লোকটিকে পাত্তা না দিয়ে সদরে এসে দাঁড়ালুম। কড়া নাড়তে যাচ্ছি, রাস্তার অপর পার থেকে লোকটি মিহি গলায় বললে, শুনছেন?
হাত যেন অবশ হয়ে গেল। ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলুম, আমাকে বলছেন?
হ্যাঁ স্যার আপনাকে। এই বাড়িতে থাকেন?
এগিয়ে গিয়ে লোকটির সামনে দাঁড়িয়ে বললুম, কেন বলুন তো?
শরীর থেকে বাসি আতরের ঘিনঘিনে গন্ধ বেরোচ্ছে। মুখে অস্পষ্ট পেঁয়াজ আর রসুনের বাস।
প্রফুল্লবাবু এই বাড়িতে থাকেন?
হ্যাঁ থাকেন, এখন নেই।
তার স্ত্রী আছেন?
কেন বলুন তো?
খুকখুক করে কেশে গলা পরিষ্কার করে, সেই সন্দেহজনক লোকটি বললে, আমার একটু দরকার ছিল।
আপনি কে?
আমি একজন লোক।
একজন অপরিচিত মানুষ, হঠাৎ এই ভরসন্ধেবেলা কোনও ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা করতে পারে?
তেমন কোনও খবর থাকলে পারে বই কী স্যার!
আমি তার ভাইপো, আমাকে বলতে পারেন।
তা স্যার রাস্তায় দাঁড়িয়ে তো সেসব কথা হতে পারে না। অনেকক্ষণ এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে। দোতলার জানলায় একবার এক ভদ্রমহিলা এলেন, বেশ সুন্দরী, একবার চোখাচোখি হতেই সরে গেলেন। ভাবলেন কোনও খচ্চর লোক দাঁড়িয়ে আছে।
আঃ, কী যা-তা কথা বলছেন?
ভুল হয়ে গেছে স্যার। লাইনের লোক তো! ক্ষমাঘেন্না করে নেবেন। তা স্যার, একটু বসা। দরকার। এক গেলাস জল, এক কাপ চা।
চলুন, আমরা কোনও দোকানে গিয়ে বসি।
কোন দিকে? বলে, যেদিকে দোকান, লোকটি তার উলটো দিকে তড়বড় করে হাঁটতে লাগল। ডেকে বললুম, ও দিকে নয়, এই দিকে।
সন্ধে বলে এখনও পর্যন্ত বাড়ির কারুর নজরে পড়িনি। মেয়েরা মনে হয় গা ধুচ্ছে, নয়তো সন্ধে দেখাচ্ছে।
বিষ্টুদার চায়ের দোকানে এই সময়টায় তেমন খদ্দের থাকে না। দোকান জমবে রাত আটটার পর। দশটা বাজবে এগারোটা বাজবে, গুলতানি চলতেই থাকবে। শখের অভিনেতা বিশুদা এসে বসবেন এই এতখানি রাজপুত্রের মতো চেহারা নিয়ে। বড় মজার মানুষ।
লোকটি দোকানের বেঞ্চিতে বসেই অর্ডার দিলে, এক গেলাস জল দাও ভাই। জল শেষ করেই বললে, বাঃ, ভাল কেক রয়েছে। দেখি ভাই একটা কেকের মাথা দাও, একটা ডবল হাফ চা।
হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ল বোধহয়, আপনি কিছু খাবেন না স্যার?
চা খাব। বিদা, আমাকে শুধু চা।
বিষ্টুদা প্রথম থেকেই ভুরু কুঁচকে লোকটিকে দেখছে। কিছুতেই আমার সঙ্গে মেলাতে পারছে না। দোকানের একেবারে পেছন দিকে মুখোমুখি বসেছি। কী গেরো! লোকটির গায়ের গন্ধ অসহ্য লাগছে। এক মশারিতে এর সঙ্গে শোবে কে? কাকিমা সেদিন হঠাৎ একটা অসভ্য কথা বলে ফেলেছিলেন, সব হাঁড়িরই সরা জোটে পিন্টু? মহিলাদের মাঝে মাঝে মুখ বড় আলগা হয়ে যায়। আর এটা সাধারণত হয় হুহু দুপুরে। লাল মেঝেতে গা এলিয়ে দিয়ে, পান চিবোতে চিবোতে। মেঝে থেকে উঠে যাবার পর, পড়ে থাকে খোঁপার তেলের দাগ, শরীরের ঘামের ছাপ। সারাপৃথিবী জুড়ে মানুষের মন খারাপের কত আয়োজন। মন আকর্ষণের কতরকম ফাঁদ।
কেকের মুন্ডু থেকে একটা টুকরো ভেঙে নিয়ে মুখে পুরে ওস্তাদ বললে, কতদিন হল?
