বিষ্টুদা বললেন, এইসব লোকের সঙ্গে মেশো কেন? তুমি কত বড় বংশের ছেলে জানো?
বিষ্টুদাকে হাত ধরে দোকানের পেছনে টেনে নিয়ে গেলুম। বুঝতে পারছেন না আমি কী করতে চাইছি। অবাক হয়ে গেছেন। দোকানে এখন একটিও খদ্দের নেই। এর চেয়ে ভাল সুযোগ আর পাওয়া যাবে না।
এইখানে বসুন। ভীষণ জরুরি কথা আছে।
বিষ্টুদা বেশ ভয় পেয়ে গেছেন, কী ব্যাপার বলো তো!
খুব একটা সমস্যায় পড়ে গেছি। নিজের তৈরি ফঁদে নিজেই পড়ে গেছি।
পুরো ব্যাপারটা বিষ্টুদাকে বললুম। গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত। এমনকী এই লোকটির আসা, ঘড়ি খুলে দেওয়া সব বলতে পেরে মনটা বেশ হালকা হয়ে গেল।
সব শুনে বিষ্টুদা অ্যা হাঃ হাঃ, চুক চুক করে একটা আক্ষেপের শব্দ করলেন। তোমার মতো বোকা ছেলে পৃথিবীতে আর দুটো নেই। ঝট করে ঘড়িটা খুলে দিয়ে দিলে! আমাকে বলবে তো! মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে।
কী করব? লোকটাকে থামাতে হবে তো। কাকিমাকে আমি জানতে দিতে চাই না।
শোনো শোনো, খবরটা চেপে রাখা খুব অন্যায় হবে। স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে বিধবা হতে হয়। শ্রাদ্ধশান্তি করতে হয়।
অপঘাতে মারা গেলে শ্রাদ্ধ হয় না।
বিধবা তো হতে হয়!
যিনি মারা গেছেন তিনি কি মানুষ ছিলেন? তেমন মানুষ হলে একশোবার বিধবা হওয়া চলে।
বিষ্টুদা জিভ কেটে বললেন, ছি ছি, সব মানুষই ভাল। বিচার করার অধিকার তোমার নেই। স্ত্রীর কাছে যে-কোনও স্বামীই দেবতা। তা যদি না হত, তোমার বউদি আমাকে লাথি মেরে চলে যেত। কত বড় ঘরের মেয়ে! গান শুনলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। রূপও বড় কম ছিল না।
জহরবাবুর কথা মনে আছে, আজ বছর সাতেক বেপাত্তা। আপনার ধারণা সে বেঁচে আছে!
ধরলুম বেঁচে নেই, তাতে তোমারই বা কী, আমারই বা কী!
জহরবাবুর বউ বিধবা হয়েছেন? শাস্ত্রে আছে, কত বছর যেন অপেক্ষা করে তারপর শাঁখা সিঁদুর ছাড়তে হয়।
তুমি যখন জানোই তখন শুধু শুধু পাপের ভাগী হবে কেন?
আপনি এই মহিলাকে দেখেননি। দেখলে আমার মতো আপনারও একই ইচ্ছে হত। যিনি প্রতি মুহূর্তে সুখের সংসারের স্বপ্ন দেখছেন, কী করে যমদূতের মতো তার সব স্বপ্ন চুরমার করে দেওয়া যায়, আপনিই বলুন! খেলা না ফুরাতে খেলাঘর ভেঙে যায়। যোলো-সতেরো বছর চলুক না এইভাবে।
তোমার বুদ্ধি এখনও বহুত কঁচা। তোমার কাকার কথা ভেবে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। একটা মানুষ এইভাবে চলে যাবে, কেউ একটু চোখের জল ফেলবে না? কেউ তার জন্যে সাদা কাপড় পরবে না? পৃথিবী কি এতই অকৃতজ্ঞ? আমাকে ভার দাও, আমি মর্গ থেকে লাশ খালাস করে আনি।
সে কি আর আছে নাকি!
