কোন দেশে যাবি মনা চল দেখি যাই
আমি দেখব, কোথায় পির হও তুমি রে,
তীর্থে যাবে সেখানে কি পাপী নাই রে ॥
বিবাদী তোর দেহে সকল,
অহর্নিশি করছে রে গোল
যথা যাবি, তথায় পাগল করবে তোরে ॥
নারী ছেড়ে জঙ্গলে যায়,
স্বপ্নদোষ কি হয় না তথায়,
সাথের বাঘে সবারে খায়,
তখন আর কে ঠেকায় রে ॥
সঙ্গে আছে রিপু ছয় জন,
তারা সদাই করে জ্বালাতন
যথা যাবি তথায় জঞ্জাল ঘটাবে রে ॥
মেসোমশাই মাঝেমধ্যেই বারান্দায় এসে গাছপালা দেখার ছলে নীচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মুকু এসে বলত, এখানে কেন? এখানে কেন? বাবা, আপনি ভেতরে যান। মেসোমশাই বলতেন, দাঁড়া না, দাঁড়া না, একটু সবুজ দেখি। কাকিমা আড়াল থেকে বারেবারে ওপর দিকে তাকাতেন, আর সরে সরে যেতেন। কাজ থাকলেও কুয়োতলায় আসতেন না।
এসব আমি দূর থেকে দেখতুম। সবাই ভাবত, আমি কিছু বুঝছিনা। সাথের বাঘে সবারে খায়, তখন আর কে ঠেকায় রে। মেসোমশাইকে সামনে রেখে মানুষ সম্পর্কে আমার এই খেয়ালখাতায় আরও দু’চার কথা লিখতে ইচ্ছে করছে। আমার কথা নয়। আমার একজন প্রিয় দার্শনিকের কথা। জীবনের মধ্যভাগে যিনি ঘোর উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। Man is a rope, tied between beast and overman. পশু আর অতিমানব যে-দড়িতে বাঁধা, সেই দড়িটি হল মানুষ। সেই দড়ি চলে গেছে অতি গভীর এক খাদের ওপর দিয়ে। A dangerous across, অতি বিপজ্জনক এক পারাপার। সাংঘাতিক এক চলার পথ। ফিরে তাকালেই বিপদ। দোদুল্যমান এক রঞ্জু। দাঁড়াবারও উপায় নেই। Man is something that shall be overcome. মানুষ এমন এক জীব যাকে পেরিয়ে যেতে হবে। মানুষকে অতিক্রম করতে না পারলে মানুষ হওয়া যাবে না। এ দেশের এক সাঁই লণ্ঠন হাতে মানুষ খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। মানুষ হয়ে মানুষের কী জ্বালা!
মুকুরা চলে যাবে। আর মনে হয় কোনওদিনই দেখাসাক্ষাৎ হবে না। কী করে হবে? বড় দুর সম্পর্কের আত্মীয়। থাকেও বহু দুরে। মুকু খুবই ব্যস্ত। বাঁধাছাদা চলছে। আমার সেইদিনটির কথা মনে পড়ছে, যেদিন তিনজনে হইহই করে এলেন। এসেছিলেন এক মেসোমশাই ফিরে যাচ্ছেন আর এক মেসোমশাই। দিনকতক বাড়িটা বেশ ভরে ছিল। কত কীই যে ঘটে গেল। কাল থেকে আবার সেই শূন্যতা, সেই নির্জনতা। দ্বিপ্রহরের ছায়াঘেরা বাগানে উদাস সুরে ঘুঘু ডাকবে। ফঁকা রান্নাঘরে বেড়াল চেষ্টা করবে দুধের ডেকচির ঢাকা খুলতে। ফোকরে শুরু হবে চড়ুই পাখিদের পারিবারিক কলহ। ঘরের মাঝখানে মুকুদের বাঁধাছাঁদা জিনিস এখন থেকেই, যাই যাই, বিদায় বিদায় করছে। মুকুই সব করছে। মেসোমশাই গম্ভীর মুখে ইজিচেয়ারে বসে কাগজ পড়ছেন, মনোযোগী পরীক্ষার্থীর মতো।