কী কতদিন হল?
প্রফুল্লবাবু কতদিন হল ফেরেননি?
বেশ কিছুদিন হল। দিন পনেরোকুড়ি তো হবেই।
এতদিন একটা লোক বাইরে, আপনারা কোনও খোঁজপাত করলেন না!
উনি মাঝে মাঝেই তো এইরকম বাইরে চলে যান, বেশ কিছুদিন পরে আবার ফিরে আসেন।
অ।
ওস্তাদ এবার আধখানা কেক মুখে পুরে চিবোতে লাগল। আয়েশে চোখ বুজে এসেছে। বিষ্টুদা দু’কাপ চা দিয়ে গেলেন। দেবার সময় লোকটির দিকে সেই সন্দেহের দৃষ্টি। কাছ থেকে বেশ ভাল করে মুখটা একবার দেখে নিলেন। দেখার মতোই জিনিস, এ পাড়ায় এই প্রথম আবির্ভাব। অনেকটা লটরপটর খায়ের মতো দেখতে। খয়ের খা-ও হতে পারে।
চায়ের কাপে ফড়ড় করে একটা চুমুক মেরে ওস্তাদ বললে, এবারে কি আর ফিরবেন?
কেন?
ওস্তাদ আর এক চুমুক চা সেরে বললেন, এসব কথা ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে হলেই ভাল হত।
আপনি কে বলুন তো?
লোকটি ভালমানুষের মতো মুখ করে বললে, মনে করুন, আমি স্যার একজন দালাল।
দালাল? কীসের? জমিজায়গার, ওষুধের?
না-আ স্যার। ওসব বড় ব্যাপার। মেয়েমানুষের দালাল। যাত্রা, থিয়েটারে, বিয়েবাড়ির নাচেটাচে অ্যাকট্রেস সাপ্লাই করি স্যার!
নিজেকে শামুকের মতো খোলে ঢুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। মেয়েমানুষ শব্দটাই কেমন যেন, তার আবার দালাল। তার পাশে বসে চা খেতে হচ্ছে। কী বলবে, তারই অপেক্ষায় ধৈর্য ধরে থাকা।
বিষ্টুদাকে তাক করে বললে, চা-টা বেশ ভালই বানিয়েছ ওস্তাদ।
বিষ্টুদা ভুরু কুঁচকে তাকালেন। চায়ের কারবার করলেও খুব ভদ্র মানুষ। যথেষ্ট লেখাপড়া করেন। থিয়েটারের ভীষণ ভক্ত। শরৎচন্দ্র সবচেয়ে প্রিয় লেখক। দোকানের দেয়ালে সার সার ছবি ঝুলছে, শরৎচন্দ্র, দুর্গাদাস, শিশির ভাদুড়ী, প্রমথেশ বড়ুয়া, ছবি বিশ্বাস। একটা উটকো লোকের এই ধরনের আলটপকা কথা গায়ে ছুঁচের মতো বিধছে।
লোকটি আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললে, ওস্তাদ আর নেই স্যার।
ওস্তাদ কে?
প্রফুল্লবাবুকে আমরা সবাই ওস্তাদ বলি স্যার! অমন হাত কোথায় পাবেন? তবলায় যেন খই ফুটিয়ে ছেড়ে দিতেন।
কী বলতে চান, একেবারে পরিষ্কার করে বলুন না।
আমি তো তাই বলতেই চাই। তবে দু’বার করে না বলে, একবারে বলতে পারলেই ভাল হয়। চলুন না, ওস্তাদের স্ত্রীর কাছে একবার যাই।
