মুকু বললে, তুমি যে লেখো, আগে জানলে শুনে যেতুম। নিশ্চয়ই ছাপা হবে! কাগজের নামটা জানালে যেখানেই থাকি জোগাড় করে পড়ে নিতুম।
লেখা সহজ, লেখা ছাপানো খুবই কঠিন কাজ। ফিরে আসতে আসতে হঠাৎ একদিন ছাপা হয়। কারুর কারুর ভাগ্যে সারাজীবন শুধুই ফিরে আসা। কেউ কেউ আবার এমন অপয়া, না মরলে লেখা ছাপা হয় না। নিজেই নিজের ব্যাডস্টার। যেই সরল, অমনি হুড়হুড় করে লেখা ছাপা হতে লাগল। যশ, খ্যাতি, এমনকী পসথুমাস অ্যাওয়ার্ড। ফ্রানজ কাকার কী হয়েছিল ভাবো? মেটামরফসিস পড়েছ?
না।
পেলে পড়ে দেখো।
একবার উঠবে?
কেন?
একটু নীচে চলো, কাকিমা ডাকছেন।
ইমপসিবল! আমি যাব না।
যেতে আমার ইচ্ছে করে। এটা একটা ছুতো। কাকিমার সামনে যেতে ভীষণ ভয় করে। একসঙ্গে অনেককথা মনে পড়ে গিয়ে কণ্ঠতালু শুকিয়ে আসে। সামনে আয়না না থাকলেও বেশ বুঝতে পারি, চোখেমুখে কেমন যেন একটা অপরাধীর ভাব ফুটে ওঠে। চোখের সামনে ফিনফিনে পাঞ্জাবি পরা অদ্ভুত চেহারার সেই লোকটিকে দেখতে পাই। বিষ্টুদার কথামতো কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। কোনওদিন সম্ভব হবে বলে মনেও হয় না।
মুকু বললে, ছিঃ অভিমান করতে নেই। ভদ্রমহিলা কাল তোমার কথা বলতে বলতে চোখের জল ফেলেছেন। প্লিজ অভিমান কোরো না। আজ আমি চলে যাচ্ছি না? বেশ ভালই জানো, তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।
এককথায় মুকু আমাকে স্তব্ধ করে দিলে। এই যে কিছুকাল মানুষের পাশাপাশি থাকা, আবার চলে যাওয়া, পৃথিবী জুড়ে এই যে বিচ্ছেদের খেলা চলেছে, এই খেলা থেকে নিষ্কৃতি পাবার কোনও উপায় নেই। মুকুর সঙ্গে নীচে নামতেই হল। যাবার বেলায় তার একটা অনুরোধ রাখতেই হয়।
কাকিমা দরজার পাশে ডাকপিয়নের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। যেন রেজিষ্ট্রি চিঠি এনেছেন, সই করিয়ে ডেলিভারি দিয়ে যাবেন।
কাকিমা বললেন, আমি কী করেছি গো, তুমি আমার সঙ্গে হঠাৎ কথা বন্ধ করে দিয়েছ?
মুকু বললে, বাবুর অভিমান হয়েছে। আপনি বাবুকে না বলে মামাশ্বশুরের বাড়িতে কেন গিয়েছিলেন! বাবুর রাগ হয়েছে।
তুমি তো বাড়ি ছিলে না পিন্টু। তোমার কাকাবাবুর কোনও খবর নেই। আমাকে কোথাও তো একটা যেতেই হবে। তোমাদের আর কত কষ্ট দোব বলো! আমার ওপর রাগ কোরো না। এমনিই তো আমি আধমরা হয়ে আছি।
আপনার টাকাপয়সা ফুরিয়ে গেছে, আমাকে বলতে কী হয়েছিল?
আমি তো টাকাপয়সার জন্যে যাইনি, আমি তোমার কাকাবাবুর কথা বলতে গিয়েছিলুম। এতদিন হয়ে গেল, মানুষটা আসছে না কেন! মনে অনবরতই খারাপ চিন্তা আসছে।
মুকু বললে, আমি ডবল দুশ্চিন্তা নিয়ে চলেছি। এক আমার দিদির চিন্তা, দুই আপনার চিন্তা। মনে থাকলে একটা চিঠি দিয়ে জানাবেন।
কাকিমা বললেন, হ্যাঁরে, মেয়েটা আজ চলে যাবে, কিছু ভালমন্দ একটা খাওয়ার ব্যবস্থা কর।
মাংস?
মাছই ভাল, ট্রেনে রাত জাগবে। নিয়ে যাবার জন্যে কিছু জলখাবার করে দিই। লুচি, আলুর ঘি-মরিচ। তুই কিছু ভাল মিষ্টি এনে দে। বটঠাকুর আজ বেরোলেন কেন?
