টেলিফোনটা দু’বার কিড়কিড় করে থেমে গেল। হাত বাড়াতে গিয়ে এম ডি হাত টেনে নিলেন। হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়। পঙ্কজ একটা জেনুইন বনেদি ঘরের ছেলে। ওরা তিনপুরুষে ডাক্তার। পঙ্কজের বাবা ছিলেন নামকরা সার্জেন।
এইবার কড়কড় করে ফোন বেজে উঠল। এম ডি রিসিভার তুললেন।
ও প্রান্তে কে আছেন বোঝা গেল না, তবে এইটুকু বোঝা গেল, তার-পথে উত্তেজক কিছু খবর আসছে। এম ডি বলছেন, না, চোরকে আমি কোনওমতে প্রশ্রয় দিতে পারব না। সে যত বড়লোকই হোক। থানাপুলিশের দরকার নেই। দেনাপাওনা মিটিয়ে বিদায় করে দাও। অমন পণ্ডিতে আমার কাজ নেই। তস্কর পণ্ডিতের চেয়ে মূর্খ সাধু ঢের ভাল। না না, নো মার্সি। নো মার্সি। নো মার্সি। বলো রেজিগনেশন সাবমিট করতে। তা না হলে আমরা পুলিসে কেস হ্যান্ডওভার করব।
রিসিভার নামিয়ে রাখলেন। মুখের লাল আভা সামান্য বেড়েছিল। দেখতে দেখতে স্বাভাবিক হয়ে এল। নকশাটা কোলের দিকে টেনে নিয়ে বললেন, তোমাকে দেরাদুন পাঠাব ইনচার্জ করে। তোমাকে আমি পারচেজ অফিসার করব। খুবই দায়িত্বপূর্ণ পদ। তোমার বয়েস আর অভিজ্ঞতার তুলনায় বেশি ভারী। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি পেডিগ্রি, বিশ্বাস করি সততায়, সাধনায়, আন্তরিকতায়। তুমি ওই পদের অমর্যাদা করবে না, এ বিশ্বাস আমার আছে।
কিন্তু ওই পদে তো কেমিস্ট্রি নেই!
আছে আছে। পারচেজ ডিপার্টমেন্টের আন্ডারে আলাদা একটা লেবরেটরি থাকবে। প্রতিটি জিনিস কেনার আগে অ্যানালিসিস করতে হবে। স্পেসিফিকেশন ঠিক থাকলে, তবেই তুমি কিনবে। পঙ্কজের মেয়েকে তুমি বিয়ে করবে, তোমার পজিশন সেইভাবে বাড়িয়ে দিতে না পারলে, সমানে সমান হবে কী করে? ফাঁইভ ডেজ এ উইক। উইকএন্ডে দু’জনে বেড়াতে চলে যাবে মুসৌরি। তোমাদের দু’জনের সুখের জীবন আমার চোখের সামনে ভাসছে। বিদায় নেবার সময় এসে গেছে বাবা। মানুষ কেন আসে জানো? যে আগে আসে, সে বন কেটে বসত বসায়, ফল ফুলের গাছ তৈরি করে। দিঘি কাটায়। রাস্তা তৈরি করে। সে জানে, পেছনে আসছে তার উত্তরপুরুষেরা। পূর্বপুরুষ যদি তার কর্তব্য পালন না করে, উত্তরপুরুষ কেন তাকে মনে রাখবে? তুমি বলছিলে না, মৃত্যু বলে কিছু নেই। সত্যিই নেই। আমি যখন নেই, তুমি তখন আছ। আমার মৃত্যু আছে। মানুষের মৃত্যু নেই। তোমাদের বিবাহে এই আমার যৌতুক। যাও, তোমার অনেকটা সময় আমি নিয়ে নিলুম। বুড়ো হচ্ছি, কথা বলতে বড় ভাল লাগে। একটা কথা, আমার এই পরিকল্পনার কথা তুমি কাউকে বলবে না।
দরজার কাছে চলে এসেছি, এম ডি ডাকলেন, হ্যাঁ শোনো। তুমি প্রবীর বলে কাউকে চেনো? আর্টিস্ট।
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার মামার বন্ধু।
ওঁর বোন খুব ভাল গান করেন, ভক্তিমতী মহিলা?
আজ্ঞে হ্যাঁ। তাকেও আমি চিনি।
হ্যাঁ, ওঁরা তোমার খুব প্রশংসা করছিলেন। প্রবীরবাবুকে আমি আমাদের পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে চাকরি দিচ্ছি। আর ওঁর বোন ঊষাকে দিচ্ছি, আমাদের সেই অরফানেজের। কেমন হবে?
উঃ সাংঘাতিক হবে। এর চেয়ে ভাল কিছু ভাবা যায় না।
তুমি আজ যাবে আমার সঙ্গে, সেই অনাথ আশ্রমে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। কেন যাব না!
