কী খবর?
তিনি বানপ্রস্থে যাবার জন্যে প্রস্তুত। গেরুয়া ছাপানো হয়ে গেছে। রংটা মনে হয় ভাল ছিল না, তাই। তেমন লাল হয়নি।
হঠাৎ বানপ্রস্থ! রাগারাগি হয়েছে বুঝি!
না, রাগারাগি হবে কেন, বৈরাগ্য এসেছে!
কোন বনে যাবেন? বন আর আছে, তেমন ফলমূলঅলা ভাল বন?
সারাভারতে ওঁর তো একটাই ফেভারিট জায়গা আছে রে, হরিদ্বার। কংখল, হর-কি-প্যারী, লছমনঝুলা, কালী কমলিকা ধরমশালা। বার তিরিশ হরিদ্বার গেছেন আর একবার না হয় যাবেন। পিতৃদেব কোথায়?
বাজারে গেছেন।
এত রাতে বাজারে!
আজ্ঞে রাত সম্পর্কে ওঁর ধারণা অন্য। ওঁর জীবনে রাত নেই। যত রাত বাড়ে, তত কাজ বাড়ে।
একটু চা-টা খাওয়াবি, না, সেসব পাট উঠে গেছে?
না উঠবে কেন? এ তো চায়েরই বাড়ি। টি হাউস।
তা হলে কড়া করে এক কাপ নামা দেখি। হৃদয়ে যেন লাথি মারে।
সে আবার কী?
ও ইংরিজি করে না বললে বোঝা যায় না বুঝি! চায়ে যেন বেশ কিক থাকে। কিকিং টি।
রান্নাঘরে গিয়ে খুটুর খুটুর করছি। মুকু পাশে এসে দাঁড়াল। আজকাল একটু ঘনিষ্ঠ হতে চাইছে। ক’দিন থেকেই লক্ষ করছি, মুকু কী যেন একটা বলতে চায়। গভীর গোপন কোনও কথা। মনে আতঙ্ক পুষে রেখেছি। সরলকেও জটিল মনে হচ্ছে। হয়তো কিছুই বলার নেই। যাবার দিন এগিয়ে আসছে, তাই হয়তো কাছাকাছি এসে, এতদিনের দুর্ব্যবহারের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইছে।
চুলে আজ তেল পড়েছে। টানটান খোঁপা। দু’চোখে কি একটু কাজল টেনেছে? মুকুর মেকআপে নিশ্চয়ই আজ কাকিমার হাত গড়েছে। কোথায় তিনি? কয়েকদিনের দুশ্চিন্তায় মুকুর মেদ এখন বেশ
ঝরে গেছে। চেহারায় কনকের আদল এসেছে। কনক এতকাল মেদভারে মুকু হয়ে ছিল।
মুকু বললে, তুমি সরো, আমি চা করে দিচ্ছি। শুধু চা? আর কিছু খাবেন না?
তুমি জিজ্ঞেস করে এসো তো, তা হলে আচ্ছা করে ডবল ডিমের ওমলেট বানিয়ে দিই।
মুকুকে আর যেতে হল না। আমার মামা কি এক জায়গায় চুপ করে গোমড়া মুখে বসে থাকার ছেলে, চুপিচুপি মুকুর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। মুকু টের পায়নি। ইশারায় জানালেন, বোলো না। তারপর মুকুর কানের পেছন দিকে ফুস করে ফুঁ মারলেন।
মুকু চমকে উঠেছে। মাতুলের সে কী হাসি! হোহো, হাহা, হিহি।
লাফাতে গিয়ে মাতুলের পায়ে বোধহয় মুকুর পা ঠেকেছিল। তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে প্রণাম করল। কেউ প্রণাম করলে, কেউ ভক্তি শ্রদ্ধা দেখালে, মাতুল একেবারে মহাদেব। চিবুক ছুঁয়ে বললেন, বেঁচে থাক মা। জীবনে সুখী হ।
শুকনো আশীর্বাদে মাতুল সন্তুষ্ট হবেন। তিনি কি আমার মায়ের তেমন ভাই! বুকপকেট থেকে খুলে নিলেন সোনার পার্কার কলম, এই নাও, পুয়োর ম্যানের পুয়োর প্রেজেন্টেশন। এমনি করেই স্মৃতি ছড়িয়ে যাই।
