এ ছাড়া টাকা তোলার আমার দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই।
টাকা টাকা করছ, মধুপুরের বাগান বেচে তুমি কত পাবে বলে মনে করো! কে কিনবে?
আমার এক অ্যাটর্নি বন্ধু।
অফার কত?
বাড়িটা আগে দেখুক।
তোমার কী মনে হয়?
হাজার চল্লিশ।
অ্যাবসার্ড। ওখানে অত দাম পাবে না। এ কি তোমার কলকাতা।
জমিজায়গার দাম সব জায়গাতেই বাড়ছে।
যতই বাড়ুক, তোমাকে ছাড়তে হলে থ্রো-অ্যাওয়ে প্রাইসেই ছাড়তে হবে। একে বলে ডিস্ট্রেস সেল। ধরলুম তুমি চল্লিশই পেলে, বাকি এক লাখ ষাট? তোমার তো লাখ-লাখের ব্যাপার।
আমাদের বাড়িটাকে সেকেন্ড মর্টগেজ।
বহুত আচ্ছা। শুধু ভোবা নয়, একেবারে ভড়ভড় করে ডোবার ব্যবস্থা! বেশ বেশ তারপর?
তারপর আপনি।
আমি? আমার ঝুলিতে কী আছে জয়! সবই তো ডাক্তার আর পাওনাদারে শেষ করে দিয়েছে। পরপর মৃত্যুর মিছিল চলে গেল জীবনের ওপর দিয়ে।
ক্যাশ না থাক, গোল্ড আছে।
সোনা?
হ্যাঁ সোনা, দিদির কম-সেকম বিশ-পঁচিশ ভরি সোনার গয়না ছিল।
তুমি বলছ কী জয়? ওসব অলংকার, এক একটা মাস্টার পিস। এ যুগে ও সোনাও পাবে না, অমন কারিগরও মিলবে না। সেই জিনিস তুমি ছায়াছবির পেছনে ওড়াবে?
ওড়াব কেন? সব আবার ফিরিয়ে আনব। ছবি রিলিজ হওয়া মানেই টাকা আসতে থাকা। পরপর সাত দিন হাউসফুল হলেই তো হয়ে গেল।
আমি তোমার মতো ওই কাঁচের ফেরিওলার স্বপ্ন দেখতে পারব না, যা এক লাথিতে চুরমার হয়ে যায়। ওসব গয়না আমি আমৃত্যু যক্ষের মতো আগলে রাখব। চাও তো এই বাড়িটা বেচে দিই।
মাতুল মাথা নিচু করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। চারপাশ নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতায় দূর থেকে ভেসে আসছে একটা রিকশার ঘণ্টার শব্দ। টুং টুং করে বাজতে বাজতে এগিয়ে আসছে। মনে হয় কাকিমা আসছেন।
মাতুল মাথা তুলে চারপাশে তাকালেন। বড় অসহায় মুখের ছবি। করুণ কণ্ঠে বললেন, বইটা হাফ কমপ্লিট করতে পারলে ডিস্ট্রিবিউটর ধরে বাকি টাকাটা আদায় করা যেত।
তোমার তো অনেক বড়লোক ছাত্রছাত্রী, তাদের ধরো না জয়।
আপনার লোকই আমাকে ফেলে দিচ্ছেন, তারা তো পর! আচ্ছা, আমি এখন যাই।
মাতুল উঠে দাঁড়ালেন। সেই কেঁচা-লোটানো রাজপুত্তুর। শরীরটাকে টানটান করে বললেন, আপনি কোনও ফাঁইনানসার জোগাড় করে দিতে পারেন? একজন বিজনেস পার্টনার!
আমার পরিচিতরা সবাই স্মলমিসের মধ্যবিত্ত। তারা হাজার হাজার টাকা পাবে কোথায়?
