কমলনেত্র রাম, শিক্ষা শেষ করে কিছুকাল রাজগৃহে অলস সময় কাটাতে কাটাতে বিরক্ত হয়ে পড়লেন। শেষে মনস্থ করলেন, তীর্থ দর্শনে যাবেন। রাজা দশরথ বললেন, অতি উত্তম প্রস্তাব। পড়ে গেল, সাজো সাজো রব। রাজকুমার রাম যাবেন তীর্থপর্যটনে। সঙ্গে চললেন লক্ষ্মণ, শত্রুঘ্ন। পর্যটন শেষ করে রাম যথাসময়ে ফিরে এলেন।
রাম গেলেন এক মানুষ, ফিরে এলেন আর এক মানুষ। মুখে হাসি নেই। আহার বিহার সব ত্যাগ। পদ্মাসনে বসে আছেন সারাদিন। গালে হাত। শরীর কৃশকায়। ক্রমশই রোগা হয়ে যাচ্ছেন। রাজকুমারের এ কী হল? রাজা দশরথ বড়ই চিন্তিত। ডেকে পাঠালেন বশিষ্ঠদেবকে। হেমুনি! আমার পুত্র কেন এমন। খেদান্বিত! দিনদিন কৃশ থেকে কৃশতর হয়ে চলেছে! বশিষ্ঠ বললেন, রাজন! চিন্তিত হবেন না। এ অতি শুভলক্ষণ। রাজকুমারের বৈরাগ্যোদয় হয়েছে।
রামচন্দ্রের যখন এই অবস্থা, তখন রাজসভায় এলেন বিশ্বামিত্র। রাজা দশরথ, তোমার জ্যেষ্ঠপুত্রকে। আমার প্রয়োজন। রাক্ষসের উৎপাতে আশ্রমে টিকতে পারছি না। রাক্ষস-নিধনের প্রয়োজন। রাজা বললেন, রামের অবস্থা অতি শোচনীয়। বিষণ্ণ রামচন্দ্র মুনির সামনে এসে বিরসমুখে দাঁড়ালেন।
রাম বললেন, মুনিশ্রেষ্ঠ, অবয়ববিশিষ্ট এই স্থূল শরীরেই মানুষের আত্মবোধের জন্ম। সংসাররূপ মেঘমালার ক্ষণবিধ্বংসী বিদ্যুতের ন্যায় ক্ষণভঙ্গুর জীবনে আমার শান্তিলাভের আশা নেই। এ জীবন শরতের মেঘ, নিঃশেষিত তৈল প্রদীপ, জলতরঙ্গের মতো চঞ্চল। পত্রের অগ্রভাগে অবস্থিত জলবিন্দুর মতো এই ক্ষণ শরীর যত তাড়াতাড়ি চলে যায় ততই ভাল। দীর্ঘায়ুব্যক্তি বৃদ্ধ গর্দভ। আয়ুতেই আপদ, অশান্তি, আর বৃথা শ্রমের পুঞ্জীভূত জঞ্জাল। কালরূপ মূষিক আয়ু কর্তন করে চলেছে। বায়ুভক্ষক সর্পের মতো কালসর্প আয়ু হরণ করে চলেছে। ব্যাধিঘুণ কুরে কুরে ক্ষয় সাধন করছে। মূষিক-আয়ুর সামনে বসে আছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মৃত্যু-বিড়াল।
আহা! শ্রীরামচন্দ্রের কী সুন্দর কথা! গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। প্রবন্ধ লেখার এই মজা, র্যানডাম কোটেশন মেরে যাও। এ যেন পড়তে পড়তে লেখা, লিখতে লিখতে পড়া। শ্রীরামচন্দ্রের কী হয়েছিল জানি না, আমি হাতে হাতে ফল পাচ্ছি। উদাসীর একতারা বাজছে মনের কোণে কোণে। পাঁচটা ইন্দ্রিয়ের এক একটা হিটলারের মতো সায়ানাইড ক্যাপসুল চিবিয়ে, চোখ উলটে উলটে পড়ে যাচ্ছে। যশ-খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা কোন রিপুর এক্তিয়ারে পড়ে জানা নেই। সেইটা এই মুহূর্তে বেশ প্রবল হয়েছে।