আজ শনিবার, দুটো কি তিনটের মধ্যেই ফিরে আসবেন। বলে গেছেন আসার সময় সন্দেশ আনবেন।
কাকিমা বললেন, আয় ঘরে আয়।
চৌকির ওপর ভাজ করা একটা শাড়ি। আকাশের মতো জমিতে, ছোট ছোট সাদা ফুল ছড়িয়ে আছে। কোনও শিশু যেন প্রকৃতির পায়ে অঞ্জলি দিয়ে গেছে। কাকিমা শাড়িটা মুকুর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, বড় গরিব ভাই। তেমন দামি নয়। ফেলে দিয়ো না, পোরো। মনে রেখো, অনেক দূরে এমন কেউ আছে, যে তোমার কথা ভাবে। কত ইচ্ছে মানুষের! কোনটাই বা পূর্ণ করা যায়। বলো পরবে? দামি নয় বলে টান মেরে ফেলে দেবে না!
কাকিমা মুকুর হাতদুটো চেপে ধরলেন। চোখদুটো ছলছলে হয়ে গেছে। ধরাধরা গলায় মুকু বললে, ভালবাসায় এ কাপড় সোনার চেয়েও দামি, কাকিমা। আপনাকে আমি কোনওদিন ভুলতে পারব না। এই বাড়ির কাউকেই আমি ভুলতে পারব না। আপনারা হয়তো আমাকে ভুলে যাবেন!
আমরা তিনটি প্রাণী পোডড়া বাড়ির সেই অন্ধকার ঘরে, চোখে টলটল জল নিয়ে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলুম।
১.৪৩ নিরাসক্ত ভালবাসা আপন দাক্ষিণ্য হতে
বেশি বেলা হয়নি। বারোটা বেজে কয়েক মিনিট হয়েছে। শনিবার অর্ধদিবস হলেও, দুটোর আগে দোকানপাট বন্ধ হবে না। মুকুকে একটা কিছু দেবার ইচ্ছে আমারও ছিল। কাকিমাকে দেখে সেই ইচ্ছেটা আরও প্রবল হয়ে উঠল। একটা ভাবনা ছিল, যদি না নেয়। অহংকার কমেছে, তবে কতটা কমেছে! কাকিমার দেওয়া শাড়িটা যখন নিয়েছে, তখন আমি একটা শাড়ি দিলে নেবে না কেন!
ঝট করে স্নান সেরে একবার বেরিয়ে যাই। কতক্ষণ আর লাগবে! শ্যামবাজারের মোড়ে অনেক বড় বড় দোকান আছে। একটাই সমস্যা জীবনে কখনও শাড়ি কিনিনি। কাকিমাকে নিয়ে গেলে কেমন হয়! এখন তো বাড়িতে করার মতো তেমন কাজ নেই। ট্রেনের জলখাবার করার অনেক সময় আছে।
কাকিমাকে বলতেই এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। বাড়ির বাইরে যেতে যে-কোনও বয়েসের মেয়েই খুব আনন্দ পায়। একঘেয়ে জীবনে তবু একটু বৈচিত্র্য।
কাকিমা বললেন, খেয়ে যাবে, না এসে খাবে?
খাওয়ার পর বড় আলস্য আসে। চাপা থাক, এসে খাওয়া যাবে।
চান করে কিছু না খেলে তোমার যে পিত্তি পড়বে।
ধুর, অনিয়মে এত বড় হলুম, গোঁফদাড়ি গজিয়ে গেল, আপনি এখন আমাকে নিয়মে ফেলতে চাইছেন! স্নান করতে করতে ভাবলুম, কাকিমাকে যত তাড়াতাড়ি আমাদের জীবনবৃত্তে টেনে নেওয়া যায় ততই ভাল। হঠাৎ মনে পড়ল, আমার সেই বেড়াল পোষার অভিজ্ঞতা। এতটুকু বয়েস থেকে খাইয়ে আদর করে যত্ন করে সুন্দরী রমণী করে তুললুম, তারপর সে দেখি আমাকে আর পাত্তাই দেয় না। ডাকলে আসে না। কোলে তুলে নিলে আঁচড়ে পালাবার চেষ্টা করে। তার একটা আলাদা স্বাধীন জগৎ। সব ছেড়ে বেড়াল রমণী তার প্রকৃতির জগতে ফিরে যেতে চায়। একদিন সে সত্যিই চলে গেল। পড়ে রইল তার ঘুমোবার বাক্স, দুধ খাবার বাটি, পাউডারের পাফ, খেলার গোল লাল বল। বিজাতীয় মানুষের মায়ায় তাকে বাঁধা গেল না। ফেরার অপেক্ষায় দিন থেকে সপ্তাহ গেল, মাস গেল, বছর ঘুরে গেল। বেড়াল আর এল না।
