অস্পষ্ট একটা পরিচয় পাওয়া গেল। মেজ জ্যাঠাইমার বোনের স্বামী। বহুকাল আগে একবার এসেছিলেন। থাকতেন রেঙ্গুনে। আইনজীবী ছিলেন। তখন আমাদের সংসার জমজমাট। সুন্দরী। সুন্দরী বউ। পিসিমাদের আসাযাওয়া। অতিথি অভ্যাগত। গানবাজনা। পায়ে পায়ে ঘুরছে সাদা সাদা কাবলি বেড়াল। হাজার টাকার ঝাড়বাতি জ্বলছে। বাড়িটাও তখন এত জরাজীর্ণ হয়ে যায়নি। তারপর অদৃশ্য মৃত্যু এল কালো ওড়না গায়ে দিয়ে। আমরা তখন গভীর ঘুমে। ফুঁ দিয়ে একটি একটি করে বাতি নিবিয়ে দিয়ে গেল। সব মৃত্যুই শেষ রাতে। অদ্ভুত অদৃষ্ট লিপি। অসুখ, মৃত্যু, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বোঝার মতো বড় তখনও হইনি। খুব ছোট গাছ। ঝড় বইছে ওপরে। ডালপালা নড়ছে। শব্দ শুনছি। গায়ে লাগছে না। ভোরে উঠে দেখি দীপ নিবে গেছে। ফিকে ধোঁয়া উঠছে পাকিয়ে। পাকিয়ে। যে ছিল সে আর নেই। শূন্য ঘর। শূন্য শয্যা। এ কেমন যাওয়া! কেউ তেমন সহজ করে বলতেই পারে না। কেন যাওয়া, কেনই বা তবে আসা। শিশুকে বোঝানো হত, তিনি গেছেন, দূরে, আসবেন, তবে দেরি হবে। এই নাও, তোমার ছবির বই, খেলনা, এয়ারগান। ভুলে যাও, ভুলে থাকো। মেতে থাকো। সংসারে অনেক কাজ, অনেক আশা। খাড়া সিঁড়ি উঠে গেছে খোলা ছাদে। রাতে যার মাথার ওপর থমকে থাকে তারা-চমকানো আকাশ। সেই সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে। সন্ধেবেলা রোজই গা ছমছম করে উঠত। মনে হত আজও সে আসবে নাকি! ভোরে উঠে দেখব আমাদের আর একজন কেউ নেই। সেই চলে যাওয়া আর ফিরে না-আসার অভিমান মনের সুরটাই চিরকালের জন্যে এমনভাবে বেঁধে দিয়ে গেছে, এখনও ঠোঁট ফোলে। মনে হয় তারা আছেন যাঁরা নেই। নির্জন দুপুরে এ বয়েসের সংলাপ:
যারা ছিল একদিন; কথা দিয়ে, চলে গেছে যারা;
যাদের আগমবার্তা মিছে বলে বুঝেছি নিশ্চয়;
স্বয়ম্ভ সংগীতে আজ তাদের চপল পরিচয়
আকস্মিক দুরাশায় থেকে থেকে করিবে ইশারা ॥
কিছুই তো মনে নেই সেদিনের কথা। শীতের সকালে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। অস্বচ্ছ পরদার আড়ালে পড়ে আছে জীবনের ফেলে আসা দিন। কে হাত ধরেছিল; কে কোলে নিয়েছিল, কে চুমু খেয়েছিল আদর করে! সবই অস্পষ্ট, ভাসা ভাসা। কল্পনা করা যায়, জোর করে কিছু বলা যায় না। আজ জ্যাঠাইমাও নেই, জ্যাঠামশাইও নেই। কিছু আগে পরে দু’জনেই চলে গেছেন।
টেবিলের ওপর টুপি নামিয়ে রেখেছেন। মাথার চুলে কমান্ডার কাট। চোখদুটো মাংসর চাপে ছোট ঘোট। মুখ গোলাকার। দুটি চিবুক তৈরি হয়েছে। বেল্টের চাপে পেট ফাটোফাটো। মানুষের মন কত খারাপ দিকে ছোটে! হঠাৎ মনে হল, এইরকম ভদ্রলোকের কেমন করে এমন সুন্দর দুটি মেয়ে হল? অবাক কাণ্ড! জন্ম রহস্যটা যদি জানা যেত! মনকে এক ধমক, ব্যাটা! পড়াশোনা চুলোয় গেল, যা জানলে কাজ হয় তা জানা হল না। জন্ম-রহস্য!