তা হলে তোমাকে আমি ঠিক সময়ে ডেকে পাঠাব।
লেবরেটরিতে চা-পর্ব চলেছে। জীমূতবাবু শিকারের গল্প বলছেন। সবাই চোখ বড় বড় করে শুনছেন। জীবনের প্রথম শিকার। চিফ কেমিস্ট দূরের একটা টেবিলে বার্নারে কী একটা চাপিয়েছেন। বিকারে সেই নীলমত পদার্থটির মেজাজ তেমন শান্ত নয়। কাঁচের রড দিয়ে চমকে দিলেই ফাস ফোঁস করে উঠছে।
জীমূতবাবুর বাবা ছিলেন ফরেস্ট অফিসার। উত্তর ভারতের জঙ্গলে গিয়েছিলেন বাঘ শিকারে। মাচা বেঁধে পিতাপুত্রে বসেছেন। নীচে খোঁটায় বাঁধা কিল মাঝে মাঝে ব্ল্যা ব্ল্যা করে ডাক ছাড়ছে। চাঁদের আলোর রাত। যথাসময়ে বাঘ এলেন।
এই পর্যন্ত বলে জীমূতবাবু গেলাসে বেশ লম্বা একটি চুমুক মারলেন। সবাই একসঙ্গে ‘তারপর? তারপর?’ করে উঠলেন।
তারপর বাঘ এসে, আমাদের দিকে মুখ করে পা ছড়িয়ে বসে পড়ল, ছাগলটা ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। তারপর আমারও আর মনে নেই।
আমরা একসঙ্গে প্রশ্ন করলুম, মনে নেই কেন? এমন একটা ঘটনা ভুলে গেলেন?
ভুলে যাব কেন? আমি অজ্ঞান হয়ে গেলুম। যখন জ্ঞান হল, তখন শেষরাত। চাঁদ ঢলে পড়েছে। পশ্চিমে গাছের আড়ালে। ছাগলটা অজ্ঞান অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
আর বাঘটা?
বাঘ ফিরে গেছে জঙ্গলে। বাঘ এসেছিল ভরাপেটে। ছাগল স্পর্শ করেনি। আর চাঁদের আলোয় বাঘের ওই সৌন্দর্য দেখে, বাবা আর গুলি করতে পারেননি। সামনাসামনি বাঘ দেখলে মনুষ্যজন্মে ঘেন্না ধরে যাবে। এই হল আমার প্রথম ব্যাঘ্র দর্শন।
জীমূতবাবু উঁচু টুল ছেড়ে উঠে পড়লেন। মনে হল, দেরাদুনে আমাদের জমবে ভাল। একটু এগোলেই জিম করবেটের কুমায়ুন। সঙ্গে থাকবেন রবিবাবু।
রবিবাবু ব্যাগ থেকে পাতলা একটা ম্যগাজিন বের করে আনলেন। পাতা উলটে আমার চোখের সামনে ধরে বললেন, তোমার লেখা?
আশ্চর্য! আমারই তো লেখা! অনেক দিন আগে পাঠিয়েছিলুম। একটা ছোট গল্প। আমার কাছে। এখনও কপি আসেনি। আমারই নাম, বড় বড় হরফে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত এক অনুভূতি।
আমার পিঠে হাত রেখে, কানের কাছে মুখ এনে রবিবাবু ফিসফিস করে বললেন, বেশ লিখেছ। ছেড়ো না, চালিয়ে যাও। ওপাশে বুম করে একটা শব্দ হল। চিফ কেমিস্ট ভয়ে পিছু হটতে শুরু করেছেন। বিকারের সেই নীল পদার্থ উষ্ণ পীতাভ রং ধারণ করে ফুটতে শুরু করেছে।
১.৪১ খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে
সন্ধে হয়েছে। মেঘ-থমকানো আকাশ। রাস্তার বাতি কেমন যেন মনমরা হয়ে জ্বলছে। দূর থেকে দেখছি বাড়ির সামনে বিদঘুঁটে চেহারার একটি লোক হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। ইনি আবার কিনি? গায়ে একটা আদ্দির পাঞ্জাবি। ফিনফিন করছে। এমন কাপড়ের পাঞ্জাবি বিশেষ এক শ্রেণির লোকেরাই পরেন। পাঞ্জাবিটার ওপর যথেষ্ট অত্যাচার হয়েছে, তা না হলে এত কুঁচকে যেত না। তোবড়ানো গালের দু’পাশে গালপাট্টা নেমেছে। চোখদুটো ভেতরে ঢুকে গেলেও, মণিদুটো সাপের মতো জ্বলছে। পাকানো চেহারার অদ্ভুত একটি লোক, হেলে-পড়া ল্যাম্পপোস্টের মতো দাঁড়িয়ে আছে। গা-টা কেমন যেন ছমছম করে উঠল। কিছু কিছু মানুষের শরীর থেকে অদৃশ্য একটা তরঙ্গ বেরোতে থাকে, অনেকটা মৃত্যুরশ্মির মতো, ক্লোরোফর্মের মতো। শরীর অবশ করে দেয়।