দেখি, রামচন্দ্র কী বলছেন? বালক যেমন বল নিয়ে খেলা করে, কালও সেইরকম নভোমণ্ডলে চন্দ্র ও সূর্যকে নিয়ে উদয় অস্তের খেলা খেলছে। কলপান্তে এই প্রাণীমণ্ডলকে সংহার করে, তাদের ভূতপঞ্চকময় অস্থিমাল্য গলায় ধারণ করে, কালপুরুষ মহানন্দে নৃত্য করতে থাকবেন। প্রলয়ের সময় নৃত্যপর এই কালপুরুষের নিশ্বাসে ভূর্জপত্রের মতো সুমেরু পর্বতও উড়ে যাবে। এই কালই ইন্দ্র, কালই রুদ্র, কালই কুবের, অথচ কালের কোনও রূপ নেই।
হে ঋষি! অগণিত ব্রহ্মাণ্ডমালা যেন পতনশীল ডুমুর ফল, অনন্ত প্রাণীমণ্ডল যেন মশা, আর কাল সেই ডুমুরফলপ্রসবকারী বৃক্ষ।
ত্রেতা ছেড়ে কলিতে চলে আসি। আমিই রাম, আমিই বিশ্বামিত্র। নিজেকেই প্রশ্ন করি, নিজেকে নিজে চিনিস? আলোকিত কাঁচের আধারে সাজিয়ে রাখা জিনিসের মতো নিজের ভেতরটা স্পষ্ট দেখতে পাস, ইডিয়েট! প্রকৃতি তোকে নির্বোধ করে রেখেছে। চুষিকাঠি দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছে। অহংয়ের খোলে পুরে ভ্রান্ত জ্ঞানের ছলনায় ভুলিয়ে রেখেছে। নিজের শরীরটাকেই ভাল করে চিনিস না, রাসকেল। অন্ত্রের জটিল মারপ্যাঁচ শিরায় শিরায় রক্তের কুলুকুলু প্রবাহ, টের পাস! স্নায়ু কখন কীভাবে, কেন কেঁপে কেঁপে ওঠে, জানিস কি? এই নে চাবি, জ্ঞান-প্রকোষ্ঠের দরজার ফাঁক দিয়ে একবার তাকিয়ে দেখ নীচের দিকে। আহা, চমকে উঠিস না। কার ওপর দাঁড়িয়ে আছিস! The merciless, the greedy, the insatiable, the murderous. অজ্ঞান উদাসীনতায় ভাসমান স্বপ্নখণ্ড। Hanging in dreams, as it were, upon the back of a tiger. বাঘের পিঠে চেপে স্বপ্ন দেখেছিস!
You that have seen man
As god and sheep.
Tearing to pieces the God in man
No less than the sheep in man
And laughing while tearing
This, this is your bliss
A poet’s and fool’s bliss.
পথে যে কন্টক আছে কী ভাবিলি তার?/কত শুষ্ক জলাশয়, কত মাঠ মরুময়/পর্বত শিখর শায়ী বিস্তৃত তুষার/কত শত বক্ৰগতি নদী খরস্রোত অতি/ঘুরিছে দারুণ বেগে আবর্তের জল/হা দুর্বল তুই তার কী ভাবিলি বল।
চমকে উঠেছি। মুকু পেছন থেকে এসে পিঠে হাত রেখেছে।
কী হল? অমন চমকে উঠলে?
না, অন্য একটা জগতে ছিলুম তো!
কী লিখেছ অত, পাতার পর পাতা?
মানুষ।
তুমি লেখো নাকি?
সম্প্রতি চেষ্টা করছি।
চেপে গেলুম। গর্ব খর্ব করার প্রবন্ধ লিখছি, তা না হলে বলতে পারতুম, আমার একটা গল্প বেরিয়েছে। রবিবাবু বলেছেন, বেশ লিখেছ।
মুকু কাঁধের ওপর দিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়েছে। মেয়েটি হঠাৎ কেন এমন সহজ হয়ে গেল! এই শেষ মুহূর্তে! যাবার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে! মুকুর চিবুক আমার ডান কাঁধের ওপর। ঘাড়ের কাছে দেহের উত্তাপ। শাড়ির আঁচলের হালকা স্পর্শ। আমি যেন মুকুর ভেতরে চলে গেছি!