দু’পাশে দুটো পা ছড়িয়ে ভদ্রলোক বসেছেন। মাথার চুলে কুচুর কুচুর হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, আমি তা হলে গিয়ে তোমার মেসো হলুম।
যা হয় একটা কিছু হলেই হল। একটা ব্যাপার লক্ষ করে বেশ অবাক হচ্ছি। সেটা হল আমার শরীর। এতক্ষণের দুর্বলতা, কিছু না করার ইচ্ছে, আলস্য, সব হাওয়া। শরীরে যেন বেশ বল এসে। গেছে। কামিনী আর কাঞ্চন, এর চেয়ে ভাল টনিক আর কী আছে! আমার কথা নয়, নির্মল পাগলার। খুব জ্ঞানী মানুষ। গোটাকতক বিষয়ে এম এ সব ক’টাতেই ফার্স্টক্লাস। পড়ে পড়ে পাগল। জমিদারের ছেলে। নেই নেই করে এখনও বেশ আছে। বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে থাকেন। মালকোঁচা মারা ধুতি। শার্টের ওপর গেঞ্জি। ধুতির ওপর আন্ডারওয়ার। লোকে যা করে তিনি তার উলটোটাই করবেন। নির্মলদার গল্প, বাহাত্তর বছরের বুড়ো, খাবিখাওয়া অবস্থা। উঠোনে কেত্তন-পার্টি রেডি। খোলের ওপর হাত নিসপিস করছে। বুড়ি ঘর থেকে কেঁদে উঠলেই কপাক কপাক করে খোল বেজে উঠবে। বুড়োর চোখ গেল দরজার দিকে। রকে বসে মানদা বাসন মাজছে কোমর দুলিয়ে। বেশ উঁশা যৌবন। বুড়ো থপাক করে খাট থেকে গড়িয়ে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চলল। আরে করো কী করো কী?
বড় অশ্লীল!
নির্মলদা বলবেন, চপ শালা। সারা পৃথিবীতে মানুষের শরীরে মাদল বাজছে। কামের জন্যেই come. পুড়ে ছাই হলে তবেই calm, ওসব সাধুগিরি আমার কাছে ফলাতে আসিসনি। নির্মলদার রণহুংকার:
I storm and I roar, and I fall in a rage,
and, missing my whore, I bugger my page.
কী জানি বাবা, কীসে কী হয়। আমার এই ভাবনা পিতাঠাকুর কোনওক্রমে জানতে পারলে হতাশায় আত্মহত্যা করবেন। উঃ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! কেন যে ছেলেরা পিতার হাতছাড়া হয়ে যায়! বড় ভাবনার কথা!
একটু গরম জল হলে…মেসোমশাই কিন্তু কিন্তু গলায় বললেন।
চা? আমার প্রশ্ন! একটু চা করে এঁদের সেবা করতে পারলে ভাবব, তবু একটা কাজের কাজ হল।
না, চা আমরা কেউই খাই না। তোমার নামটা কী বাবা? ভুলে গেছি, অনেকদিন আগে একবারই তো এসেছিলুম, তখন তুমি এতটুকু।
আমার নাম পিন্টু। গরম জল কী করবেন?
স্নান করতে হবে। নতুন জায়গা, ঠান্ডা জল গায়ে ঢালতে চাই না।
খুবই চিন্তার কথা। প্রাইমাস স্টোভে চায়ের জল গরম হতে পারে, তিনজনের স্নানের জল গরম করতে হলে উনুন ধরাতে হবে। সে এক ভয়ংকর ব্যাপার।
একটু বসুন তা হলে, উনুন ধরাই।