মুকু কলমটা হাতে নিয়ে ভাবছে, নেওয়া উচিত হবে কি না? কেমন যেন অবাক হয়ে গেছে।
মাতুল গান ধরেছেন,
এই কথাটি মনে রেখো,
তোমাদের এই হাসি খেলায়
আমি যে গান গেয়েছিলাম
জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়
শুকনো ঘাসে শূন্য বনে আপন-মনে
অনাদরে অবহেলায় ॥
মাতুলের গলা সামান্য ধরে এল। তবু গাইলেন, দিনের পথিক মনে রেখো, আমি চলেছিলেম রাতে/সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে হাতে।
পরের লাইন আর উচ্চারণ করতে পারলেন না। ফুঁপিয়ে কান্না বেরিয়ে এল। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ ঢেকে মুখ নিচু করলেন। একটা হাত লম্বা টেবিলে, শরীর হেলে গেছে বাঁ পাশে।
এমন আবেগ আগে কখনও দেখিনি। আজ কী হল! কথা বলতেও সাহস হচ্ছে না। পিতৃদেব পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, হাতে বাজারের ব্যাগ। এত বড় ব্যাগ একমাত্র তিনিই তুলতে পারেন, বইতে পারেন।
ব্যাগটা কোনওমতে মাটিতে নামিয়ে, তিনি বললেন, কী হল জয়?
মাতুল চোখে রুমাল চাপা অবস্থায় মুখ তুলে বললেন, আই অ্যাম এ ব্রোক।
ব্রোক? তার মানে?
আই অ্যাম ফিনিশড্।
ফিনিশড্? তার মানে?
চোখ থেকে রুমাল সরিয়ে বললেন, চলুন, বলছি।
আমরা সেই শোকের মুহূর্তেও নিজেদের কর্তব্য ভুলিনি। সমস্বরে জিজ্ঞেস করলুম, আদা আর পেঁয়াজকুচি দিয়ে ডবল ডিমের ওমলেট চলবে তো মামা! ঘাড় নাড়লেন। তার মানে, হয়ে যাক। বাজার ব্যাগ থেকে লকলকে সবুজ পেঁয়াজকলি বেরিয়ে আছে।
মুকু কলমটা আমার হাতে দিয়ে বললে, কী হবে?
কী আবার হবে! তুমি রেখে দেবে যত্ন করে, দামি জিনিস। মাঝে মাঝে লিখবে।
কোনও কিছু নিতে আমার ভীষণ লজ্জা করে। এটা তুমি নাও। ওনার মন ভাল হলে, পরে বরং ফেরত দিয়ো।
তা কখনও হয়? মামাকে তুমি চেনো না। রাগলে একেবারে অন্য মানুষ। মুকু, কাকিমা কোথায়?
ও, তোমাকে বলা হয়নি, আমাকে বলে গেলেন, মনটা বড় খারাপ, একবার মামাশ্বশুরের ওখান থেকে ঘুরে আসি।
কখন গেছেন?
তা বেশ কিছুক্ষণ হল। পাঁচটা নাগাদ গেছেন।
একা একা চলে গেলেন?
হ্যাঁ, আমাকে বললেন, হাতে নাকি একটাও পয়সা নেই।
পয়সা নেই, তা আমাকে বলতে কী হয়!
তুমি আমার ওপর রাগ করছ কেন? আমি কী জানি বলো?
তোমার ওপর রাগ করিনি। মানুষের জন্যে যতই করো না, পর কখনও আপন হয় না, নেভার!
সে যদি বলল, কাকিমা যেমন তোমার পর, ওদিক থেকে তুমিও তো কাকিমার পর! সম্পর্ক। হাওয়ায় ভেসে আসতে পারে না। সম্পর্ক রক্তের, সম্পর্ক দাবির। এক হয় জন্মসূত্রে, আর এক হয়। আইনের বাঁধনে। তুমি কি একবারও কাকিমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে?
না, তা অবশ্য করিনি। মানে আমার ভাবনায় আসেনি।