আজ আর বেরোনো হল না। শনিবার অর্ধদিবস অফিস মানে বেলা তিনটের সময় ছুটি। পুরো ছুটিই করে নিলুম। চিরবিদায়ের আগে এই পরিবারের সঙ্গে শেষ সঙ্গ করে নিই। মুকু মাঝে মাঝে আসছে। এটা ওটা জিজ্ঞেস করে চলে যাচ্ছে। নিচু হয়ে সুটকেস গুছোচ্ছে। বেডিং-এর দড়ি ধরে টানছে। মেসোমশাইয়ের দুটি মেয়েই বেশ কাজের। ভদ্রলোক বড় রহস্যময়। দুটি মেয়ে যে আছে, নিজের চোখেই দেখলুম। আর কে আছেন তেমন পরিষ্কার হল না এতদিনেও। কাউকে তো একটা চিঠিও লিখতে দেখলুম না। আর কয়েকদিন থেকে গেলেই পারতেন। মুকুর রেজাল্ট বেরোবার সময় হয়েছে। বলার কিছু নেই। রহস্যময় পুরুষের রহস্যময় আচরণ।
রবিবাবু সেদিন আমার মনে অন্য এক ধরনের অ্যামবিশন জাগিয়ে দিয়েছেন। সেই লিটল ম্যাগাজিনের গল্পটা পড়ে বলেছিলেন, চালিয়ে যাও, তোমার হতে পারে। রবিবাবুকে ভীষণ ভালবেসে ফেলেছি। এত ধীরে, এত আস্তে কথা বলেন, কানের কাছে মুখ না নিয়ে গেলে শোনাই যায় না। সবসময় হাসিহাসি মুখ। দীর্ঘ, একহারা চেহারা। সাদা ট্রাউজার, জামা ভেতরে খুঁজে পরা। বেশ একটা ইংলিশম্যান ইংলিশম্যান ভাব। কিছু মানুষ আছেন যাঁরা একই তরঙ্গে ভাইব্রেট করেন। সেইসব মানুষের নিজেদের মধ্যে বেশ একটা মিল থাকে। তাদের একই সঙ্গে মন ভাল হয়, মন খারাপ হয়, সর্দি হয়, কাশিতয়, জ্বর হয়, পেট খারাপ হয়। এঁদের বায়োলজিক্যাল ক্লক একই সময় দেয়। রবিবাবু আর আমি মনে হয় একই ভাইব্রেশনের মানুষ। স্বভাবের মিলও যথেষ্ট।
মানুষকে মানুষই এগিয়ে দেয়। মানুষই পেছিয়ে দেয়। কেউ উৎসাহিত করেন, কেউ হতাশা আনেন। কেউ মিইয়ে দেন, কেউ তাজা করে দেন। কেউ বলেন তোমার হবে, কেউ বলেন ব্যর্থ চেষ্টা, তোমার দ্বারা কিছু হবে না বাপু।
রবিবাবুর উৎসাহে একটা গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ কেঁদে ফেলেছি। জীবনে দেখা তো কম হল না! কতরকমের মানুষ। কতরকমের অসুখ! কতরকমের বিচিত্র পরিস্থিতি! জীবনে আনন্দের ভাগের চেয়ে,, দুঃখের ভাগই বেশি। এক পোয়া দুধে তিন পোয়া জল। কে যেন বলেছিলেন, আমাদের সাহিত্যে প্রবন্ধের বড় অভাব হে! গল্প পাবে, টন টন কবিতা পাবে, প্রবন্ধের দিকে কেউ বড় একটা যেতে চায় না। কোথায় রামেন্দ্রসুন্দর! কোথায় জগদীশচন্দ্র, কোথায় জগদিন্দ্র! প্রবন্ধভূমি তৃণহীন। খাঁখাঁ করছে।
পাতা দুয়েক লিখে ফেলেছি। বিষয়বস্তু মানুষ। মানুষের হাতে কম দিন হল মার খেয়ে মরছি! খাবলে খুবলে শেষ করে দিলে। প্রবন্ধটা মনে হয় ভালই জমছে। মানুষের পিন্ডি চটকে ছেড়ে দাও। একবার জন্মে গেলে, মানুষ নিজেকে আর মানুষ বলেই মনে করে না। মানুষ বলে ভাবতেই ভুলে যায়। নিজেকে মনে করে এক সেট অভ্যাস, আহার, নিদ্রা, মৈথুন, জীবিকা, শত্রুতা, পরশ্রীকাতরতা। ইন্দ্রিয়ের টংকারের এমন ঝংকার, অন্য সুর শোনার উপায় নেই।
