সে উপায় নেই, যা বলার আমাকেই বলুন।
হ্যাঁ, তা হলে বলেই ফেলি। একটা জায়গা থেকে আমরা বাসে করে ফিরছিলুম, আমাদের দলবল নিয়ে। দলে ছিল লক্ষ্মীবাই, উমাবাই, আমি, হীরাচাঁদ, আরও অনেকে। হীরাচাঁদের সঙ্গে ওস্তাদের একটা খটাখটি চলছিল। দুটো ওস্তাদের মধ্যে একটা মেয়েছেলে পড়লে যা হয়। আপনি স্যার ছেলেমানুষ, এসব যত কম শোনেন ততই ভাল। লক্ষ্মীবাই দু’জনকেই পুষছিল। দুটোরই যেন এঁড়ে লেগে গিয়েছিল। সেসব অনেক ব্যাপার। আপনি স্যার নাবালক, ওসব না জানাই ভাল। চন্দ্রকোনার কাছে বাস যখন এল তখন মাঝরাত। হীরাচাঁদ বললে গাড়ি থামাও। উমাবাই তামাক খাবে। রাস্তার পাশে বাস দাঁড়াল। তামাকচি তামাক সাজতে বসল। ওস্তাদজি আর ফটকে গেল জল ফেরাতে। গেল তো গেলই, তাদের আর আসার নাম নেই। বাস দাঁড়িয়ে রইল এক ঘণ্টা। হীরাচাঁদ আর আমি ঘুরে এলুম। দুজনেই বেপাত্তা।
গল্পটা বেশ ভালই কেঁদেছে অষ্টাবক্র। টেবিলে টকটক আওয়াজ করে বললে, আর এক কাপ চা ছাড়ো ওস্তাদ।
বিষ্টুদা মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হচ্ছেন। কী করব, সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই। চা এসে গেল। চুমুক দিয়ে, জিভে আর দাঁতে এক ধরনের গ্রাম্য শব্দ করে, গল্পের খেই ধরলেন, হীরাচাঁদ বললে, দাও গাড়ি ছেড়ে দাও, ও নিমকহারাম দুটো এখানেই পড়ে থাক। হীরাচাঁদ স্যার বেনারসের গুন্ডা, ও যা বলবে শুনতেই হবে। গাড়ি চলতে শুরু করল।
গল্পের সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে ঘটনা মেলাবার চেষ্টা করলুম। কোথায় চন্দ্রকোনা আর কোথায় কলকাতার মর্গ! আমি পুলিশ হলে, মারতুম ব্যাটার তলপেটে এক কোঁতকা, সত্যি কথা বেরিয়ে আসত হুড়হুড় করে।
সেই ফটকেকে সেদিন আমি গার্ডেনরিচে দেখলুম, বললুম, বল ব্যাটা, তুই আর ওস্তাদ সে রাতে কোথায় বেপাত্তা হলি? ফটকে আবোল তাবোল বকছে। কোনও কথার সঙ্গে কোনও কথার মিল নেই।
লোকটি চায়ে লম্বা এক চুমুক মেরে, কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল। এই মুহূর্তে আমার সেই ভয়টা আবার চেপে এল। এ তো দেখছি পুলিশ কেস। খুনের মামলা। ব্যাপারটা এইভাবে চেপে রাখা যায় না। এরপর কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোতে পারে।
আপনি হঠাৎ এখানে এলেন কেন, এতদিন পরে?
বাঃ, খবরটা জানাতে হবে না? এই তো আপনারা কেমন নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছেন। কিছুই জানেন না।
বেশ, যা জানার তা তো জানা হল, ব্যবস্থা যা করার তা আমরাই করব। আপনি এখন আসুন তা হলে। লোকটি চোখমুখ কুঁচকে বললে, স্যার, এর মধ্যে একটা ছোট্ট ব্যাপার ছিল। ওস্তাদের কাছে আমি হাজার দুয়েক টাকা পেতুম। টাকাটা আমার ভীষণ দরকার স্যার। স্ত্রীর কাছে কিছু সোনাদানা থাকবেই। একটা হার, কি একটা বালা! যা হয় একটা কিছু পেলে, আমি নাচতে নাচতে চলে যাই।
আপনি যে টাকা পেতেন, তার তো কোনও প্রমাণ নেই ভাই।
খুব আছে। বলেন তো ফুলেশ্বরীকে নিয়ে আসি। বেশিক্ষণ লাগবে না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই এসে পড়ব। আপনার বাবার সঙ্গেও তখন দেখা হয়ে যাবে।
ফুলেশ্বরীটা কে?
আজ্ঞে, সে এক ডাগর মেয়েছেলে। লাইনে সবে এসেছে।
শুনে, আমার মুখ শুকিয়ে গেল। এ যেন নরকের দূত! একের পর এক দাঁচ মেরে চলেছে। একে ছেড়ে দিলে, যা হবার তা তো হয়েইছে, এরপর ঘোলা জল আরও ঘোলা করে দিয়ে যাবে শয়তান! নিজের হাতঘড়িটার দিকে একবার তাকালুম। এটা পেলে সন্তুষ্ট হবে কি?