ছি ছি, এ তুমি কী করলে পিন্টু? শেষ দেখা দেখতে দিলে না, শেষ কাজ করতে দিলে না। কেন বলো তো!
আমি এতক্ষণ আপনাকে কী বললুম!
তুমি নিজেকে এখনও ধরতে পারোনি পিন্টু। তুমি বিশ্রী একটা ঝামেলার ভয়ে এতদিন পালিয়ে পালিয়ে বেড়ালে। থানা, পুলিশ, মর্গ, শ্মশান, সৎকার, কান্নাকাটি এইসব এড়াবার জন্যে নিজের মতো একটা যুক্তি খাড়া করে নিজেকে ধাপ্পা দিলে। সংসারের সবকিছুকে কি ওইভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায়? তুমি আমাদের সত্যেনের মতো করলে। বাপের শ্রাদ্ধের পর ফিরে এল। এসে বললে, টেলিগ্রাম চিঠি কিছুই পায়নি। আর দুম করে তুমি হাত থেকে ঘড়িটা খুলে দিয়ে দিলে! কী লোক, কোন লোক, কোথাকার লোক কিছুই দেখলে না! আমাকে একবার বলতেও তো পারতে!
ওর সামনে বলি কী করে?
যাক যা গেল তা গেল। খুব সাবধান! ও আবার আসবে, তোমার কাছেই আসবে। ও বুঝে গেছে, কোথাও একটা গোলমাল আছে। একে চাপ দিলেই মাল বেরোবে। তুমি সোজা বাড়ি যাও। প্রথমে তোমার বাবাকে সব খুলে বলল। তোমার কাকিমাকে তিনিই বলবেন। প্রয়োজন হলে আমাকে ডেকো। জানো তো চাপা জিনিস ফেটে বেরোয়।
বিষ্টুদা, আমি এখন বলতে গেলে সবাই বলবেন, তুমি তখন বললে না কেন? একটা বিশ্রী ব্যাপার হয়ে যাবে। তার চেয়ে সাত দিন পরে ওই ব্যাটাই আসুক, এসে বলুক।
অ্যাঃ তুমি একটা অসৎ লোকের খপ্পরে চলে গেলে!
গেলুম কই? সোজা এসে এবার কাকিমার সঙ্গে দেখা করুক!
খবরদার না। এসব লোককে বাড়ির অন্দরমহলে একেবারে ঢুকতে দেবে না। এরা সব পারে। এরা ঘরের মেয়েকে বাইরে বের করে পেট চালায়। আমি যদি একবার টের পেতুম তোমাদের এইসব হচ্ছে, সোজা থানায় গিয়ে পুলিশ ডেকে আনতুম।
নীল লুঙ্গি পরে অঘোরবাবু দোকানে ঢুকলেন। বিষ্টুদা ঠোঁটে আঙুল রেখে বুঝিয়ে দিলেন, চুপ, আর একটাও কথা নয়।
১.৪২ পার করো দয়াল, আমায় কেশে ধরে
বাড়ির সামনে গাড়ি থামার শব্দ হল। পরক্ষণেই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। মাতুল আসছেন। একটু যেন ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মুখে সেই মনোরম হাসিটি লেগে নেই। সাজপোশাক অবশ্য রাজপুত্রের মতোই। আছে। শরীর ঘিরে ফুরফুরে সুবাস।
চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, কী খবর তোমাদের?
আজ্ঞে, মোটামুটি ভাল। আপনার খবর?
তোর লজ্জা করে না, এলেই যত খবর নেবার ঘটা। কেন, একবার যেতে পারিস না!
সেই সাতসকালে বেরিয়ে যাই। সারাদিন ল্যাবরেটরিতে বার্নারের সামনে, অ্যাসিড, অ্যালক্যালি ফিউমস। ফিরি যখন শরীরে আর কিছু থাকে না।
বাবা, তুই যে দেখি বুড়োদের মতো কথা বলছিস! পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর চাকরি করবি কী করে? রবিবারেও তো আসতে পারিস।
আপনি থাকেন?
আমি না থাকলে, আর কেউ নেই? তোর দাদুর খবর জানিস?