মাতুল বললেন, এই হল বাঙালি। মাড়োয়ারি কি গুজরাতি হলে আমার এসব সমস্যাই হত না। বাঙালি লটারির টাকা ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। সিকিউরিটি, সেফটি–এর বাইরে বাঙালির কোনও শব্দ জানা নেই।
ধীরে ধীরে বিয়োগান্ত দৃশ্যের নায়কের মতো মাতুল ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
রাত নামছে, রাত। চারপাশের দোরতাড়া বন্ধের আয়োজন চলেছে। দরজা জানলার সংখ্যা তো কম নয়। নীচের দায়িত্বে কাকিমা, ওপরের দায়িত্বে আমরা। ছাদের সিঁড়ির দরজা বন্ধ করতে গিয়ে দেখি, কাকিমা বসে আছে আলসের একপাশে চুপ করে।
মধ্যরাত। চারপাশে হুহু করছে শূন্যতা। দূরে, বহু দূরে কুকুরের পাল রাত কাঁপাচ্ছে। যারা জাগার তারা ঠিক জেগে আছে ঝকঝকে চোখ মেলে, অসীম কৌতূহলে তাকিয়ে আছে পৃথিবীর দিকে। দেশলাইয়ের বাক্সে মানুষের নাচা কাদা-ওঠাবসা। অত উধ্ব থেকে পৃথিবীর বিশাল বিটপীও আগাছার মতো।
কাকিমা খুব শান্তগলায় বললেন, কে, পিন্টু?
আমি যেই হই, আজ আর আমি সাড়া দোব না। আমারও তো অভিমান থাকতে পারে!
***
মেসোমশাই মুকুকে নিয়ে আজ রাতের ট্রেনে চলে যাবেন।
প্রথমে বলেছিলেন প্লেনে যাবেন। কী কারণে হঠাৎ মতের পরিবর্তন হয়েছে। আমার অগোচরে কোথাও একটা কিছু ঘটে গেছে। ঠিক ধরতে পারছি না, তবে অনুমানে নানা সম্ভাবনা ভেসে ভেসে আসছে। কাকিমা মেসোমশাইকে কেন জানি না এড়িয়ে এড়িয়ে চলছেন। কেমন যেন একটা ভয়ভয় ভাব। আর মুকু যেন প্রহরীর মতো বাবাকে চোখে চোখে রেখেছে। গুরুজন। সন্দেহ করা উচিত নয়, কিন্তু বিশ্রী একটা সন্দেহে মন কুঁকড়ে আছে। পৃথিবীর কিছুই দেখিনি, তবু যা দেখেছি, যা শুনেছি তাইতেই চোখ খুলে গেছে। এ বড় বিচিত্র স্থান। এখানে কী যে হয়, আর কী যে হয় না! এখানে জলেও ডিঙি চলে, ড্যাঙাতেও ডিঙি চলে।
এতদিন পরে আমার সেই পুরনো ডায়েরিটা বেরিয়ে পড়েছে। সেই ডায়েরি যেটা কনক লুকিয়ে রেখে আমাকে সেই জবা-পালানো রাতে ভীষণ বাঁচিয়েছিল। যে-ডায়েরির পাতায় মায়াকে নিয়ে ভট্টিকাব্য লিখে নিজের মৃত্যুবাণ নিজেই তৈরি করেছিলুম। ডায়েরি ওলটাচ্ছি, কত কী পাগলামিই যে বেরোচ্ছে। একটা পাতায় কনকের হাতের লেখা স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল। আমাকে কেমন লাগে কনক লিখেছে। প্রধানশিক্ষকের ক্যারেক্টার-সার্টিফিকেট যেন! তোমার সবই ভাল, গোটাকতক বস্তু ছাড়া। তোমার ভেতরে একটা অহংকারের ভাব প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। তুমি ধরতে পারো না। তুমি অনেকটা তোমার মামার মতো। নিজেকে কখনই অত শ্রেষ্ঠ ভাবা উচিত নয়। এ ছাড়া, তোমার অভিমান! অত অভিমানী হলে পৃথিবী থেকে সরতে সরতে ক্রমে একঘরে হয়ে যেতে হয়।
কনক প্রচণ্ড জ্ঞানীর মতো কত কীই যে লিখে রেখে গেছে! একটা পাতায় অদ্ভুত একটা গান লিখে। রেখেছি। কোথা থেকে পেয়েছিলুম জানি না। মানুষের কাণ্ডকারখানার সঙ্গে বড় মিলে যায়। উপায় থাকলে মেসোমশাইকে পড়তে দিয়ে, মুকুর মতো তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতুম।