শুনুন, এসব কথা ওঁর স্ত্রীকে এখন না বলাই ভাল। আপনি আমার এই ঘড়িটা বরং নিয়ে যান। এখনকার মতো কাজ চালান, পরে যা হয় ব্যবস্থা করা যাবে।
লোকটি বেশ কায়দার গলায় বললে, কী ঘড়ি?
ওমেগা গোন্ড।
নামটা তো বেশ চেনাচেনা মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ, দামি ঘড়ি। যা-তা নয়।
দিন তা হলে। গোন্ড মানে তো সোনা, আসল সোনা?
সামান্য একটু খাদ মেশানো আছে, তা না হলে ঘড়ির কেস হবে না যে।
ঘড়িটা হাতে নিয়ে উলটে পালটে দেখেই পাশ-পকেটে চালান করে দিলে। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। ঘড়িটা পইতের সময় মামা আমাকে দিয়েছিলেন। মাতুলের স্মৃতি আজ হাত থেকে খুলে চলে গেল। মানুষ কীভাবে উটকো ঝামেলায় জড়িয়ে যায়! কোথাকার কে প্রফুল্লকাকা, হঠাৎ এলেন। এমন এক চরিত্রের মানুষ, যাবার সময় জল ঘোলা করে দিয়ে সরে পড়লেন। কোথাকার। জল এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে!
ওস্তাদ বললে, আমি তা হলে আবার কবে আসব স্যার?
আবার আসবেন কেন?
বাঃ এইতেই হয়ে যাবে নাকি! এটা বেচলে, ক’টা টাকাই বা আমার হবে! সাত দিন পরে আসি?
আপনাকে আসতে হবে না, ঠিকানাটা রেখে যান।
ঠিকানা! লোকটি ইস্পাতের মতো হেসে উঠল। আমার ঠিকানায় স্যার আপনি পৌঁছোতে পারবেন না। সে জায়গায় যেতে হলে আলাদা চরিত্র চাই। আপনি অতি নাবালক। আমিই আসব। জায়গাটা তো চেনাই হয়ে গেল। আসতে কোনও অসুবিধে হবে না। আচ্ছা আজ আসি। রাত হয়ে গেল।
আমাকে কোনও কথা বলার অবসর না দিয়ে লোকটি দোকান থেকে নেমে পড়ে হনহন করে হাঁটতে লাগল। হাটার ধরনটা অনেকটা শিম্পাঞ্জির মতো। হাতদুটো সামনে মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দুলছে।
লোকটি চলে যেতেই বিষ্টুদা বললে, আজকাল কী সব লোকের সঙ্গে মিশছ! চেহারা দেখলেই মনে হয় মাগির দালাল।
বিষ্টুদার মুখ ভীষণ গম্ভীর। মানুষটিকে আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করি। এ পাড়ার সেরা মানুষ। পরোপকারী। পরচর্চায় নেই। দোকানে বসে কেউ পরচর্চা করলে, সোজা হাত জোড় করে বলে দেয়, আপনি দয়া করে আসুন। এ পাড়ার সব ছেলে ভাল হোক, লেখাপড়া শিখে ভাল চাকরি পাক, সবসময় এই প্রার্থনা। দীনু যেবার লেটার পেয়ে পাশ করল, বিষ্টুদা সবার আগে এক বাক্স সন্দেশ নিয়ে দেখা করতে ছুটল। ফিরে এল, চোখের দু’কোল বেয়ে জল গড়াচ্ছে। যেন নিজের ছেলে। লেটার নিয়ে পাশ করেছে। দোকানসুদ্ধ লোককে বিনা পয়সায় চা আর লেড়ো বিস্কুট খাইয়ে দিল। পরোপকারের শেষ নেই। মেনিদার মেয়ে বারান্দা থেকে ঝুঁকে পেয়ারা পাড়তে গিয়ে উলটে পড়ে গেল। দুপুরবেলা পাড়ায় কেউ নেই। বিষ্টুদা কোলে নিয়ে হাসপাতালে ছুটল। রক্তে সারাশরীর ভাসছে। বিভূতি মাস্টারমশাই ব্যাচেলার মানুষ। জগাদের বাইরের ঘরে জ্বরে বেহুশ হয়ে পড়ে আছেন। বিষ্টুদা ছুটছে, একবার ডাক্তার নিয়ে, একবার ওষুধ নিয়ে, একবার সাবু নিয়ে। বয়স্ক মাননীয় মানুষ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন, বিষ্টুদা ছুটে এসে পায়ের ধুলো নিচ্ছে। পিতা বলেন, এরা হল শাপভ্রষ্ট সাধক। বিষ্টুদা আর বিষ্টুদার স্ত্রীকে পাশাপাশি দেখলে আমার চোখে জল এসে যায়, যেন সাক্ষাৎ হর-পার্বতী! দোকানের দেয়ালে ঝুলছে হাসিহাসি মুখ একটি শিশুর ছবি। যার কথা বলতে বলতে বিষ্টুদার চোখ জলে ভেসে যায়। সাত বছরের ছেলে ম্যানেনজাইটিসে মারা গেল। হয়ে গেল প্রায় বছর বারো। কেন জানি না, সেই মুহূর্তে মনে হল, বিষ্টুদাকেই বলা যায় আমার চেপে রাখা গোপন কথা। হত্যাকারীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি দিনের পর দিন।
