ছে, যার তুলনা কাকিমা নিজেই। অন্য কারুর সঙ্গে তুলনা চলে না। কাকিমা মৃদু গলায় বললেন, কী ভাবছ তুমি?
আমি ভাবছি মুকুর কথা।
জানো আমিও ওই একই কথা ভাবছি। তোমার এই মেসোমশাই কেমন মানুষ পিন্টু?
সত্যি বলছি, আমি বিশেষ কিছু জানি না। কাউকে প্রশ্ন করে জানার চেষ্টাও করিনি। মেসোমশাই মানে মেসোমশাই, এইটুকুই জানি। আর জানি, পেশায় আইনব্যবসায়ী, প্রচুর পয়সার মালিক।
মানুষটি তেমন সুবিধের নয় পিন্টু।
কীরকম!
কাকিমা উত্তর দিতে ইতস্তত করছেন। গাড়ি ছুটছে হুহু করে। দুপুরের রাস্তাঘাট একেবারে ফঁকা। পথ ফুরোবার আগে উত্তর পাব কি?
বললেন না তো, কী কম সুবিধের নয়?
তুমি দেখো, ওঁর বড় বড় দুই মেয়ে, এক মেয়েকে আমি দেখিনি, মুকুকে দেখেছি। তার মানে ভদ্রলোকের বয়েস নেহাত কম নয়!
তা তো নয়ই, দেখলেই বোঝা যায়। মনে হয় পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে।
পঞ্চাশ তো হবেই, বেশিও হতে পারে। তা হলে দেখো!
কী দেখার কথা বলছেন?
তুমি আমার কাছে আর কিছু জানতে চেয়ো না। সংসারের অনেক নোংরা দিক আছে। তুমি আমার পবিত্র ছেলে, তোমাকে সেসব আমি জানতে দেব না। কাকও পাখি, চন্দনাও পাখি। একজন খোঁজে আঁস্তাকুড় আর একজন খোঁজে গাছের উঁচু ডাল। বিশ্বাস কর পিন্টু, আমার নিজের ছেলে থাকলে তাকেও আমি হয়তো এত ভালবাসতুম না। আমি রাতে তোকে স্বপ্নে দেখি। আমার কত কল্পনা! তুই বড় হতে হতে একেবারে আকাশের মতো হয়ে গেছিস। আমি কোথায় থাকব জানি না, যেখানেই থাকি, দূর থেকে শুনব তোর নামডাক। সবাই বলবে আমার পিন্টুর কথা। কত মানুষ তোর আশ্রয়ে থাকবে! তোর জীবনে রাতটাও হয়ে থাকবে দিনের মতো। কাগজে ছবি ছাপা হবে, নাম বেরোবে। সব মানুষের মুখে মুখে তোর নাম ফিরবে! ভাবতে ভাবতে আমি কীরকম পাগলের মতো হয়ে যাই, ছটফট করি মনে মনে, কেন হচ্ছে না! কেন এত দেরি হচ্ছে। সময় যে হুহু করে চলে যাচ্ছে। আমি কি দেখে যেতে পারব! কে কখন কোথায় কীভাবে থাকে! কাছ থেকে দূরে চলে যায়, দূর থেকে আসে কাছে। তোর ভাগ্য খুব ভাল পিন্টু। বটঠাকুরের মতো মানুষ হয় না। একেবারে সাধুর মতো। তোর সুখের জন্যে কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন!
